Image description

সিলেট-তামাবিল হাইওয়ের দরবস্ত বাজার থেকে বেশি দূরের পথ নয় চতুল বাজার। এখানে গেলেই একটি নাম শোনা যায় মুখে মুখে। সেই নাম মো. শাহজাহান। চতুল বাজার থেকে বালিদাড়া পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার সড়ক তার নিয়ন্ত্রণে। সড়কটি মিশেছে ভারত সীমান্তের শূন্য লাইনে। আর সেখানেই বসে আছেন আলোচিত সীমান্ত চোরাই ব্যবসার মূল হোতা শাহজাহান। সেখানে বসেই তিনি প্রতিদিনই কোটি কোটি টাকার চোরাই ব্যবসা করে থাকেন। পিতা সিরাজুল ইসলাম স্থানীয় চারিকাটা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি। মো. শাহজাহানও আওয়ামী লীগ নেতা। অবৈধ টাকার জোরে সিলেট জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই থেকে চোরাই জনপদ লালাখাল চা বাগান ও বালিদাড়া অংশের ৪-৫ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকার অধিপতি তিনি।

বর্তমানে শাহজাহানকে নিয়ে তীব্র ক্ষোভ এলাকায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এমনকি তার চোরাই সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে পুলিশ সুপারের কাছেও নালিশ করেছেন এলাকার মানুষ। তবুও দমানো যাচ্ছে না শাহজাহানকে। সূত্র বলছে- মঙ্গলবার পার্শ্ববর্তী বড়বন্দ এলাকার একটি বাড়িতে চোরাইকারবারিদের নিয়ে বৈঠক করেছেন শাহজাহান। প্রতিবাদকারীদের আইনের গ্যাঁড়াকলে ফেলে হেনস্তা করার পরিকল্পনা করেছেন বৈঠক সংশ্লিষ্টরা। জৈন্তাপুরের সীমান্তবর্তী লালাখাল চা-বাগান, বালিদাড়া, খাইবাড়িমুখ চোরাচালানের ‘ওপেন মার্কেট’। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিজিবি বা পুলিশ সহজেই ওই এলাকায় অভিযান চালাতে পারে না। আর ওই সুযোগে পুরো এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে চোরাকারবারিরা।

শাহজাহান এক সময় লাকড়ি ব্যবসা করতেন। রান্না করা লাকড়ি বাগান থেকে ক্রয় করে বিক্রি করতেন। প্রায় ৭-৮ বছর আগের ঘটনা। আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতায়। ওই সময় পিতার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সীমান্ত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ নেন শাহজাহান। শুরু করেন চিনি ব্যবসা। কয়েক মাসেই বনে যান কোটিপতি। চারিকাটা ইউনিয়নের মধ্যে যে বাড়িটি সবচেয়ে নজরকাড়া সেই বাড়িটি হচ্ছে শাহজাহানের। কিনেছেন ৩০ থেকে ৪০ বিঘা জমিও। তার হাত ধরেই প্রতিদিন ওই এলাকা দিয়ে শত শত গাড়ি চিনি আসে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আসে জিরা। এ ছাড়া চা পাতা, কাপড়, কসমেটিক্স, নাসির বিড়ি, মদের চালান আসে। শাহজাহানের নেতৃত্বে রয়েছে কয়েকশ’ কিট বহনকারী যুবক। সন্ধ্যা হলেই তারা সরব হয়। ভোররাত পর্যন্ত চলে চোরাই পণ্য আনার কাজ। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন- ৫ই আগস্টের পূর্বে শাহজাহানের চোরাই রাজ্য সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছিল।

ওই এলাকা দিয়ে তখনকার সরকার দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের হাতে ভারত থেকে আসে অস্ত্রের চালান। টাকার বিনিময়ে শাহজাহান ওই চালান সিলেটে পৌঁছে দেয়। গণ-অভ্যুত্থানের আগে ৩ ও ৪ঠা আগস্ট সিলেট নগরের রাজপথে যে অস্ত্র প্রদর্শন করা হয়েছে বেশির ভাগই শাহজাহানের হাত ধরে এসেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও শাহজাহান ছিল বেপরোয়া। বর্তমান সময়েও শাহজাহান তার নিয়ন্ত্রিত এলাকা দিয়ে বেপরোয়া চোরাচালান করছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চতুল থেকে বালিদাড়া পর্যন্ত সড়ক। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছেও। এতে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে এলাকায়। গত ১১ই মে ওই এলাকার আলোচিত চোরাচালানের কথা জানিয়ে পুলিশ সুপার বরাবর এলাকার অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আবেদন করেছেন। সেখানে তারা জানিয়েছেন- প্রতিদিন চোরাচালানের ১০০ থেকে ১৫০টি গাড়ি গ্রামের ছোট্ট ওই রুট দিয়ে চলাচল করে।

এতে সড়কের অবস্থা করুণ হওয়ার পাশাপাশি অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় শাহজাহান তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা ছাড়াও হামলার ভয় দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা। অভিযোগকারী মো. হাবিবুল্লাহ মানবজমিনকে জানিয়েছেন- শাহজাহান সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য নামায়। প্রতি বৃহস্পতিবার সে চতুল বাজারে তার অফিসে বসে কয়েকশ’ কর্মচারীর মধ্যে কোটি কোটি টাকাও বিতরণ করে। শাহজাহানের কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকার মানুষ ফুঁসে উঠেছেন। মানুষ ক্ষুব্ধ থাকায় গত দু’দিন থেকে তার স্পট বন্ধ রেখেছে বলে জানান তিনি। শাহজাহানের চোরাচালান নিয়ে চতুল বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক স্ট্যাটাসে মঙ্গলবার রাতে উল্লেখ করেন- ‘চতুল বাজারের ভেতর দিয়ে ভারতীয় পণ্য পরিবহন করলে আমরা তা প্রতিহত করবো।’

শাহজাহানের ওই চোরাই সাম্রাজ্য নিয়ে বিরক্ত জনপ্রতিনিধিরাও। চারিকাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সুলতান করিম মানবজমিনকে জানিয়েছেন- শাহজাহান সহ বড়বন্দ এলাকার চোরাকারবারিদের যন্ত্রণায় এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ। বিষয়টি নিয়ে তিনি রোববার ইউনিয়ন পরিষদের সভায় আলোচনা করেছেন। বিষয়টি জৈন্তাপুরের মাসিক সমন্বয় সভায় তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি। তবে বর্তমান সময়ে চোরাকারবারের কথা অস্বীকার করে মো. শাহজাহান জানিয়েছেন- তিনি ৬ মাস আগে চোরাই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।

এক সময় চিনি চোরাকারবারের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেন। বলেন- এখন তিনি ব্যবসা করেন না। ৫ই আগস্টের পূর্বে সীমান্ত দিয়ে অস্ত্রের চালান আসার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন- ওই সময় তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করলেও কখনোই অস্ত্র ও মাদক কারবারিদের প্রশ্রয় দেননি। বর্তমানে কারা ওই এলাকায় ব্যবসা করছে সেটি তিনি জানেন না বলে জানান।