ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে কলম্বিয়া। স্থানীয় সময় সোমবার (২৩ মার্চ) সকালে দেশটির পুয়ের্তো লেগুইজানোর নিকটবর্তী 'লা তাগুয়া' বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের কয়েক মুহূর্ত পরেই ১২১ জনেরও বেশি সৈন্য বহনকারী কলম্বিয়ান বিমান বাহিনীর একটি সি-১৩০এইচ হারকিউলিস বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এটি দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সামরিক বিমান বিপর্যয় হতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
'ফুয়েরজা পাবলিকা'র সৈন্যদের বহনকারী বিমানটি পেরু সীমান্তের কাছে দক্ষিণ পুতুমায়ো বিভাগের বিমানঘাঁটি থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে ঘন জঙ্গলে আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয়।
বেসরকারি সূত্রগুলো অন্তত ৯০ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৮০ জনের লাশ পেয়েছে কলম্বিয়ান সামরিক বাহিনী। আহত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া প্রায় ২০ জনকে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া প্রত্যক্ষদর্শীদের ভিডিওতে দেখা গেছে, দুর্ঘটনাস্থলের ওপর দিয়ে বিশাল ধূসর ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে এবং বিমানের চূর্ণ-বিচূর্ণ ধ্বংসাবশেষ আগুনে পুড়ছে। ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিল যখন বেসামরিক লোক এবং ইউনিফর্মধারী কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে ছুটছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নাম কেন আসছে
এফএসি-১০১৬ বিমানটি ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের 'এক্সেস ডিফেন্স আর্টিকেলস' প্রোগ্রামের মাধ্যমে কলম্বিয়ায় এসেছিল। ওয়াশিংটন থেকে অনুদান হিসেবে পাওয়া তিনটি সি-১৩০এইচ বা হারকিউলিস বিমানের মধ্যে এটি ছিল প্রথম, যার প্রতিটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩ কোটি ডলার। এটি মূলত মার্কিন বিমান বাহিনীতে সিরিয়াল নম্বর ৮৩-০৪৮৮ এর অধীনে পরিচালিত হতো।
২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কলম্বিয়ান অ্যারোনটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশনের (সিআইএসি) তত্ত্বাবধানে বিমানটির বডি বা কাঠামোর নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, যার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত সংস্কার এবং ইঞ্জিনের আধুনিকায়ন অন্তর্ভুক্ত ছিল।
হারকিউলিস বহরটি বোগোটার এল ডোরাডো বিমানঘাঁটি থেকে 'ট্রান্সপোর্ট স্কোয়াড্রন ৮১১' দ্বারা পরিচালিত হয়। এটি কলম্বিয়ার কৌশলগত আকাশপথে পরিবহনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের দুর্গম জঙ্গলের আউটপোস্টগুলোতে পৌঁছানোর জন্য।
লকহিড মার্টিনের তৈরি সি-১৩০ হারকিউলিস ১৯৫০-এর দশক থেকে বিশ্বজুড়ে সামরিক বাহিনীতে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এটি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বহুল ব্যবহৃত সামরিক পরিবহন বিমানগুলোর মধ্যে অন্যতম।
চারটি অ্যালিসন টি৫৬ টার্বোপ্রপ ইঞ্জিন দ্বারা চালিত বিমানটি ছোট এবং অপ্রস্তুত রানওয়ে থেকে উড্ডয়ন ও অবতরণের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই পুতুমায়োর মতো সীমিত অবকাঠামোর অঞ্চলে এটি অপরিহার্য।
দুর্ঘটনার সময় নিকটস্থ পুয়ের্তো আসিস স্টেশনের আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্যে ২৮° সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ২৪° সেলসিয়াস ডিউ পয়েন্ট রেকর্ড করা হয়েছে, যা অত্যন্ত উচ্চ আর্দ্রতা নির্দেশ করে। এ ধরনের আর্দ্রতা উড্ডয়নের সময় ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা এবং লিফট কমিয়ে দিতে পারে।
প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, উড্ডয়নের জটিল মুহূর্তে যান্ত্রিক ত্রুটি বা ওজনজনিত সমস্যা দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে, যদিও কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিমানটিতে যা ঘটেছিল
উড্ডয়নের প্রাথমিক ধাপে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। এফএসি-১০১৬ নিবন্ধিত বিমানটি জাতীয় সেনাবাহিনীর জন্য সৈন্য পরিবহনের মিশনে ছিল। উড্ডয়নের প্রাথমিক ধাপে এটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং বিমানঘাঁটি থেকে কিছু দূরে ঘন জঙ্গলে আছড়ে পড়ে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুয়ের্তো আসিসগামী তিনটি প্লাটুনের অন্তত ১১০ জন সেনাসদস্য বিমানে ছিলেন, যদিও সংবাদ প্রকাশের সময় পর্যন্ত সংখ্যাটি স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেড্রো আরনুলফো সানচেজ এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে লিখেছেন: ‘গভীর দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আমাদের বিমান বাহিনীর একটি হারকিউলিস বিমান পুয়ের্তো লেগুইজামো থেকে উড্ডয়নের সময় আমাদের 'ফুয়েরজা পাবলিকা'র সৈন্যদের নিয়ে যাওয়ার পথে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।’
তিনি আরও যোগ করেন যে, সামরিক ইউনিটগুলো দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে, তবে হতাহতের সঠিক সংখ্যা বা দুর্ঘটনার কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সানচেজ জনগণকে সরকারি তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের জল্পনা-কল্পনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
কলম্বিয়ান রেডিওতে কথা বলা এক স্থানীয় বাসিন্দা উদ্ধার অভিযানের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আমরা একটি খামার এলাকায় আছি যেখানে বিমানটি পড়েছে এবং আমরা সব আহতদের জড়ো করছি। আমরা তাদের পুলিশের গাড়িতে তুলে দিয়েছি এবং শহরের মানুষ মোটরসাইকেলে করে তাদের বহন করতে সাহায্য করছে।’
শীর্ষনিউজ