Image description

ইরান যুদ্ধে মূল ও কৌশলগত লক্ষ্যগুলো 'পূরণের প্রায় কাছাকাছি' পৌঁছে গিয়েছেন বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

দেশটিতে হামলা শুরুর এক মাস পূর্তিতে, যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযানের নাম দিয়েছে 'অপারেশন এপিক ফিউরি', টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে একথা বলেন তিনি।

তবে ট্রাম্প তার ভাষণে হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচলে সৃষ্ট বাধা নিরসন বা বৈশ্বিক তেলের বাজার নিয়ে কোনো আশ্বাস দিতে পারেননি। বরং তার ভাষণ শেষ হওয়ার পরপরই বৈশ্বিক তেলের দাম চার শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারে পৌঁছেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে দেওয়া ভাষণটি ট্রাম্প শুরু করেন নাসার চন্দ্র অভিযানের সাথে যুক্ত আর্টিমিসের ক্রুদের শুভেচ্ছা জানিয়ে। এরপরই তিনি ইরান ও ভেনেজুয়েলা নিয়ে বক্তব্য দেন।

ট্রাম্প বলেন, "আজ ইরানের নৌবাহিনী নেই, তাদের বিমানবাহিনী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, তাদের নেতাদের অধিকাংশই এখন মৃত"।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপের সক্ষমতা "নাটকীয়ভাবে কমে গেছে" বলেও দাবি করেন তিনি।

"আমেরিকা জিতছে—আর তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বড় আকারে", বলেন ট্রাম্প।

এসময় ২০২০ সালে ইরানের সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেমানিকে হত্যার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বলেন, সোলেমানি যদি বেঁচে থাকতো "আজ সম্ভবত আমাদের আলাপ অন্যরকম হতো—তবে আমরা কিন্তু তখনও জিততাম, আর জিততামও বিশালভাবে।"

ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরে আসেনি এবং দ্রুততার সাথে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছিল।

তিনি বলেন, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির "একেবারে দোরগোড়ায়" পৌঁছে গিয়েছিল।

এসময় ট্রাম্প, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকে ধন্যবাদ জানান।

"তারা অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে এবং আমরা কোনোভাবেই—কোনো অবস্থাতেই—তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হতে কিংবা ব্যর্থ হতে দেবো না," বলেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, ইরান এই দেশগুলোর অনেকগুলোতেই হামলা চালিয়েছে; আর তার মতে, এই বিষয়টিই জোরালোভাবে প্রমাণ করে যে, ইরানের হাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয়।

ট্রাম্পের ভাষণের সময় শীর্ষ সামরিক সদস্যরা হোয়াইট হাউসের ‘ক্রস হল’-এ বসে তা দেখছিলেন

ছবির উৎস,/EPA/Shutterstock

ছবির ক্যাপশান,ট্রাম্পের ভাষণের সময় শীর্ষ সামরিক সদস্যরা হোয়াইট হাউসের 'ক্রস হল'-এ বসে তা দেখছিলেন

'যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি তেলের প্রয়োজন নেই'

ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন নিয়েও কথা বলেন এবং দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি তেলের প্রয়োজন নেই।

ট্রাম্প দাবি করেন, "আমেরিকার প্রচুর গ্যাস রয়েছে। আমার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এক নম্বর গ্যাস ও তেল উৎপাদক দেশ। আর তা ভেনেজুয়েলা থেকে পাওয়া মিলিয়ন মিলিয়ন ব্যারেল না ধরেই।"

"ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে, আমরা সৌদি আরব আর রাশিয়ার সমন্বিত মাত্রার চেয়ে বেশি গ্যাস ও তেল উৎপাদন করছি। আর শিগগিরই সেই সংখ্যা আরও বাড়বে। আমরা একেবারেই হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল না।"

তিনি বলেন, যেসব দেশ মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল, তাদের এখন হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করা জাহাজে ইরানের হামলার হুমকির পর উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি পরিবহন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে— যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ।

ট্রাম্প বলেন, "যেসব দেশ জ্বালানি পাচ্ছে না, যাদের অনেকেই ইরানের 'শিরশ্ছেদে' অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে… কিছু দেরিতে হলেও সাহস জোগাড় করুন, প্রণালিতে যান এবং সেটি দখল করে নিন। এটি রক্ষা করুন।"

তিনি আরও বলেন, দেশগুলো যেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কেনে।

উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান ট্রাম্প

ছবির উৎস,Reuters

ছবির ক্যাপশান,উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান ট্রাম্প

এই যুদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য 'সত্যিকারের বিনিয়োগ'

এই যুদ্ধকে আমেরিকার শিশু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য "একটি সত্যিকারের বিনিয়োগ" বলে দাবি করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, সামরিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র অপ্রতিরোধ্য।

একইসাথে বিশ ও একুশ শতকের যুদ্ধের সময়কাল উল্লেখ করে বলেন, সেগুলো বছরের পর বছর চলেছে, কিন্তু এই সংঘাত মাত্র ৩২ দিন ধরে চলছে।

ট্রাম্প বলেন, ইরানের আগ্রাসন এবং "পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইলের আতঙ্ক" থেকে এখন আর আমেরিকানরা হুমকির মধ্যে নেই এবং যুক্তরাষ্ট্র আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় "আরও নিরাপদ, আরও শক্তিশালী, আরও সমৃদ্ধ" হবে।

এর মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার বক্তব্য শেষ করেন।

মোটাদাগে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার ১৯ মিনিটের পুরো বক্তৃতাজুড়ে ইরান যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা আর যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যের বিষয়টিই তুলে ধরেছেন।

কিন্তু ট্রাম্পের ভাষণে যুদ্ধের বিষয়ে কোনো "স্পষ্ট পরিকল্পনা" ছিল না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মেলিসা তৌফানিয়ান বিবিসিকে বলেন, ট্রাম্পের ভাষণের পর যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকরা সম্ভবত ইরান যুদ্ধ নিয়ে "আরও বেশি বিভ্রান্ত" হয়েছেন।

তিনি বলেন, "আমার মনে হয় না আজকের সেই ভাষণটি দেখে কোনো আমেরিকান মনে করবেন যে এখানে একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা আছে, বা একটি নির্দিষ্ট সময়রেখা আছে, কিংবা আমরা আরও নিরাপদ ও সুরক্ষিত হয়েছি।"

এর আগে, প্রেসিডেন্ট জানান যে তিনি ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন, কারণ তার মতে ন্যাটো থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পর্যাপ্ত সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে ২০২৩ সালে পাস হওয়া একটি আইনের কারণে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ হবে না।