পুরো তেহরানে এখন রণসাজ। মোড়ে মোড়ে রণমূর্তি। গোলাবারুদ আর ভারী অস্ত্রের ঝনঝনানি। চোখে মরু সূর্যের টগবগে মার্কিনবিদ্বেষ। মুখের ‘আমেরিকা নিপাত যাও’ স্লোগানে ভূমধ্যসাগর শুকিয়ে ফেলার ক্ষিপ্রতা। হাতে হাতে বন্দুক। কয়েক হাত পরপরই ছোট ছোট দলের জটলা। মাঝে সামরিক পোশাকে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের যোদ্ধারা। সবমিলে হাজার হাজার নারী-পুরুষ। রাজপথ নয়, যেন রণক্ষেত্র। পুরোদমে চলছে যুদ্ধের প্রস্তুতি! সমর তালে গমগম শহর। কয়েক সপ্তাহ ধরেই এ দৃশ্য তেহরানের রাস্তাগুলোয়। রাত নামলেই বাড়ে রণতেজ। সন্ধ্যা থেকে শুরু, শেষ হয় মধ্যরাতে। শেষরাত পর্যন্তও চলে কোথাও। রীতিমতো বড় যুদ্ধের ডামাডোল।
‘ইরানের কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে সময়।’ রবিবার নিজের ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ হুমকির পর আরও জমে উঠেছে তেহরানের রণমহড়া। এর পরেই আবার ইরান হামলার বেশ কয়েকটি এআই ছবি পোস্ট করেছেন তিনি। তবে ইরানের প্রতিশোধের আগুন দাউদাউ করে উঠেছে আরও দুদিন আগেই। যেদিন নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, ‘ইরানে এবার ভয়ংকর আক্রমণের ছক কষেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপদেষ্টারা। আগামী সপ্তাহেই শুরু হতে পারে সে হামলা। রক্তে আগুন জ্বলে ওঠে ইরানিদের। সেদিন রাত থেকেই আরও সরব হয়ে উঠেছে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ। বেড়ে গেছে স্বেচ্ছায় যোদ্ধাদের জমায়েত। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বড় যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ইরানও যে পিছিয়ে নেই— অন্দরমহলের সেই বার্তাই যেন রাজপথে মেলে ধরেছেন ইরানের নারী-পুরুষরা। পথে পথেই শুধু নয়, মহড়া চলছে মসজিদে মসজিদেও। নামাজ শেষ হতেই নিচ্ছেন যুদ্ধের প্রশিক্ষণ। পিছিয়ে নেই তরুণ-শিশুরাও।
যুক্তরাষ্ট্রের বারবার সামরিক হামলার হুমকিতে তেহরানসহ দেশের সব শহরেই এ যুদ্ধ প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে ইরানের খামেনি সরকার। ভয় ভুলে সাড়া দিয়েছে জনগণও। ‘ইরান বীরের জাত। মরব, তবু মাথা নোয়াবো না।’ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এ মন্ত্রে একাত্মতা ঘোষণা করেছে নাগরিকরাও। প্রতিদিনের সন্ধ্যার সে রণচিত্রটিই রবিবার তুলে ধরেছে সিএনএন।
শত্রুর অপেক্ষায় ক্লান্ত সূর্যটা হেলে পড়েছে দিগন্তে, গা জুড়াচ্ছে তেহরানের ‘ধনুকরক্ষী’ আলবুর্জ পর্বতের ঢালে। একটি দুটি করে জ্বলতে শুরু করেছে সড়কের সন্ধ্যা প্রহরী। রাত জাগার রসদ নিয়ে ছোট ছোট দলে ফুটপাতে নামছে চা-কফির দোকানগুলো। কারও কাছে বীর শহীদদের ছবি বসানো ক্যাপ। খেলনা বন্দুক। যুদ্ধবিমান। রণতরী। রাস্তার দু’ধারে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে প্রশিক্ষণ বুথ। ঘণ্টাখানেক পরই সেখানে শুরু হবে ‘রণলীলা’। তরুণ-তরুণীর মহড়া কেন্দ্র হয়ে উঠবে রাজপথ। মুহূর্তে রণসাজে গর্জে উঠবে পুরো তেহরানের অভিজাত এলাকা তাজরিশ স্কয়ার। ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ স্লোগানে অংশ নিচ্ছেন প্রশিক্ষণে।
তাজরিশ স্কয়ারে সমাবেশে অংশ নেওয়া তিয়ানা নামে এক তরুণী বললেন, ‘দেশ ও জনগণের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত আমি। লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত আমাদের সেনাবাহিনী ও কমান্ডাররাও।’ এক বৃদ্ধ ফারসি ভাষায় লেখা নিজের প্ল্যাকার্ড দেখিয়ে বললেন, ‘পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি আমাদের সীমান্তের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, তাই আমরা তা রক্ষা করব।’ লন্ডন ও দুবাইয়ে বেড়ে ওঠা ফাতিমা নামে এক ইরানি নারীর ভাষ্য, ‘আমরা জানি যুদ্ধ শেষ হয়নি। আসলে আলোচনায় বিশ্বাস করেন না ট্রাম্প।’
গত তিন মাস ইরানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘নাইট গ্যাদারিং’ বা রাতের সমাবেশ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুনভাবে দেখা যাচ্ছে জনসমক্ষে অস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। রাজধানীর ভানাক স্কয়ারে একটি বুথে দেখা গেছে নারীদের একে-৪৭ রাইফেল চালানো ও খুলে জোড়া লাগানোর প্রশিক্ষণ দিতে। মার্চে আইআরজিসি এক ঘোষণায় জানিয়েছিল, এখন থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরাও অংশ নিতে পারবে সরাসরি যুদ্ধকালীন বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রমে। সেই নির্দেশনা মেনে খেলার ছলে লড়াই শিখছে শিশুরাও। ঢাকঢোল নিয়ে প্রচারে নেমেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও, অস্ত্র হাতে বিভিন্ন পোজে প্রশিক্ষণের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন সাংবাদিকরা। সরকারি ওফোগ চ্যানেলের উপস্থাপক হোসেইন হোসেইনি তাদের মধ্যে অন্যতম। সরাসরি সম্প্রচারে স্টুডিওর ছাদে গুলি ছুড়ে অস্ত্র ব্যবহারের প্রদর্শন করেন তিনি। পাশে ছিলেন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) এক মুখোশধারী সদস্য।
আলোচনা চলছে
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতা অব্যাহত রয়েছে। সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন এ তথ্য। বললেন, সাম্প্রতিক ইরানি প্রস্তাবের বিষয়ে উভয়পক্ষ তাদের মতামত পাঠিয়েছে।
পাকিস্তানি এক কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইরানের সংশোধিত প্রস্তাবটি রবিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শেয়ার করেছে পাকিস্তান। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তেল নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিলের নতুন প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আগের প্রস্তাবগুলোর তুলনায় এবার প্রথমবারের মতো ইরানের তেল নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে ওয়াশিংটন। ইরানের আলোচক দলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাতে সোমবার এ তথ্য জানিয়েছে তাসনিম নিউজ। এদিনই এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানিয়েছে, গত কয়েক মাসে অন্তত ২৫ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে বিশ্বের বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর।
ইরানের মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে আবারও এআই নির্মিত ছবি প্রকাশ করলেন ট্রাম্প।
বাঁ পাশে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র (আংশিক)। মাঝে থাকা ইরানকে চারপাশ থেকে হামলার ইঙ্গিত সংবলিত তীর চিহ্ন। ডান পাশে বোমা হামলার বাটন নিয়ে বসে আছেন ট্রাম্প। ডানে-বায়ে-ওপরে ভয়ংকর সব বোমা হামলার ছবি। এমন অন্তত ২০টিরও বেশি ছবি শেয়ার করেছেন ট্রাম্প।
যেখানে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইরানের একটি যুদ্ধবিমানকে বানিয়েছে লক্ষ্যবস্তু। পাঁচ সেকেন্ডের ওই ক্লিপে ট্রাম্পকে একটি টেবিল চাপড়াতে দেখা যায়। যেন তিনি কম্পিউটারে কিছু টাইপ করছেন এবং বলছেন, ‘বা বা বা বা... ফায়ার, বুম।’ অন্য ছবিতে একটি মার্কিন ড্রোন ইরানের দ্রুতগামী নৌকায় আঘাত করছে। ক্যাপশন দেওয়া হয়েছে, ‘বাই বাই, ফাস্ট বোটস’ (বিদায়, দ্রুতগামী নৌকা)।

