মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ চুক্তি নিয়ে কেন এত তাড়াহুড়ো করলেন ড. ইউনূস? প্রশ্ন তুলেছেন, অর্থনীতিবিদ ড. আনু মুহাম্মদ। জনতার চোখকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, নির্বাচনের তিনদিন আগে এই চুক্তি সম্পন্ন করার পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের আগ্রহ বেশি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে। এই চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি সুরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। এ ধরনের চুক্তি করার কোনো এখতিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। ড. ইউনূস কেন তাড়াহুড়ো করে চুক্তি করলেন তার তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি। এ ছাড়াও সাক্ষাৎকারে উঠে আসে কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া দরকার এই চুক্তি নিয়ে, জ্বালানি নিরাপত্তায় আমাদের করণীয় কি, কেমন দেখলেন সরকারের আড়াই মাস?
প্রশ্ন: মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশ তৈরি ছিল না। চলমান পরিস্থিতির ঢেউ লেগেছে এখানেও। অন্যদিকে নতুন সরকার দায়িত্বে। পুরো পরিস্থিতি কীভাবে দেখছেন?
বর্তমান জ্বালানি সংকটকে অনেকটাই তিয়াত্তরের সংকটের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তখন এমন একটি পরিস্থিতির তৈরি হয়েছিল। স্বাধীনতার পর পরই নতুন সরকার, অনেক রকম সংকটের মধ্যে হঠাৎ করে তেল সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক একটা চাপ তৈরি হয়ে গেল। সেই সময় সমস্ত জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির পেছনে তেলের দাম বৃদ্ধির একটা ভূমিকা ছিল। সার্বিক পরিস্থিতি দক্ষভাবে সামাল দিতে পারেনি তৎকালীন সরকার। ফলে পরবর্তীকালে দেশে দেখা দেয় নৈরাজ্য, তারপর দুর্ভিক্ষ আর এর পরের ইতিহাস তো আমরা জানি।
এর মধ্যে পাঁচ দশক অতিক্রান্ত। সেই ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়ার কথা।আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিভিন্ন সময় টালমাটাল হতে পারে। বিশেষত জ্বালানি পরিস্থিতি। যুদ্ধ পরিস্থিতি হতে পারে। তাছাড়া সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যে নানান অনিশ্চয়তা থাকে, দখল থাকে। একটা দেশ সেটাকে কতোটা মোকাবিলা করতে পারবে তা নির্ভর করে সে দেশ নিজের পায়ের নিচে মাটিটা কতোটা শক্ত তার ওপর। বাইরের পরিস্থিতি খারাপ হলেই আমাদের পরিস্থিতি খারাপ হবে- এটা তো অবধারিত না। এটা তখনই হয় যদি দেশের অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল থাকে।
প্রশ্ন: জ্বালানি সংকট আমাদের এতটা ভোগান্তির কারণ হলো কেন? আর সামনের দিনগুলোতে দেশ কি এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে পারবে বলে মনে করেন?
মূল কারণ আমাদের জ্বালানি নীতি, বিদ্যুৎ নীতি। ’৭৩ কিংবা পরবর্তীকালে বিশ্ব পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে যে নিজেদের পায়ের নিচে মাটিটা তৈরি করবে, গত কয় দশকে কোনো সরকারই তা করেনি। ক্রমে আমাদের দেশে জ্বালানি নীতি তৈরি হয়েছে ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর, তারপর বিদেশি ঋণনির্ভর, বিদেশি কোম্পানিনির্ভর। এখানে কিছু গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প করা হয়েছে। এগুলো খুবই ব্যয়বহুল প্রকল্প। কয়লা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ, এলএনজি এগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা দিনদিন বাড়ানো হয়েছে। যেহেতু আমরা আমদানিনির্ভর সুতরাং যদি বিশ্ববাজারে দাম বাড়ে, অস্থিতিশীলতা তৈরি হয় তাহলে তো আমাদের অবস্থাও খারাপ হবে। সেটাই এখন হচ্ছে।
আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, বাংলাদেশকে গ্যাস রপ্তানির জন্য চাপ দেয়া হচ্ছিল ১৯৯৯, ২০০০, ২০০১, ২০০২ এই সময়। তখন এই চাপ দেয়ার জন্য তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন পর্যন্ত এখানে এসেছিলেন। এ ছাড়াও মার্কিন দূতাবাস, ভারতীয় হাইকমিশন, বিশ্বব্যাংক, এডিবি থেকে চাপ দেয়া হয়েছিল গ্যাস রপ্তানির জন্য। কনসালট্যান্ট, মিডিয়ার একটি অংশ এমন প্রচারে যুক্ত হয়েছিল। সে সময় বলা হয়েছিল, গ্যাসের ওপর দেশ ভাসছে। গ্যাস রপ্তানি করতে হবে। গ্যাস রপ্তানি না করলে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে, রপ্তানি করলে বিরাট লাভ হবে। আমরা সেই সময় এর বিরোধিতা করেছিলাম। এত গোষ্ঠী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর চাপ সত্ত্বেও জনপ্রতিরোধের কারণে সরকার তা করতে পারেনি। তখন যদি গ্যাস রপ্তানি করা হতো তাহলে এখন যে পরিমাণ তেল আমদানি করতে হয় বর্তমানে তার দ্বিগুণ তেল আমদানি করতে হতো। তাইলে আমাদের অবস্থা কী দাঁড়াতো? এখনো সেই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। চুক্তি করা বা গ্যাস রপ্তানি করার চেষ্টা।
আমরা গত তিন দশকে জাতীয় কমিটি থেকে যে সমস্ত দাবি করেছি তারমধ্যে এ সংক্রান্ত দাবি তুলছিলাম। এই তিনটি দাবিগুলো পূরণ করলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বর্তমান সংকট তৈরি হতো না। এক. আমাদের খনিজ সম্পদ কোনোভাবেই রপ্তানি করা যাবে না। আমরা রপ্তানি নিষিদ্ধকরণ আইনের একটি খসড়াও তৎকালীন স্পিকার আব্দুল হামিদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। সেই খসড়াটা বিচারপতি গোলাম রব্বানী করেছিলেন। এতে স্পষ্ট বলা ছিল, কোনো খনিজ সম্পদ বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হবে না। শতভাগ আমরা নিজ দেশের জন্য ব্যবহার করবো।
দুই. আমাদের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান জাতীয় মালিকানায় করতে হবে। এর জন্য জাতীয় সংস্থা বা জাতীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তিন. নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশ ঘটাতে হবে। সরকার এই পথে যায়নি। সরকার জাইকার পরামর্শে এমন একটি মহাপরিকল্পনা করে যা আমদানিনির্ভর কয়লাভিত্তিক প্রকল্প, বিপুল ব্যয়বহুল পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, এলএনজি আমদানি প্রকল্প। আমরা ২০১৭ সালে একটা বিকল্প মহাপরিকল্পনাও করেছিলাম যেখানে আমরা দেখিয়েছি কয়লা, পারমাণবিক, এলএনজি আমদানি কোনোটাই বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ বা অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়।
আমদানি, ঋণ আর বিদেশি কোম্পানির পথ নিয়েছে সরকার। ফলে আর্থিক খাতে একটা বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের কিছু ব্যসায়িক অলিগার্ক শ্রেণি। তাদের সুবিধা দিতে গিয়ে লক্ষ কোটি টাকারও বেশি তাদেরকে ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও। এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। এগুলোর কারণে আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশের যে তেল-গ্যাস সম্পদ যা আছে সেগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার করার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দরকার, এটি তৈরি না করার ফলে এখন এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আমদানিনির্ভর কয়লা প্রকল্প করার কারণে কয়লা আমদানি না করলে কয়লা নির্ভর প্রকল্প হচ্ছে না। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিপুল ব্যয়বহুল। তার ফলে এই যে চাপ তৈরি হলো, পাশাপাশি আমাদের তেল আমদানি করতে হচ্ছে বেশি। তেল আমদানির জন্য একটা রিফাইনারি হয়েছিল ষাটের দশকে। আরেকটা রিফাইনারি হলোই না। আমাদের যদি রিফাইনারি আরেকটা থাকতো তাহলে ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল কম দামে আমদানি করতে পারতাম। পরিশোধন করার প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আমরা লাভবান হতাম। সেটা না হওয়ার ফলে আমাদের পরিশোধিত তেল আমদানি করতে গিয়ে বেশি দামে আমদানি করতে হচ্ছে। এভাবেই প্রতিটি ক্ষেত্রে ভুল কিংবা কতিপয় দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে গিয়ে আজকে আমাদের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এই মুহূর্তে যেটা করা দরকার, ভোলার যে গ্যাস রয়েছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দেয়া। যাতে লোডশেডিং কমে। আমাদের এখানে কিছু কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে যেটা একটু নবায়ন করলেই সেগুলো পূর্ণ উদ্যমে চলতে পারে সেটাকে চালানো। আর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য জাতীয় সক্ষমতাকে ব্যবহার করা। পাশাপাশি আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আনা। এটা কি সম্ভব? সম্ভব বলছি এ কারণে যে, ভিয়েতনাম প্রমাণ করেছে যে এক বছরে তারা ১১,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্র তৈরি করেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। এবং দুই-তিন বছরের মধ্যে তারা করছে ১৬,০০০ মেগাওয়াট। ১৬,০০০ মেগাওয়াট মানে হচ্ছে আমাদের যে পরিমাণ বিদ্যুৎ শতভাগ উৎপাদন হয় তার সমান। সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ভিয়েতনাম করছে মাত্র দুই-তিন বছরে। ভারত আগেই করেছে। পাকিস্তান পর্যন্ত সোলার বিদ্যুতে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করছে। তার মানে এটা সম্ভব এবং সবচাইতে দ্রুত বিদ্যুৎ খাতের সমস্যার সমাধান হবে। জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা বাদ দিয়ে আমরা যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে যাই তাহলে তো আমদানির জন্য বাড়তি কোনো পয়সাও খরচ হবে না। সবচেয়ে কম সময়ে এক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা যায়। বর্তমান সরকারের এখন পর্যন্ত সেরকম কোনো উদ্যোগ আমরা দেখছি না। বরঞ্চ উল্টো যাত্রার নমুনা দেখতে পাচ্ছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি করা হয়েছে সেখানে আগামী ১৫ বছর বেশি দামে এলএনজি আমদানির চুক্তি করা হয়েছে। সেই ধরনের চুক্তি থেকে বের হওয়ার কোনো চেষ্টাও এই সরকারের মধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি না। উল্টো বিদেশি কোম্পানিকে বাড়তি সুবিধা দিয়ে সমুদ্রের তেল গ্যাস তাদের হাতে তুলে দেয়ার নড়াচড়া দেখতে পাচ্ছি।
প্রশ্ন: আপনার কথার মধ্যেই এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি প্রসঙ্গ। এই চুক্তি নিয়ে একজন সংসদ সদস্য সংসদে আলোচনার কথাও বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে দুশ্চিন্তার জায়গাটা কোথায়?
এই চুক্তি হচ্ছে বাংলাদেশকে হাত-পা বেঁধে গলার মধ্যে ফাঁস লাগিয়ে একেবারে রাস্তার মধ্যে ফেলে রাখার ব্যবস্থা। এই চুক্তি হচ্ছে সেরকম। এই চুক্তিটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী জমানায় যখন বাজেট ঘোষণা করে সেই সময় থেকে। আমরা সে সময় থেকেই এর বিপদ চিহ্নিত করে বিরোধিতা করেছি। গত বছরের জুনেই তারা অগ্রিম কিছু কিছু শর্ত পূরণ করে ফেলছিল। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক কিছু আমদানি- এলএনজিসহ অস্ত্র আমদানি, বোয়িং আমদানি। এই কথাগুলো গত বছর বাজেটেই বলা হয়েছিল। তারপরে এই চুক্তির চূড়ান্ত স্বাক্ষরের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার বিপুল উৎসাহ দেখিয়েছে। তখন থেকেই আমরা এর প্রতিবাদ করেছি যে, এই ধরনের চুক্তি করা যাবে না এবং যে চুক্তির কথা বলা হচ্ছে তা গুণগত দিক বা ধারার দিক থেকে ভয়াবহ। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের তো এমন একটি চুক্তি করার এখতিয়ারই ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ার ছিল একটা যথাযথভাবে নির্বাচন করা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা করা। কিন্তু ড. ইউনূস নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে চুক্তিটা করে গেল। খেয়াল করে দেখবেন, তাদের চুক্তি করার ব্যাপারে ছিল বাড়তি আগ্রহ। কাজটি ছিল নির্বাচিত সরকারের। তারা নির্বাচনের ঠিক তিনদিন আগে এই চুক্তিটি করলো। অথচ তাদের পক্ষে খুবই সহজ ছিল এটা যুক্তরাষ্ট্রকে বলা যে, এটা নির্বাচিত সরকারে আসছে তারা দেখবে। লক্ষণীয়, পৃথিবীর মাত্র হাতেগোনা কয়েকটা দেশ ছাড়া কোনো দেশই এখন পর্যন্ত এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের আদালত এটাকে অবৈধ ঘোষণা করছে। ট্রাম্প যে সমস্ত নীতিমালা গ্রহণ করছে বা যে সমস্ত পদক্ষেপ নিচ্ছে সেগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই প্রবল প্রতিবাদ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আদালত ঘোষণা করছে যে, ট্রাম্পের শুল্কনীতি অবৈধ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তারাও এখান থেকে সরে গেছে। এরকম একটা অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে স্বাক্ষর করছে।
প্রশ্ন: আমাদের সমস্যা হবে কোন কোন ক্ষেত্রে, যদি স্পষ্ট করেন?
সমস্যা বহুবিধ। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমরা অংশগ্রহণ করি কেন? অংশগ্রহণ করি এই কারণে যে, সব দেশেই অনেক কিছু আমদানি করতে হয় আবার অনেক কিছু রপ্তানি করতে হয়। রপ্তানি আমরা করি যেটা আমাদের বাড়তি উৎপাদন হয় সেটা আমরা রপ্তানি করি সেখান থেকে বৈদেশিক মুদ্রা পাই। আবার আমদানি করি যেগুলো আমাদের প্রয়োজন, আমাদের ঘাটতি আছে সেগুলো আমদানি করি। এবং কোত্থেকে আমদানি করি? যেখানে আমরা কম দামে পাই সেখান থেকে আমদানি করি। এটা হলো অর্থনীতির প্রাথমিক নিয়ম।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা এই চুক্তিটা হচ্ছে অর্থনীতির সকল নিয়ম পুরোপুরিভাবে পদদলিত করে, আন্তর্জাতিক সমস্ত বিধি লঙ্ঘন করে বাধ্যবাধকতার শৃঙ্খল চাপানো বাংলাদেশের ওপর। এই চুক্তিতে আমাদের কী প্রয়োজন আছে সেটি দেখা হবে না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমাদের কী কী আমদানি করতে হবে সেটার বাধ্যবাধকতা তারাই নির্ধারণ করে দিয়েছে। আমাদের আমদানি করতে হবে হাঁস-মুরগি, গরুর মাংস, সবজি, দুধ এবং দুগ্ধজাত কয়েকশ’ পণ্য যেগুলো আমাদের দেশে উৎপাদন হয় এবং যেগুলো উৎপাদনের সঙ্গে আমাদের কৃষক জড়িত, আমাদের তরুণরা জড়িত, অনেক উদ্যোক্তা জড়িত, লাখ লাখ মানুষ এর সঙ্গে জড়িত।
গার্মেন্টসে আমাদের যত শ্রমশক্তি নিয়োজিত আছে তার থেকে বেশি সংখ্যক মানুষ পোল্ট্রি, ডেইরি, হাঁস-মুরগির খামার করে জীবিকা নির্বাহ করছে। হাঁস-মুরগি আমাদের দেশে একটা পারিবারিক উদ্যোগ। একটা পরিবার করছে, এটা যুক্তরাষ্ট্রের মতো না যে বিশাল একটা কারখানা সেটা করছে। আমাদের ছোট ছোট উদ্যোগে পারিবারিক অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান হয়ে থাকে। অসংখ্য মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এর সঙ্গে যুক্ত। এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এগুলো আমদানি করতে হবে। আমদানি করার সময় এর গুণগত মান পরীক্ষা করার কোনো অধিকার বাংলাদেশের থাকবে না। চুক্তিতে পরিষ্কার বলা আছে, বাংলাদেশকে মেনে নিতে হবে যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে জিনিস আনবে সেটা যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়ে গেছে এবং সেখান থেকে আনার পরে এর আর পরীক্ষা করা যাবে না। যেমন, জেনেটিক্যালি মডিফাইড ফুড সেটা নিয়ে আমাদের সমস্যা আছে, বিশ্বব্যাপী সমালোচনা আছে, সেটা বাংলাদেশে আনার ব্যাপারে কোনো আপত্তি করা যাবে না এবং বাংলাদেশে এনে এর মধ্যে লেবেলও লাগানো যাবে না যে, এটা জেনেটিক্যালি মডিফাইড। বার্ড ফ্লু হতে পারে সেটা নিয়ে বাংলাদেশ কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারবে না। মাঝখানে গরু নিয়ে ভারতের সঙ্গে সমস্যা হলো তখন আমরা দেখলাম যে গরু ভারত থেকে আমদানি না করলেও চলে, আমাদের এখানেই আছে। এই যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের ওপর এই চুক্তি আক্রমণ করছে। আরেকটা হচ্ছে, বেশি দামে আমদানি করতে হবে, শুল্ক নেয়া যাবে না। তারমানে আমাদের একটা আর্থিক ঘাটতি তৈরি হবে বিপুল পরিমাণে। বহু আমদানি পণ্যের ওপর যেহেতু শুল্ক নেয়া যাবে না সেহেতু আমাদের সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাবে। সরকার তখন এই রাজস্ব নেয়ার জন্য জনগণের ওপরে বোঝা স্থানান্তর করবে। একদিকে কর্মসংস্থানের ধস, অন্যদিকে আমাদের যে সমস্ত পণ্য নিরাপদ খাদ্য সেটার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে আর তৃতীয়ত, আবার নতুন নতুন করের একটা সম্ভাবনা তৈরি হলো।
এর সঙ্গে আরও একটা বড় বিপদের জায়গা আছে, যে আমরা আমাদের সুবিধামতো বা আমাদের প্রয়োজনে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি বা কোনো ধরনের চুক্তি করতে পারবো না। কারণ সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত বা অনুমোদন লাগবে। আর বাধ্যতামূলকভাবে অস্ত্র আমদানি করতে হবে। এর মধ্যে বোয়িং আমদানির চুক্তি করা হয়েছে প্রয়োজন ছাড়াই, এর জন্য ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। এ ধরনের চুক্তি বর্তমান যুগে অবিশ্বাস্য। এটা ঔপনিবেশিক আমলের আরেক সংস্করণ।
প্রশ্ন: বড় আকারে প্রশ্ন হচ্ছে, ড. ইউনূসের জমানায় এমন তাড়াহুড়ো করে এ রকম একটা অসম চুক্তি করে গেল কেন?
এই অবিশ্বাস্য এবং এত বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি অন্তর্বর্তী সরকার কেন করলো এই প্রশ্নটা আমাদেরও। এর উত্তর আমরা এখনো পাইনি। কিন্তু আমরা স্পষ্ট দেখলাম যে, যুক্তরাষ্ট্রের যতটা আগ্রহ ছিল তার থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের উৎসাহ ছিল আরও বেশি। তারমানে তাদের কী কোনো ধরনের দাসখত দেয়া ছিল কিংবা তাদের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল? তারা তো চলেই যাচ্ছিল তাহলে তাদের এই চুক্তি করে যাওয়ার কী দরকার ছিল? তারা কি কোনো কোম্পানির স্বার্থ রক্ষার জন্য কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করার বাধ্যবাধকতা থেকে করেছে নাকি পরবর্তীতে তাদের কোনো স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তারা এটা করলো? এই সমস্ত প্রশ্নগুলো আছে এবং এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানতে হবে। কারণ এটা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতি সুরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। সুতরাং এর উত্তর বের করার দায়িত্ব এখন নির্বাচিত সরকারের ওপরে পড়ে। সেজন্য আমরা বারবার বলছি, নির্বাচিত সরকারকে অন্তর্বর্তী সরকারের এই কাজগুলো যে করলো, কেন করলো, কার স্বার্থে করলো, সেটার তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে এবং যারা দায়ী তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। যারা চুক্তির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল তাদের চিহ্নিত করতে হবে।
আরেকটা বিষয় লক্ষণীয় এবং উদ্বেগজনক যে, অন্তর্বর্তী সরকার যখন এই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য অস্থিরতা দেখাচ্ছিল সেই সময় কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বৈঠক হয়েছে এবং আমরা দেখেছি খুব ঘনঘন তাদের দেখা সাক্ষাৎ হচ্ছে, চা খাওয়া হচ্ছে, গল্প হচ্ছে, হাসি-ঠাট্টা হচ্ছে কিন্তু কোনো দল, যে সমস্ত দল সেখানে গিয়েছিল কয়েকটি বাম দল ছাড়া আর কোনো দল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এই সাধারণ কথাটি বলেনি যে, এই ধরনের চুক্তিতে আপনারা স্বাক্ষর করবেন না।
প্রশ্ন: এই চুক্তি নিয়ে একটা বিতর্ক চলছে, কোনো রাজনৈতিক দল জানতো বা কোনো রাজনৈতিক দল জানতো না।
এ নিয়ে একটা বিতর্ক আছে কিন্তু। এই চুক্তির বিষয়ে তারা জানতো কি জানতো না- এই প্রশ্ন থেকেই যায়। হ্যাঁ, এটা তখন না জানার কোনো কারণ নেই। কারণ আমরা বাইরে থেকে তো হইচই করছি কয়েক মাস ধরে এবং অনেক রকম কর্মসূচিও পালন করছি সেই সময়। তখন আমি নির্দিষ্টভাবে এই দলগুলোর উদ্দেশ্যেই বলেছি যে, আপনারা চুপ কেন? আপনারা কথা বলছেন না কেন? কেউ কোনো কথা বলেনি। এই ব্যাপারে তাদের নীরবতা রক্ষাটাও একটা অসাধারণ ঐক্য বলতে হবে। মানে অভূতপূর্ব! এই চুক্তির ব্যাপারে তারা তখনও নীরব ছিল এবং সংসদ নির্বাচনের পরে এখনো তাদের নীরবতাটা অসম্ভব ব্যাপার বলতে হবে। কারণ সংসদে তারা কতো বিষয়ে কথা বলছে, ঝগড়াঝাঁটি করছে, কিন্তু সরকারি দল বিরোধী দল- এরা কেউ এখন পর্যন্ত এই চুক্তি নিয়ে টু শব্দও করছে না। সর্বপ্রথম ২৯শে এপ্রিল স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানা এই চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনার কথা তুললেন। তাকেও থামিয়ে দেয়া হলো। এই চুক্তি নিয়ে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের ঐক্য আমাদের জন্য খুব বিপজ্জনক বিষয়।
প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে সরকারকে আপনার পরামর্শ কী? চুক্তি থেকে বেরোনোর অথবা চুক্তি রিভাইস করার বিষয় যদি বলি...
চুক্তি থেকে বেরোনোর অনেক পথ আছে। এই সরকার যদি চায়, তাহলে এই চুক্তি নিয়ে প্রথমত, সংসদে আলোচনা করতে পারে। এই চুক্তির মধ্যে কী কী আছে সবাইকে জানাতে পারে। দ্বিতীয়ত, একটা নেগোসিয়েশন টিম করতে পারে যাদের দায়িত্ব হবে যে, এর থেকে বের হওয়ার জন্য শক্তিশালী যুক্তি দাঁড় করা। তার মধ্যে এক নম্বর যুক্তি হলো, ট্রাম্প প্রশাসন যখন এই রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্কের নীতি ঘোষণা করছে, এটা যুক্তরাষ্ট্রের আদালত অবৈধ ঘোষণা করছে। তো যেটা অবৈধ ঘোষণা করছে সেটা তো আমাদের মানার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এটা সামনে আনা দরকার যেটা মালয়েশিয়া নিয়ে আসছে সামনে। এই নেগোসিয়েশন টিম সংসদে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এই ধারাগুলো নিয়ে নেগোসিয়েশনে যাওয়া- যে আমাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য এই প্রশ্নগুলো তোলা। এবং এর একটা ধারা আছে যেখান থেকে বাংলাদেশ সরকার বের হতে পারে। এই সমস্ত কিছুই সম্ভব। যদি সরকার চায়, জাতীয় স্বার্থ যদি তার কাছে প্রধান হয়- মানে ন্যূনতম যদি জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কে তাদের দায়বদ্ধতা থাকে, তাহলে তারা এর মধ্যে অনেকগুলো পথ আছে যে পথগুলো নেয়া সম্ভব। এবং অন্যান্য বহু দেশ যেমন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তো যুক্তরাষ্ট্রের সবসময় পিছে লেজ হয়ে থাকে। সেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন এটা স্থগিত ঘোষণা করেছে। মালয়েশিয়া এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে যে, এটা তো অবৈধ হয়ে গেছে। ভারত এর মধ্যে যায়নি। এই উদাহরণগুলো সরকারের ব্যবহার করা উচিত। সেই জন্য সরকার যদি চায় তাহলে এটা সম্ভব। এখন যে ঐক্যটা নীরবতার মাধ্যমে আসছে, সেই ঐক্য যদি এই চুক্তি থেকে বেরোনোর ব্যাপারে আসে তাহলে তো কোনো সমস্যাই হওয়ার কথা না।
প্রশ্ন: মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ফলে যে বিশ্ব পরিস্থিতি, তা কতোদূর যেতে পারে?
একটা সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যে আমরা আছি এবং যুক্তরাষ্ট্র হলো সাম্রাজ্যবাদের প্রধান শক্তি। সন্দেহ নেই যে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক দিক থেকে আনপ্যারালাল। তার সঙ্গে তুলনীয় কেউ নেই। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে তাদের অবস্থা বেশ খারাপ। অভ্যন্তরীণ অবস্থা খারাপ, সাংঘাতিকভাবে ঋণগ্রস্ত, বেকারত্ব অনেক বেশি এবং প্রয়োজনীয় বিভিন্ন খাত থেকে টাকা নিয়ে তারা যুদ্ধ খাতে খরচ করছে। লাভ হচ্ছে যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন গোষ্ঠীর, লাভ হচ্ছে তেল কোম্পানি এবং অন্যদের যারা বিভিন্ন জায়গায় দখল করতে চায় তেল ক্ষেত্র। আর বাকি সমস্ত খাতই ক্ষতিগ্রস্ত। এবং এখন বিশ্বব্যাপী ট্রাম্পের এই ভূমিকা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদকে একটা ভয়ঙ্কর রকম মাস্তানতন্ত্রে পরিণত করা। মানে সাম্রাজ্যবাদের একটা মাস্তানতন্ত্রের পর্ব আসছে। এর ফলাফল হচ্ছে, তাদের যে আগে আধিপত্য ছিল, যেটা সম্মতির মাধ্যমে তারা নিতো- তাদের সেই মতাদর্শিক এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের জায়গা কিন্তু সাংঘাতিকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে এখন। এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তার যারা ঘনিষ্ঠ সহযোগী, তারাই কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে যাচ্ছে। এদিকে আবার ব্রিকস কিংবা চীন-রাশিয়া তারাও একটা শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। একটা সময় ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে মোকাবিলা করতো। এখন সেটা ভেঙে যাওয়ার পরে সে হয়েছে একক শক্তি। কিন্তু এই ইরান যুদ্ধের মধ্যদিয়ে তারা প্রধান এটা বলা যায় না। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যে একক আধিপত্য ছিল তার মধ্যে বড় ধরনের একটা ধস নেমেছে। এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতনের একটা যাত্রা। কিন্তু পতনের সময়ই কিন্তু চিৎকারটা বেশি হয়। ইরান প্রমাণ করছে যে মেরুদণ্ড থাকলে শক্তির ভারসাম্য অসম শক্তি নিয়েও মোকাবিলা করা সম্ভব। আবার সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার তারা দেখিয়েছে মেরুদণ্ড না থাকলে তাদের বিপুল তেল সম্পদ থাকলেও তাদের আসলে কোনো শক্তি নেই। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক থেকে ইরান পর্যন্ত আগ্রাসনের সাহসটাই পেতো না যদি সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত এরা যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী না থাকতো। এই যে মুসলিম বিশ্বের কথা বলা হয়, এটা আসলে কার্যত ফাংশনাল না এটাই প্রমাণিত হচ্ছে। কারণ মুসলিম বিশ্বেরই প্রধান কয়েকটা শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের একেবারে সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। সুতরাং সামনে এই যুদ্ধের অবসান বা পরিপূর্ণ শান্তি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই। কিন্তু আবার বড় আকারের যুদ্ধের মধ্যে যে যাবে তাও মনে হচ্ছে না। নিম্ন মাত্রায় এটা চলতেই থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রাণপণে চেষ্টা করবে নিজের আধিপত্য রক্ষা করার।
প্রশ্ন: এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা দরকার?
বাংলাদেশের দিক থেকে পরিষ্কার থাকা দরকার যে, সে কোনো না কোনোরকম অ্যালায়েন্সের দিকে না যাওয়া, কোনো না কোনো পক্ষের দিকে যাওয়া তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে। বাংলাদেশের উচিত হবে নিজেদের পায়ের নিচে মাটি তৈরি করা। জ্বালানি বা যে সমস্ত ক্ষেত্রে নির্ভরশীলতা আছে, যেমন গার্মেন্টস এক্সপোর্টের ক্ষেত্রে, গার্মেন্টস এক্সপোর্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শতভাগ যাচ্ছে না, ৮ ভাগ ১০ ভাগের মতো যায়। এটা আরও ডাইভারসিফাই করা। আমাদের তেল আমদানির অল্টারনেটিভ হিসেবে নবায়নযোগ্য এবং গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেয়া। তার মানে নির্ভরশীলতার যে সমস্ত জায়গাগুলো আছে সেগুলো থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা এবং কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক কোনো রকম জোট বা চুক্তি এগুলোর মধ্যে একেবারেই যাওয়া উচিত না। গেলেই বিপদ হবে কারণ এখন একটা অন্তর্বর্তীকালীন সময়, বিভিন্ন শক্তির বিভিন্ন ভারসাম্যের মধ্যে পরিবর্তন হচ্ছে। এখন আমাদের ওই স্বাধীন জায়গাটাই অনুসরণ করা উচিত হবে।
নানা কারণে কিন্তু আমরা মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে এই দেশগুলোতে বাংলাদেশের অনেক শ্রমিক যুক্ত আছে। রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও একটা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে যে, মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের যে শ্রমশক্তি যায় সেই শ্রমশক্তি তারা যে নেয়, সেটা কোনো দয়া-দাক্ষিণ্যের ব্যাপার না। তাদের প্রয়োজন বলেই তারা নেয়। এবং বাংলাদেশের এই বিপুল পরিমাণ শ্রমশক্তির ওপরে এই মধ্যপ্রাচ্যের উন্নয়ন, তাদের বিভিন্ন ধরনের নির্মাণকাজ, তাদের বিভিন্ন ধরনের দৈনন্দিন জীবনযাপন, ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক কিছু নির্ভর করে। সুতরাং এরকম ভাবার কোনো কারণ নাই যে, তাদের সব কথা শুনতে হবে। তাদের সঙ্গে একটা আর্গুমেন্টের মধ্যে যেতে হবে।
আরেকটা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র যে গার্মেন্টস পণ্য নেয়, এটাও কোনো দয়া-দাক্ষিণ্যের ব্যাপার না। যুক্তরাষ্ট্র গার্মেন্টস পণ্য নেয় কারণ তাদের প্রয়োজন, সেজন্য নেয়। সেখানকার ব্র্যান্ডগুলো বিপুল মুনাফা করে বলেই এখান থেকে গার্মেন্টস পণ্য নেয়।
পাশাপাশি আমাদের ল্যাটিন আমেরিকায় যোগাযোগ বাড়াতে হবে। জনশক্তি রপ্তানি, তেল আমদানি ক্ষেত্রেও বহুমুখীকরণ করতে হবে, অন্য দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। ইরানের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার দরকার। চীন-রাশিয়াসহ অন্য যারা আছে, তাদের সঙ্গে এই যে যুক্তরাষ্ট্র নানা রকম বাধা দিচ্ছে, কিন্তু চেষ্টা করতে হবে স্বাধীনভাবে সবার সঙ্গে সম্পর্কটা রাখা। এবং সেভাবে অগ্রসর হলে নিজেদের অবস্থানটা পরিষ্কার করলে এবং এই ঝুঁকিগুলো মোকাবিলার ক্ষেত্রে সেখানে ডিপ্লোম্যাটিক বা কূটনৈতিক দক্ষতার ব্যাপার আছে। সারেন্ডার করার প্রবণতা থাকলে কখনোই বাংলাদেশ সংকট থেকে বের হতে পারবে না। আত্মসমর্পণের প্রবণতাটা থাকা যাবে না।
প্রশ্ন: সম্প্রতি ওপেক থেকে আরব আমিরাত বের হয়ে গেল। সেক্ষেত্রে কি এই পেট্রো-ডলারের প্রভাব কোনদিকে গড়াবে?
মধ্যপ্রাচ্যের এই রাজা-বাদশাহদের মধ্যে গোত্রভিত্তিক নানা রকম দ্বন্দ্ব-সংঘাত আছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নাগরিকদের করুণ দশা, কারণ এই রাজা-বাদশাহদের আধিপত্যের মধ্যেই তারা বাস করে। সৌদি আরবের সঙ্গে ইউনাইটেড আরব আমিরাতের যারা শাসক, তাদের দ্বন্দ্ব থেকে এটা হয়েছে। কে আধিপত্য বিস্তার করবে। তাদের এগুলো সামনে আরও বাড়বে, কারণ যেহেতু সংকট বাড়ছে। এবং এই সময়ে আরেকটা জিনিস প্রমাণিত হলো যে, তারা ভাবছিল যে তাদের রাজা-বাদশাহ হিসেবে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে যদি মার্কিন ঘাঁটি থাকে। সেজন্য তারা মার্কিন ঘাঁটি রেখেছে। কিন্তু মার্কিন ঘাঁটি থাকার কারণে তারা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ছে। ইরান ওখানে যে আক্রমণ করছে, এটা তাদের মার্কিন ঘাঁটি থাকার কারণে। সেখানে যদি মার্কিন ঘাঁটি না থাকতো, তারা যদি স্বাধীনভাবে থাকতো, তাহলে তারা এভাবে আক্রান্ত হতো না। তার মানে মার্কিন ঘাঁটি থাকাটাও নিরাপত্তা নয় বরং নিরাপত্তাহীনতার একটা বড় কারণ।
প্রশ্ন: তেল নিয়ে এখন আর দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে না।
তেল তো ছিল এবং তেল আসছিল। কিন্তু আমার যেটা ধারণা যে সরকারের মন্ত্রীরা প্রথম থেকেই বলছিল যে আমরা বাধ্য হবো তেলের দাম বাড়াতে। আসলে সরকার এই সংকটকে অজুহাত হিসেবে নিয়েছে। এটা আইএমএফ-এর শর্ত। আমাদের ভর্তুকি যে যে কারণে হয়, যেমন আমদানিনির্ভরতার কারণে ভর্তুকি বাড়ে, সেটা দূর করার ব্যাপারে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। তাদের আগ্রহ হলো ভর্তুকি কমাও, দাম বাড়াও। দামটা কিন্তু এই সরকার বাড়াতোই। আগে থেকেই বাড়ানোর কথা বলার কারণে মজুতের প্রবণতা বেড়ে গেছে। এখন সামনে দাম বাড়বে, লাভ বেশি হবে- আমার ধারণা অনেক পেট্রোল পাম্প, অনেক ব্যবসায়ী এবং অনেক ব্যক্তি, তারা তখন একটা আর্টিফিশিয়াল ক্রাইসিস তৈরি করেছে। আর তা করেছে মজুতদারির সিন্ডিকেট। বাড়ানোর পরে তো ওই সম্ভাবনা শেষ, সামনে তো আর বাড়বে না। কাজেই মজুত করে তো আর লাভ নাই। তখন সবাই ছেড়ে দিয়েছে। এর মধ্যে অনেকেই লাভবান হয়েছে। এই সংকটটা আসলে কৃত্রিম। এর মধ্যে বিতরণ ব্যবস্থায় কিছু শৃঙ্খলা তৈরি করা হয়েছে, সেটাও কাজ করেছে।
প্রশ্ন: জ্বালানি সংকট কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে সরকার। সরকারের বয়স তো আড়াই মাস, কীভাবে দেখছেন?
অর্থনীতির ক্ষেত্রে গত সরকার যে কাজগুলো করছিল, তার বোঝা একটা আছে। বিপুল পরিমাণ ঋণ আছে, সেটা পরিশোধ করতে হবে। সেই ধারা থেকে অন্তর্বর্তী সরকারও বের হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারও ওই ঋণের ধারাতেই চলছে। যে সমস্ত চুক্তি আওয়ামী লীগ সরকার করেছিল জ্বালানি ক্ষেত্রে আদানিসহ বিভিন্ন ধরনের চুক্তি, সেগুলি থেকে অন্তর্বর্তী সরকার না বের হয়ে সেগুলোর মধ্যেই আরও নতুন নতুন চুক্তি যোগ করছে। তার ফলে অর্থনীতি যে সমস্ত কারণে বিপদগ্রস্ত বা বোঝা তৈরি হয়েছে, সেই কারণগুলো দূর হয় নি।
এই সরকারের সময়ে যেসব গোষ্ঠী তখন সম্পদ লুণ্ঠন এবং পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এস আলম থেকে শুরু করে নানা রকম। অন্তর্বর্তী সরকার একটা বড় অপরাধ করেছিল যে, যারা অপরাধী তাদের বিচারের উপরে গুরুত্ব যেখানে দেয়ার কথা, সেখানে তারা ওই কারখানাগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়েছে সেই সময়। সরকার সেগুলো চালু করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু সেগুলো চালু করার অর্থ এটা না যে, ওই মালিকদের ফেরত আনতে হবে। কিন্তু ব্যাংকের আইনের মধ্যে কিছু কিছু পরিবর্তন করা হচ্ছে যেখান থেকে মনে হচ্ছে যে তারা ওই মালিকদের সঙ্গে এক ধরনের নেগোসিয়েশনে যাচ্ছে।
তারপরে যে ধরনের অর্থনৈতিক মডেল শেখ হাসিনার সময় ছিল, যেটার কারণে আমাদের অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা কিংবা অর্থনীতির ওপরে বিভিন্ন ধরনের অপচয়, দুর্নীতি, সম্পদ লুণ্ঠন, পাচার এগুলো তৈরি হয়েছিল, সেই মডেলের পেছনে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি’র একটা বড় ভূমিকা আছে এই নীতি কাঠামোর পেছনে। সেখান থেকে বেরোনোর কোনো লক্ষণ এই সরকারের সময়ে দেখা যাচ্ছে না, বরঞ্চ তাদের কাছ থেকে আরও বেশি বেশি ঋণ নেয়ার আবেদন দেখা যাচ্ছে। সেখান থেকে এটা ধারণা করা যায় যে, অর্থনীতির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরিবর্তনের পথ এরাও তৈরি করতে আগ্রহী নয়। তার ফলে জনগণের ওপরে যে চাপ- তার করের চাপ, দ্রব্যমূল্যের চাপ, বাসা ভাড়ার চাপ, শিক্ষা-চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যয়ের চাপ- এই চাপ থেকে মানুষ মুক্তি পাবে, এ রকম কোনো ভরসা করা যাচ্ছে না।
প্রশ্ন: সরকারের আড়াই মাস অতিক্রান্ত, মূল্যায়ন করবেন কী?
কিছু উদ্যোগ ভালো। কিন্তু মন্ত্রীদের কিংবা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতৃত্ব দেয়ার মধ্যদিয়ে যে অর্থনীতি বা রাজনীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তনের যে একটা দিকনির্দেশনা দেয়া, সেটা আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি। পাইকারি মামলা, হকারদের ওপর হামলা, মব সন্ত্রাস আগের মতোই হচ্ছে। আগের মতোই ক্ষতিকর চুক্তি, অস্বচ্ছতা চলছে।
আর মন্ত্রীদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ বা প্রতিশ্রুতি, চট করে মন্তব্য- যেমন শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষামন্ত্রীর কথাবার্তা কিংবা সড়ক পরিবহনের ক্ষেত্রে সড়ক পরিবহন মন্ত্রীর কথাবার্তা, মনে হচ্ছে যে আমরা আবার ওই আগের মন্ত্রীদেরই দেখতে পাচ্ছি। এগুলো খুব দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। হামের ক্ষেত্রে শিশুরা যেভাবে মারা গেল, এর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের একটা বড় ভূমিকা আছে। তো এই সরকারের উদ্যোগের ক্ষেত্রে আরও দক্ষ, মনোযোগী ভূমিকা থাকা দরকার ছিল। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন লাগবে। সেটার জন্য যে প্রস্তুতি দরকার, অন্যদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা দরকার, অতীতের পর্যালোচনা দরকার, সে ব্যাপারে মনোযোগ তো আমরা এখন পর্যন্ত দেখছিনা।
প্রশ্ন: পার্লামেন্ট অধিবেশন শেষ হলো। সংসদীয় রাজনীতিকে কেমন দেখছেন?
পার্লামেন্টে তো যে রকম হয়, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু যে সমস্ত জরুরি বিষয় নিয়ে আলোচনা দরকার ছিল তা হয়নি। যেমন, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি একটা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে বিপদের মধ্যে ফেলছে, এ নিয়ে পার্লামেন্টে একটা কথাও উচ্চারিত হয়নি। শেষদিকে রুমিন ফারহানা প্রশ্ন তুলেছেন মাত্র। হাওরে বড় বিপর্যয়, হামসহ জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি কিংবা এই শিক্ষা, স্বাস্থ্য- এগুলো নিয়েও যথাযথ আলোচনা হয়নি। জনস্বার্থের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে সংসদে প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেখা যায়নি।
সূত্র: জনতার চোখ