Image description

লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করায় জ্বালানি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট হরমুজ প্রণালি পুরোপুরিভাবে খুলে দিয়েছে ইরান। শুক্রবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক্সের এক পোস্টে এ কথা জানান। তিনি বলেন, চলমান যুদ্ধবিরতির সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে। এই পদক্ষেপের কারণে ইরানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে প্রণালিটিতে মার্কিন অবরোধ বহাল থাকবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। ব্যক্তিগত সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। এখন এটি ব্যবসা-বাণিজ্য চলাচলের জন্য প্রস্তুত। তবে ইরানের সঙ্গে শতভাগ চুক্তি না হওয়ার আগ পর্যন্ত ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ বহাল থাকবে। ট্রাম্প বলেন, এই চুক্তি প্রক্রিয়া দ্রুতই শেষ হওয়া উচিত। কেননা এ বিষয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে হরমুজ খোলার সিদ্ধান্ত সঠিক বলে মন্তব্য করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার ঘোষণা সঠিক পদক্ষেপ।

 প্রায় ৪০টি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। ওই বৈঠকে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেছে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য। যার লক্ষ্য ছিল পরিস্থিতি অনুকূল হলে হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করা। ম্যাক্রন জানান, আগামী সপ্তাহে লন্ডনে হরমুজ প্রণালি নিয়ে আরও একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ম্যাক্রনের পাশপাশি ইরানের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। তবে প্রতিরক্ষামূলক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ফরাসি প্রেসিডেন্টের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্টারমার। সেখানে তিনি বলেন, আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, এই উদ্যোগটি দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর হয়। এই ঘোষণা আজকের আলোচনার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। স্টারমার জানান, যুদ্ধবিরতির পর একটি প্রতিরক্ষামূলক মিশন গঠনের কাজ চলছে এবং এ বিষয়ে সামরিক পরিকল্পনা দ্রুত এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছে।

হরমুজ পার হতে আইআরজিসি’র অনুমতি প্রয়োজন হবে: হরমুজ প্রণালি পার হতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অনুমতির প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন ইরানের একজন শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর এখন থেকে আইআরজিসি’র অনুমতি প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে, বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একজন ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্কিন পতাকাধারী জাহাজসহ সব বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারাপারের অনুমতি পাবে, তবে নৌবাহিনীর জাহাজগুলো এই অনুমতি পাবে না।

এই সপ্তাহের শেষে দ্বিতীয় দফা সংলাপের সম্ভাবনা: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তির ‘খুব কাছাকাছি’ পর্যায়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য প্রয়োজন হলে তিনি পাকিস্তানে যাওয়ার কথাও বিবেচনা করছেন। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশ ফের সংলাপে বসতে সম্মত হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক খবরে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় দফার সংলাপটি এই সপ্তাহের শেষে ইসলাবাদে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হোয়াইট হাউসও এই ইঙ্গিত দিয়েছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প জানান, আমরা ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি। আমাদের নিশ্চিত করতে হয়েছে, ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না পায়। তারা এতে পুরোপুরি সম্মত হয়েছে। তারা প্রায় সবকিছুতেই রাজি হয়েছে। আলোচনায় অগ্রগতির আশা করেছেন ট্রাম্প। পাকিস্তানে গিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, হ্যাঁ, আমি যেতে পারি। যদি ইসলামাবাদে এ চুক্তি স্বাক্ষর হয়, তাহলে আমি যেতে পারি। ট্রাম্প পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান অসিম মুনিরের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিতে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। তবে ওই বৈঠক থেকে কোনো সমঝোতা ছাড়াই তারা ফিরে যান। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তরে সম্মত হয়েছে। যা যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। যদিও এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষ্য, তারা আমাদের ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ ফেরত দিতে রাজি হয়েছে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত বোঝাতে নিজের দেয়া এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন ট্রাম্প।

তেলের বাজারে স্বস্তি: হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১১ শতাংশের বেশি কমেছে। ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ১১.১২ ডলার বা ১১.২ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৮৮.২৭ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড ফিউচার ১১.৪০ ডলার বা ১২ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৮৩.২৯ ডলারে দাঁড়ায়। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই ঘোষণা বাজারে উত্তেজনা কমার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইউবিএস বিশ্লেষক জিওভানি স্টাউনোভো বলেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলে পরিস্থিতি শান্ত হতে পারে। তবে এখন দেখতে হবে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে কি না। এর আগেও তেলের দাম কিছুটা কমেছিল। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য নতুন আলোচনা এবং লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশা তৈরি হয়েছে।