মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে নজিরবিহীন উত্তেজনা ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের সাক্ষী হচ্ছে বিশ্ব। এরই মধ্যে মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক হুমকি শান্তির সম্ভাবনাকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এক রাতের মধ্যে ইরানকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া যুদ্ধবিরতির সব শর্ত মেনে না নেয়, তাহলে রাতের মধ্যে গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু প্রকাশ্য এমন হুমকির মুখে ইরানের প্রস্তুতি কী? তারা কি আগের অবস্থানেই অটল থাকবে, যেখানে তারা বলে আসছে, যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকেই থামাতে হবে। ইরান কোনো অসম চুক্তিতে সম্মত নয়, বরং তারা দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। নাকি, মিত্র ও প্রক্সিদের সহায়তায় ট্রাম্পের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলার উদ্যোগ নেবে? এক্ষেত্রে মিত্ররা তাদের কতটা সহায়তা করতে পারে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সভ্যতা বিনাশের হুমকি শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের নৈতিক সীমাও অতিক্রম করেছে। এই হুমকি কেবল একটি নির্দিষ্ট শাসনব্যবস্থা বা সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে নয়, এটি হাজার বছরের প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ একটি সভ্যতার অস্তিত্বকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলারও হুমকি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, যখন কোনো পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একটি সভ্যতা ধ্বংস করার হুমকি দেন, তখন বুঝতে হবে বিশ্ব রাজনীতি তার অন্ধকারতম অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।
ট্রাম্পের সামরিক ও কৌশলগত পরিকল্পনা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই হুমকিকে শুধু ‘মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগের কৌশল’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার হুমকির আড়ালে রয়েছে সুনির্দিষ্ট এবং বিধ্বংসী সামরিক পরিকল্পনা। গত কয়েকদিন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন এমনসব স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, যা একটি আধুনিক রাষ্ট্রকে সচল রাখার জন্য অপরিহার্য।
এমনকি সরাসরি ইরানের বিদ্যুৎ গ্রিড, গুরুত্বপূর্ণ সেতু এবং রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেই বলেছেন, তার লক্ষ্য ইরানকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নেওয়া।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, তার সম্ভাব্য হামলার তালিকায় রয়েছে খারগ দ্বীপের বিশাল তেল শোধনাগার এবং বুশেহর প্রদেশের পানি পরিশোধন কেন্দ্রগুলো। পানীয় জলের উৎস এবং জ্বালানি সরবরাহ ধ্বংস করা মানে সরাসরি লাখ লাখ বেসামরিক মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলা।
এ ছাড়া ট্রাম্পের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে আইআরজিসির সদর দপ্তর এবং ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রগুলো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের নির্বিচার হামলা জেনেভা কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন। মার্কিন এয়ার ফোর্সের প্রাক্তন সামরিক আইন বিশেষজ্ঞ রাচেল ভ্যানল্যান্ডিংহামের মতে, একটি সভ্যতাকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো স্পষ্টতই যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
সম্ভাব্য হামলার মুখে ইরান কি একা?
এই চরম সংকটে প্রশ্ন উঠছে, ইরান কি সম্ভাব্য এই সংকট ঠেকাতে কোনো মিত্রের সাহায্য পাবে? ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও ভৌগোলিক কৌশলগত অবস্থান এখানে বড় ভূমিকা পালন করবে।
ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়ারা এরই মধ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা শুরু করেছে। এই প্রক্সি গ্রুপগুলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে অচল করে দিয়ে ট্রাম্পের মূল ভূখণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ইরানের মিত্রদেশগুলো, যেমন চীন বা রাশিয়া হয়তো সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়াবে না। তবে তারা ইরানকে স্যাটেলাইট ডেটা, গোয়েন্দা তথ্য, উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সাইবার নিরাপত্তা দিয়ে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে চীন, যারা ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা, তারা আমেরিকার ওপর অর্থনৈতিক পাল্টা চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রয়েছে কঠিন দোটানায়। ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতি অনেক আরব দেশকেও ভীত করে তুলছে। কারণ, ইরানের পাল্টা হামলা তাদের তেল ক্ষেত্রগুলোকেও ধ্বংস করে দিতে পারে।
ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
বিশ্ব রাজনীতিতে ট্রাম্পের হুমকির প্রভাব হতে পারে ভয়ঙ্কর। সম্ভাব্য পরিস্থিতি জ্বালানি তেলের বাজারে সংকট আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরানে অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা হলে তারা হরমুজ প্রণালি চিরতরে বন্ধ করে দেবে। আর সত্যি যদি এরকম পরিস্থিতি আসে, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। যা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে পুরোপুরি ধসিয়ে দেবে।
ট্রাম্প যদি তার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কয়েক কোটি শরণার্থী ইউরোপ ও এশিয়ার দিকে পাড়ি দেবে। এটি সিরিয়া সংকটের চেয়েও হাজার গুণ বড় মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
কোনো সভ্য রাষ্ট্র যখন অন্য একটি সভ্যতার ওপর এ ধরনের প্রভাব দেখায়, সেটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাতিসংঘ কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার শৃঙ্খলা নষ্ট করে। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
তার এই পদক্ষেপের ফলে রাশিয়া ইউক্রেনে, চীন হংকংয়ে এবং ভারত তার আশপাশের দেশগুলোর ওপর নিপীড়নমূলক পররাষ্ট্রনীতি কার্যকর করার অজুহাত পাবে। এতে করে বৈশ্বিক শৃঙ্খলা আরো নষ্ট হতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানি সভ্যতা বিনাশের হুমকি আধুনিক ইতিহাসের একটি কলঙ্কজনক মুহূর্ত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বর্তমান সংঘাত শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামর্থ্যের সংঘর্ষ নয়, বরং এটি এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে মানবিকতা, সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।
শক্তির দম্ভ যখন কোনো গোটা জনপদকে মুছে ফেলার পরিকল্পনা করে, তখন সেটি শুধু ইরানের সীমানার মধ্যে সীমিত থাকে না। কেননা, নগর পুড়লে দেবালয়ও এড়ায় না।