Image description

ইরান যুদ্ধ শুরু করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বকে বহুমুখী সংকটে ফেলে দিয়েছেন। এই যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রধান সমস্যা ছিল ভূরাজনীতিকেন্দ্রিক। কিন্তু ক্রমেই ট্রাম্পের বেপরোয়া মনোভাব বিশ্বকে একটি ভয়ংকর ফাঁদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তা হলো যুদ্ধের ফাঁদ। এমনকি ইরান আক্রমণ শুরু করেছেন অনেক বন্ধু দেশকে না জানিয়েই। ইরান যুদ্ধের ৯ দিন পর বিশ্ব আগের চেয়েও বেশি বিভ্রান্তিকর ঘূর্ণিতে পড়ে গেছে। এ বিষয়টিকে বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের ভ্রান্ত রাজনীতির কুফল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

সোমবার সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এর ফলে একটি আঞ্চলিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সরকারগুলো হঠাৎ করেই এমন এক যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছে, যা তারা চায়নি। ক্রমবর্ধমান যুদ্ধক্ষেত্রে আটকা পড়া নাগরিকদের উদ্ধার কার্যক্রমেও দেশগুলোর মধ্যে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করে। পুরো বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জ্বালানির দাম অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে দিচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্ররা ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখোমুখি হচ্ছে। উজ্জ্বল কাচের শহরগুলোতে এখন যুদ্ধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। বিশ্বব্যাপী বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বিমান চলাচল।

ট্রাম্পের শুরু করা যুদ্ধটি পশ্চিমা দেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য নতুন ভূরাজনৈতিক সত্য স্পষ্ট করেছে। তা হলো তারা ট্রাম্পের সঙ্গে থাকতে পারে না, আবার তাকে ছাড়া বাঁচতেও পারে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে যুদ্ধ শুরু করেছেন, তা মূলত তার ‘মেক আমেরিকা ফার্স্ট’ বা মাগা আন্দোলনেরই অংশ। একই কারণে তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে দেশটির সরকার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। এমনকি ইরানের পর কিউবা পালা বলেও মন্তব্য করতে শোনা গেছে ট্রাম্পকে। ‘বিশ্বের লৌহ আইন’ নামে একটি কথা আছে– ট্রাম্প সেই আইনই প্রয়োগ করছেন বলা যায়। এই আইনের মানে শক্তিশালী দেশগুলো বলপ্রয়োগের মাধ্যমে শাসন করতে পারে। এই যুদ্ধ মূলত ট্রাম্পের মানসিক রূপকে প্রতিফলিত করে। তাঁর আগ্নেয়গিরির মতো মেজাজ, বিশাল ঝুঁকিগ্রহণ ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার প্রতি প্রবল উৎসাহ– এসবই এই যুদ্ধ প্রমাণ করছে। এর মাধ্যমে বিশ্বের শীর্ষ পরাশক্তি নিজেই অস্থিরতায় ভুগছে। বিশেষজ্ঞরা এই প্রবণতাকে বলছেন, ট্রাম্পের পদক্ষেপের মূলমন্ত্র হলো যাই ঘটুক, ‘জাতীয় স্বার্থ রক্ষা’ করাই একমাত্র পথ।

ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মধ্যপ্রাচ্যের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জুলিয়েন বার্নস-ডেসি মনে করেন, ইউরোপীয়রাও ট্রাম্পের কাছে ঠান্ডা। আপাতত ইউরোপ শান্ত থাকার চেষ্টা করছে। বিশ্বব্যাপী মার্কিন প্রেসিডেন্ট যাই করছেন, তাতে ইউরোপকে সাড়া দিতে হচ্ছে। জুলিয়েন মনে করেন, এই অবস্থাটি হলো ‘অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটি কঠিন সংকটের মধ্যে আটকে পড়ার’ মতো। একদিকে তারা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চায়। অন্যদিকে ট্রাম্পের চোখে ভালো থাকতে চায়।

হেগ-ভিত্তিক কৌশলগত পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান কোজিটোপ্র্যাক্সিসের সিইও নিকোলাস ডানগান বলছেন, এটা বলা খুব সরল যে, ইউরোপীয়রা আন্তর্জাতিক আইনের দ্ব্যর্থহীন শ্রদ্ধাশীল। বেশির ভাগ ইউরোপীয়রা ট্রাম্পের ব্যাপারে এখন নতুন নীতি নিয়েছে। তা হলো ‘আমরা আপনার পদ্ধতির নিন্দা করব কিন্তু আপনার উদ্দেশ্যগুলো খারাপ হলেও ক্ষমা করব’।

মূলত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ট্রাম্পের অবজ্ঞায় ইউরোপীয়রা হতবাক। তাদের নিজস্ব সামরিক ভঙ্গুরতা দৃশ্যমান হওয়ায় এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এর অর্থ হলো তাদের ট্রাম্পের মতো একজন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাবধানে চলা উচিত, যিনি তাদের প্রতিরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আলজাজিরা জানায়, ট্রাম্পের পদক্ষেপ আগামীর বিশ্বকে ভয়াবহ সংকটে ফেলে দিয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ যখন আরও দীর্ঘ হবে, তখন বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এটি ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যে যা শুরু হয়েছে। সবচেয়ে বড় হুমকির শঙ্কা ছিল জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। তা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। কাতার ও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে ইরানের হামলা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে অচল করে দিয়েছে।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির বিশ্লেষক অ্যান-সোফি করবাউ আলজাজিরাকে বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার প্রভাব কতটা স্থায়ী হবে তা একটি প্রশ্ন। বর্তমান যে সংকট শুরু হয়েছে, তা বিশ্বকে ভয়ানকভাবে গ্রাস করতে পারে। আর সংকটের সমাধান কীভাবে শেষ হবে, তা কেউ জানে না।

ট্রাম্প ইরানের ওপর কমপক্ষে আরও কয়েক সপ্তাহ আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তেহরান কতটা সক্ষম তা স্পষ্ট হবে। হরমুজ প্রণালি কতদিন বন্ধ থাকে, তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ উপসাগরীয় অঞ্চলে বা তার কাছাকাছি এলাকায় আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে একাধিক বীমা সংস্থা উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজের জন্য কভারেজ বাতিল করেছে।

জাহাজ ট্র্যাকার মেরিনট্রাফিকের মতে, প্রণালি দিয়ে যানবাহন চলাচল ৯০ শতাংশই বন্ধ রয়েছে। এই অনিশ্চয়তা সম্ভবত সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ। সম্প্রতি ট্রাম্প বলেন, তিনি মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থ করপোরেশনকে বাণিজ্য প্রবাহিত রাখার জন্য এই অঞ্চলে শিপিং লাইনের বীমা শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজনে মার্কিন নৌবাহিনী প্রণালি দিয়ে জাহাজগুলোকে এসকর্ট (নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাবে) করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজে তেল পরিবহনে মারাত্মক ব্যাঘাত যত দীর্ঘ হবে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যয় তত বাড়বে।

ঢাকাটাইমস