আলজাজিরায় প্রকাশিত কলাম
গত কয়েক মাসে ভূ-রাজনৈতিক খেলার ছক নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেছে। এতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে একটি বহু প্রতীক্ষিত, কিন্তু অসম একটি শীর্ষ সম্মেলনের মঞ্চ প্রস্তুত হয়েছে। এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে বেইজিংয়ে ১৩-১৫ মে। হোয়াইট হাউস ও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ নিয়ে পৃথক বিবৃতি দিয়েছে।
ওয়াশিংটন বারবার এ বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়ে এসেছে, অন্যদিকে বেইজিং স্বভাবসুলভ সংযত ভঙ্গিতে বিষয়টি দেখছে বলে জানায়। তবে শীর্ষ সম্মেলনকে যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে দেখার চেয়ে, বরং প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে “যোগাযোগ” ও “কৌশলগত নির্দেশনার” বৃহত্তর প্রয়োজনের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে ওয়াশিংটন ও বেইজিং।
এই সূক্ষ্ম কূটনৈতিক রক্ষণকৌশলটি বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার পরিবর্তনশীল ভারসাম্য সম্পর্কে অনেক কিছুই বলে দেয়। কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র চরম নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে এবং আত্মঘাতী বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসতে চীনের সহযোগিতার ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই দুর্দশার উৎস হলো মধ্যপ্রাচ্যে তাদের দুঃসাহসিক সামরিক অভিযানের ব্যর্থতা। ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে একটি অবৈধ, বিনা উসকানির যুদ্ধ শুরু করার পর মার্কিন সামরিক বাহিনী একটি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার মধ্যে আটকে পড়েছে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তেহরান কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এক ডজনেরও বেশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মিলে এমন একটি অবরোধ কার্যকর করেছে, যা কয়েক ডজন জাহাজকে অন্য পথে যেতে বাধ্য করছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে। ওয়াশিংটন এখন এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের চিরাচরিত যুদ্ধংদেহী বক্তব্যের এক বিস্ময়কর বিপরীতমুখী পদক্ষেপ হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টসহ শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তারা চীনকে হস্তক্ষেপ করার জন্য ক্রমবর্ধমান মরিয়া হয়ে জনসমক্ষে আবেদন করে যাচ্ছে। তারা বেইজিংকে নিজেদের বিপুল প্রভাব ব্যবহার করে ইরানকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি পুনরায় খুলে দিতে রাজি করানোর জন্য অনুরোধ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের পদক্ষেপ একটি বিষয় লক্ষণীয় করে তুলেছে, তা হলো মার্কিন নীতিতে থাকা স্ববিরোধিতা। ট্রাম্প ও রুবিও যখন হরমুজ সংকট নিরসনে সাহায্য চাচ্ছেন, তখনও চীনের সঙ্গে বৃহত্তর মার্কিন অবস্থান সংঘাতপূর্ণই রয়ে গেছে এবং প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে চলমান বিরোধ এই সম্পর্ককে ছায়ার মতো আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এই স্ববিরোধিতা এমন একটি প্রশাসনকে তুলে ধরেছে, যা হতাশায় ভুগছে।
ওয়াশিংটন সুবিধাজনক হিসেবে চীনকে সংকটের সমাধানের হিসেবে সবচেয়ে উপযুক্ত শক্তি হিসেবে মনে করে। এর কারণ হিসেবে তারা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি আমদানির ওপর বেইজিংয়ের ব্যাপক নির্ভরশীলতাকে উল্লেখ করেছে। তবে, চীনের কৌশলগত প্রস্তুতি বিবেচনায় তাদের এই মূল্যায়ন মারাত্মক ভুল। এই সংকটে পঙ্গু হয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, বেইজিং ইতোমধ্যে অসাধারণ স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে। সতর্ক মজুতদারি, বৈচিত্র্যময় সরবরাহ শৃঙ্খল এবং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাধ্যমে চীন এই অচলাবস্থার সঙ্গে ব্যতিক্রমী ও ভালোভাবে মানিয়ে নিয়েছে। ওয়াশিংটন যে ধরনের তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ধাক্কার আশঙ্কা করেছিল, তা এড়াতে সক্ষম হয়েছে চীন।
বেইজিং হরমুজ প্রনালির অচলাবস্থাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কঠিন পরীক্ষা হিসেবে দেখছে, যা তারা ইতোমধ্যেই উত্তীর্ণ হয়েছে। ঝুঁকির মাত্রা জেনেই চীন যুদ্ধংদেহী ওয়াশিংটনকে উদ্ধার করতে কোনো তাড়াহুড়ো করছে না। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড এই বিষয়টি ক্রমশ স্পষ্ট করে তুলেছে। এই সংকটের সময়ে চীন ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য তার ইরানি প্রতিপক্ষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার জন্য শুধু ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে, বেইজিং ব্যাপক পরিসরে বৃহত্তর সমঝোতার বিষয়ে দাবি করার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে। যখন সুযোগ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতা বন্ধ করতে, তাদের মারাত্মক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন বহুকেন্দ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো মেনে নিতে বাধ্য করার, তখন আর সামান্য ছাড়ে সন্তুষ্ট থাকার কী প্রয়োজন?
যুদ্ধ শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাবের জবাবে ইরান তাদের প্রতিক্রিয়া জমা দিয়েছে, যেখানে শত্রুতা বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প এটিকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এতে সেই চলমান অচলাবস্থাই রয়ে গেছে। ওয়াশিংটন আশা করছে, বেইজিং এই অচলাবস্থা কাটিয়ে দেবে।
এই আগুন চীন লাগায়নি, কিন্তু এখন এ দেশটিই সেই অপরিহার্য শক্তি যারা কঠোরভাবে নিজেদের শর্তেই তা নেভাতে সক্ষম। তাৎক্ষণিক সংকটের বাইরেও, বেইজিংয়ের চূড়ান্ত কৌশলগত লক্ষ্য অবিচল রয়েছে, এর মধ্যে তাইওয়ান একটি মূল ইস্যু। এই বৃহত্তর দৃঢ়তা নিঃসন্দেহে ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলনেও প্রতিফলিত হবে। ট্রাম্প যখন অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য বাস্তব কিছু অর্জন একটি একটি সফল ফটোসেশনের জন্য মরিয়া, তখন শি জিনপিং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোনোর সামর্থ্য রাখেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলো যেখানে অস্পষ্ট কূটনৈতিক সৌজন্যতার মধ্যেই সন্তুষ্ট থাকত, সেখানে বেইজিং এবার উল্লেখযোগ্যভাবে চাপ বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। চীন সম্ভবত দাবি করবে, যুক্তরাষ্ট্র যেন তাইওয়ানের স্বাধীনতার সুস্পষ্ট বিরোধিতা করে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোকে ‘সমর্থন না করার’ বর্তমান দুর্বল প্রতিশ্রুতিই শুধু না, এ অবস্থান থেকে চূড়ান্তভাবে সরে যাবে।
জয়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাইওয়ানকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারেন। তিনি হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে চীনের সহযোগিতার বিনিময়ে বিপুল মার্কিন কৃষি ও জ্বালানি পণ্য ক্রয় এবং অন্যান্য সংঘাতে শান্তি স্থাপনে মধ্যস্থতার ইস্যুতে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দিতে পারেন। তবে বেইজিং অত্যন্ত সংযত, তারা এই ধরনের স্বল্পমেয়াদি ফাঁদে পা দেবে না।
ট্রাম্প যদিও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সমঝোতার চিত্র তুলে ধরেন, কিন্তু বেইজিং আলোচনার টেবিলে থাকা মানুষটি সম্পর্কে কোনো ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে না। চীনের নেতৃত্ব বোঝে, ট্রাম্পকে বিশ্বাস করা যায় না; তার খেয়ালখুশি বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবনিকাশের ভিত্তিতে আজ যেকোনো চুক্তি হোক না কেন, আগামীকালই তা বাতিল হয়ে যেতে পারে। বেইজিং একটি "বড় ধরনের সমঝোতার" সম্ভাবনা বিবেচনা করলেও এবং একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ মুখোশ বজায় রাখলেও, ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির ওপর কাঠামোগতভাবে নির্ভর করতে চায় না।
আগামী মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থিতিশীল করার মাধ্যমে, বিশেষ করে বছরজুড়ে দুই নেতার মধ্যে নির্ধারিত বেশ কয়েকটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের পরিপ্রেক্ষিতে চীন তার দীর্ঘমেয়াদি লাভের জন্য সহায়ক একটি অনুমানযোগ্য বাহ্যিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায়।
তবে, বেইজিংয়ের জন্য এই ঝুঁকির মাত্রা কেবল তাইওয়ানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার চেয়েও অনেক বেশি। জাপানের পুনঃসামরিকীকরণের গতিপথ সম্পর্কে দৃঢ় নিশ্চয়তা নিশ্চিত করাও চীনের জন্য একটি প্রধান অগ্রাধিকার হবে। যেহেতু টোকিও দ্রুত তার সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং তাইওয়ান সংক্রান্ত কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করার ইচ্ছার বিষয়ে ক্রমশ সোচ্চার হচ্ছে। তাই চীন ওয়াশিংটনের কাছে তার মিত্র জাপানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কঠোরভাবে দমন করার দাবি জানাবে।

বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বেইজিং নিজেকে একটি দায়িত্বশীল ও স্থিতিশীল পরাশক্তি হিসেবে তুলে ধরছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হরমুজ সংকট প্রশমিত করতে ও ব্যাপক অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করতে বারবার আহ্বান জানাচ্ছে। এর মাধ্যমে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুস্পষ্ট বৈপরীত্য তুলে ধরছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে অবৈধ যুদ্ধ চালাচ্ছে এবং সমালোচকদের মতে, দেশটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদে লিপ্ত, তারা বিদেশি নেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিচারবহির্ভূতভাবে অপহরণ ও হত্যায় জড়িত।
শেষ পর্যন্ত, আগামী দিনগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যতের জন্যই নয়, বরং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের সমাধান এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বৃহত্তর কাঠামোর জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন একপাক্ষিকতার যুগ ফুরিয়ে আসছে। চীনের কৌশলগত ধৈর্য এবং সংকটের ওপর ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী প্রভাব নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ সম্মেলনে বসছেন শি।
লেখক - ওয়েনরান জিয়াং, চায়না ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাকট্যাগার্ট রিসার্চ চেয়ার এমেরিটাস