ভারতের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। প্রায় পাঁচ দশক পর এই প্রথমবার দেশের কোনো রাজ্যেই ক্ষমতায় নেই বামপন্থীরা। শেষ শক্ত ঘাঁটি কেরালায় বাম জোটের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
কেরালায় পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন এলডিএফ সরকারের পতনের পর কার্যত ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)। শুধু সরকার গঠন নয়, কোনো রাজ্যে জোটসঙ্গী হিসেবেও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রাখতে পারেনি তারা— যা বাম রাজনীতির জন্য বড় ধাক্কা।
ভারতে বাম রাজনীতির উত্থান শুরু হয় ১৯৫৭ সালে, যখন কেরালায় গণতান্ত্রিকভাবে বিশ্বের প্রথম বাম সরকার নির্বাচিত হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন রাজ্যে তাদের প্রভাব বজায় ছিল।
১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের টানা শাসন শুরু হয়, আর ১৯৯৩ সালে ত্রিপুরায় ক্ষমতায় আসে বামরা। একসময় এই তিন রাজ্য— কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় একসঙ্গে শাসন করেছে বাম জোট।
তবে ধীরে ধীরে সেই শক্তি ক্ষয়ে যেতে থাকে। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ হারায় বামরা, ২০১৮ সালে ত্রিপুরাও হাতছাড়া হয়। তবু কেরালা ধরে রেখে শেষ ভরসা ছিলেন পিনারাই বিজয়ন। এবার সেই শেষ দুর্গও ভেঙে পড়ল।
সর্বশেষ ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, কেরালায় স্পষ্ট ব্যবধানে জয় পেয়েছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট। প্রায় ৯০টির মতো আসন পেয়ে সরকার গঠনের পথে তারা। বিপরীতে বাম জোট নেমে এসেছে প্রায় ৪০ আসনে।
এই ফলাফল শুধু ক্ষমতা হারানোর ইঙ্গিত নয়, বরং বামদের সাংগঠনিক দুর্বলতার দিকটিও সামনে এনে দিয়েছে।
কেরালায় বামদের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা হয়ে উঠছে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি। এবারের নির্বাচনে প্রায় ১১ শতাংশ ভোট পেয়েছে দলটি এবং একাধিক আসনে জয়ও পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোটের একটি বড় অংশ এসেছে বামদের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক ভেঙে— যা পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল রাখে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বামদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজেদের অবশিষ্ট রাজনৈতিক ভিত্তি ধরে রাখা। বিশেষ করে কেরালায় প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে টিকে থাকা এবং সেই জায়গা বিজেপির হাতে চলে যেতে না দেওয়া এখন তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই।
পাঁচ দশকের ধারাবাহিকতার এই অবসান শুধু একটি নির্বাচনী পরাজয় নয়— এটি ভারতের বাম রাজনীতির জন্য এক গভীর সংকটের সূচনাও বটে।