দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একচ্ছত্র পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। সারাবিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে মনে করা হয়। ১৯৯১ সালে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের পর দেশটির সেই পরাশক্তির তকমাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ইতি ঘটে। পরবর্তীতে রাশিয়া নতুনভাবে পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করলেও পশ্চিমাদের নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্মুখ চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো আর তেমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক বছর দেখা যায়নি। কিন্তু বর্তমানে চীন ও রাশিয়ার পুনরুত্থানে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রয়কের আসন ধরে রাখাতে পারছে না। নয়া বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য কমছে, যার মূলে দেশটির অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, ডলারের বিকল্প মুদ্রা হিসেবে ইউয়ানের উত্থান এবং সামরিক কৌশলের চরম ব্যর্থতা।
ভূরাজনৈতিক শক্তির চালিকাশক্তি সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তি-
ভূরাজনীতিতে শক্তির অন্যতম ভিত্তি সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তি। উন্নত সমরাস্ত্র ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তির কল্যাণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। এটিই দেশটিকে একচ্ছত্র আধিপত্য এনে দিয়েছে এবং নিয়ন্ত্রয়কের আসনে বসিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য- বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র বিক্রি এবং জায়নবাদি ইসরাইলকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে একচ্ছত্র শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু এক্ষেত্রে একমাত্র প্রতিব্ন্ধক শক্তি ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথম চ্যালেঞ্জ জানায় ইরান ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত ইসলামি বিপ্লবে শাহ পাহলভিকে কে উৎখাতের মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করে। ইরানি এই বিপ্লব দেশটিকে পাশ্চাত্য মতাদর্শি দেশ থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত করে। ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের মূল লক্ষ্য ছিলো পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলজুড়ে নিজ বিপ্লব ছড়িয়ে দেওয়া এবং স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা। ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ ধর্মীয়নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ্ খামেনি এই অঞ্চলের একমাত্র প্রতিবন্ধক হিসেবে ইসরাইলকে চিহ্নিত করেন এবং ইসরাইলকে বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার ফতোয়া জারি করেন। কারণ স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বপ্নকে জায়নবাদি রাষ্ট্র ইসরাইল পদপৃষ্ঠ করতে চাওয়ার অভিলাষ।
ইরানি বিপ্লবের সময় ইরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে ৪৪৪ দিন জিম্ম করে রাখে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে জিম্মি উদ্ধারে অসফল হয়। এরপর ইরানের আটককৃত অর্থ ছাড়ের মাধ্যমে জিম্মি দশায় সমাপ্তি ঘটে। যেটি যুক্তরাষ্টের পরাশক্তির অহমিকায় আঘাত করে। এই ঘটনার পরই ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার দেয় যুক্তরাষ্ট্র। মূলত এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারস্যের ইরানের সংঘাতের সূত্রাপাত।
সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বাধীন ইরাকের সঙ্গে আট বছরের দীর্ঘ যুদ্ধ, পারমানবিব বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বোমা তৈরি করছে বলে ইসরায়েলের প্রচারণার পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিষেধাজ্ঞাসহ একের পর বৈশি^ক চাপে কোনঠাসা হয়ে পড়ে ইরান।
মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে পারস্যের সংঘাত-
ভাতৃপ্রতিম মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাক হামলা চালায় ইরানে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তখনকার যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বাধীন ইরাক। ইরাক-ইরান যুদ্ধ ১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ১৯৮৮ সালের ২০ আগস্ট পর্যন্ত চলেছিল। ইরানের কাছে এ যুদ্ধ ছিলো তার ওপর অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ। এই যুদ্ধের শুরুতে ইরান বেশ ক্ষতির সম্মুখীন হলেও পাল্টা আঘাতে ইরাককে বেশ মোক্ষম জবাব দিতে শুরু করে। ফলে ইরাক যুদ্ধের ইতি টানতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ১৯৮৮ সালের আগস্টে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে এর অবসান ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারনে ইরান ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আধুনিক সমরাস্ত্র সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়। ইরাকের সঙ্গে ৮ বছর ব্যাপি যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে ইরান সামরিকায়নে মনোযোগ দেয়। এক্ষেত্রে ইরানকে সহায়তায় এগিয়ে আসে রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া। ইরানি শাসক গোষ্ঠী উপলব্ধি করেন সামরিকভাবে সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে বিশ্ব মানচিত্রে ইরানের টিকে থাকা জটিল হয়ে পড়বে।
জায়নবাদীর সঙ্গে পারস্যের সংঘাত-
ফিলিস্তিনি ভ’মি দখল করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তা ছিল ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের সহযোগিতায় ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে আরব দেশগুলো ইসরায়েল আক্রমণ করে। সে যুদ্ধে আরবরা হারে। এরপর ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালেও আরবরা ইসরায়েল আক্রমণ করে। এই তিন আরব-ইসরায়েল যুদ্ধেও হারে আরবরা, আর যুদ্ধে জিতে প্রতিবার আরো বেশি ভ’মি দখল করে ইসরায়েল। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রথম মুসলিম রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেয় ইরান। তবে ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব হওয়ার পর থেকে ইরান হয়ে যায় ইসরায়েলের বড় শত্রু। এরপর থেকে ইসরাইল ক্রমাগত ইরানের শাসনকাঠামোর মূল ব্যক্তিদের এবং পারমানবিক গবেষণা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের টার্গেট করে আসছে। কখনো তাদের হত্যার মাধ্যমে বা যুক্তরাষ্ট্রকে প্ররোচিত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে তারা ইরানকে দুর্বল করার চেষ্টা করে।
ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে নামায় অনেক বছরের চেষ্টার পর ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ চার দশক ধরে উত্তেজনা চলে আসছে। ইসরাইলে শাসকগোষ্ঠী তাদের দেশের অস্তিত্বের জন্য ইরানকে প্রধান শত্রু মনে করে। ইসরাইল কখনো চায়না এ অঞ্চলে সামরিকভাবে তার শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হোক। ইরানের পারমানবিক কর্মসূচিকে ইসরাইল অস্তিত্বের জন্য হুমকি দেখে, যেমনটা হুমকি ভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। তারা চায়না মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ পারমানবিক বোমার অধিকারি হোক। ইসরাইলের মূল লক্ষ্য ইরানের পারমানবিক কর্মসূচিকে চিরতরে ধ্বংস করা। এজন্য দেশটি গত বছরের ১৩ জুন ভোরে ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ নামে ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আকস্মিক বড় ধরণের সামরিক অভিযান শুরু করে। ১২ দিন ধরে এই সংঘাত চলতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র বি-২ স্টিলথ বিমানের মাধ্যমে বাংকার ব্লাস্টার বোমা দিয়ে ইরানের পারমানবিক কেন্দ্রে হামলা চালায়। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিলো ইরানের পারমানবিক কর্মসূচি ও উন্নত ক্ষেপনাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা। পাল্টা আঘাতে ইরানও ইসরাইলে ব্যালিস্টিক হামলা চালিয়ে এর জবাব দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় টানা বারোদিন পাল্টাপাল্টি হামলার পর দেশ দুটি যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়।
যুদ্ধবিরতি চললেও এবছর আবারো ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্যাপক হামলা চালায়। হামলার প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যা করে। হামলায় খামেনি পরিবারের অনেক সদস্য নিহত হন। আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুই ইরানকে যুদ্ধের টার্নিং পয়েন্টে এনে দাঁড় করায়। খামেনির হত্যার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো ও ইসরাইলের ওপর ক্ষেপনাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে দেশ দুটির ব্যাপক ক্ষতি করে। ইরানের হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণায় বৈশ্বিক তেলের বাজার থেকে শুরু করে সার, খাদ্য উৎপাদন টালমাটাল হয়ে গেছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র পাশে পেয়েছিল তার ন্যাটো মিত্রদের, এবার কেউ তাকে সহযোগিতা করেনি। এমনকি স্পেন ইরান আক্রমনের নিন্দা জানিয়েছে, ফান্সও হেঁটেছে একইপথে। প্রবল মিত্র যুক্তরাজ্য সাফ জানিয়েছে, এটা আমাদের যুদ্ধ নয়, জার্মানিও দূরে থেকেছে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন থেকে।
মিত্রদের বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে যা দেশগুলোর অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে, প্রকট মুদ্রাস্ফিতি-মূল্যস্ফিতি দেখা দিয়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। নিজ দেশের ও মিত্রদের চাপে অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র দুসপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে। যেটিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হার হিকেবে দেখছে। বিশ্লেষকদের আশংকা যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তার দীর্ঘদিনের একক আধিপত্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছে।