Image description

ইসরাইলের বিশ্বখ্যাত বহুতর বিশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে আঘাত হানছে ইরানের ‘ক্লাস্টার’ বা গুচ্ছ বোমা। ইরানের সবচেয়ে উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘খোররামশাহর’ অন্তত ৮০টি উপ-বোমা বা সাব-মিউনিশন বহন করতে সক্ষম বলে ধারণা করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের ক্লাস্টার ইসরাইলের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

গত রোববার ক্লাস্টার মিউনিশন বা গুচ্ছ বোমা ব্যবহার করে সর্বশেষ হামলাটি চালানো হয়। একটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মধ্য ইসরাইলে আঘাত হানে, যাতে ১৫ জন আহত হন। ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ)-এর মতে, সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরান যতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, তার প্রায় অর্ধেকই ছিল ক্লাস্টার ওয়ারহেড যুক্ত।

দ্য গার্ডিয়ান ডজনখানেক ইরানি হামলার প্রভাব এবং ইসরাইলি কর্মকর্তাদের বিবৃতি পর্যালোচনা করে দেখেছে যে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ১৯টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ক্লাস্টার ওয়ারহেড নিয়ে ইসরাইলি আকাশসীমায় প্রবেশ করে শহরাঞ্চলে আঘাত হেনেছে। এসব হামলায় অন্তত নয়জন নিহত এবং ডজনখানেক মানুষ আহত হয়েছেন। এটি ইরানের যুদ্ধকৌশলে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে।

ইসরাইলের অত্যন্ত উন্নত মাল্টি-টিয়ার প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক, যার মধ্যে আয়রন ডোমও রয়েছে, তা বিভিন্ন উচ্চতা ও গতির লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম। কিন্তু ক্লাস্টার বোমা মাঝ আকাশে ডজনখানেক ছোট বোমা ছড়িয়ে দেয়ায় এটি ইসরাইলি আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশটির প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর পরামর্শক ও ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ তাল ইনবার বলেন, সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় ক্লাস্টার বোমা আটকানো প্রযুক্তিগতভাবে অনেক বেশি কঠিন। এটি কার্যকরভাবে ঠেকাতে হলে ইন্টারসেপ্টরকে অবশ্যই মূল ক্ষেপণাস্ত্রটি বিস্ফোরণ বা উপ-বোমা ছড়িয়ে দেয়ার আগেই আঘাত করতে হবে।

ক্লাস্টার বোমাগুলো বিশাল এলাকায় ছোট ছোট অনেক বোমা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য তৈরি। এই ছোট বোমাগুলো সব সময় তাৎক্ষণিক বিস্ফোরিত হয় না, যা পরে বেসামরিক নাগরিকদের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। ক্লাস্টার বোমার উপস্থিতির সন্দেহ হলে সামরিক দলগুলো বিশাল এলাকা জুড়ে তল্লাশি চালায় এবং এরপর পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট সেগুলো নিষ্ক্রিয় করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হলে বায়ুমণ্ডলের বাইরেই এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করা প্রয়োজন। একবার উপ-বোমাগুলো ছড়িয়ে পড়লে সেগুলো আটকানো কার্যত অসম্ভব।

ক্লাস্টার বোমা প্রকৃতিগতভাবেই বাছবিচারহীন এবং জনাকীর্ণ এলাকায় এর ব্যবহার আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে নিষিদ্ধ। ২০০৮ সালের ক্লাস্টার মিউনিশন কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর জন্য এটি নিষিদ্ধ হলেও ইসরায়েল বা ইরানÑ কেউই এই চুক্তির পক্ষে নয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গত জুন মাসে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানের ক্লাস্টার বোমা ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে আন্তর্জাতিক আইনের ‘চরম লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছিল। সংস্থাটি ২০০৬ সালে লেবাননে এই অস্ত্র ব্যবহারের জন্য ইসরাইলকেও অভিযুক্ত করেছিল। ইসরাইল অতীতে এই অস্ত্র ব্যবহারের কথা স্বীকার করলেও দাবি করেছে যে তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনেই তা করে। তবে ইরানের এই হামলাকে তারা ‘ইরানি জান্তার যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

মার্চের শুরু থেকে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, তেল আবিবের রাতের আকাশে ডজন ডজন উজ্জ্বল আলোকবিন্দু দ্রুতগতিতে নেমে আসছে এবং আঘাত হানছে। ইসরাইলি বেসামরিক নাগরিকদের জন্য এই দৃশ্যটি যুদ্ধের এক আতঙ্কজনক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

গত ১৮ মার্চ ভোরে এ ধরনের দুটি হামলায় তেল আবিবের পূর্বে রামাত গান এলাকায় সত্তরোর্ধ্ব এক দম্পতি এবং মধ্য ইসরাইলের আদানিম এলাকায় ৩০ বছর বয়সী এক থাই কর্মী নিহত হন। ইসরাইলি কর্মকর্তারা বলছেন, মূল ক্ষেপণাস্ত্রটি সরাসরি ধ্বংস করা হলেও অনেক সময় এর ভেতরে থাকা সব উপ-বোমা নিষ্ক্রিয় হয় না।

ইরানের এই কৌশলের একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্যও রয়েছে। ইসরাইলের আকাশসীমায় ছোট ছোট বোমা ঢুকিয়ে দেয়ার পাশাপাশি এর উদ্দেশ্য হতে পারে ইসরাইলের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমিয়ে ফেলা। অর্থাৎ, একটি মাত্র লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে ইসরায়েলকে ডজন ডজন দামি মিসাইল খরচ করতে বাধ্য করা। তাল ইনবার বলেন, ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে একেকটি ছোট সাব-মিউনিশনকে লক্ষ্য করা অর্থনৈতিকভাবে মোটেও সাশ্রয়ী নয়।

ইসরাইলের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে যে তারা ইরানের ৭০ শতাংশের বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংস করেছে এবং ইরানের আকাশসীমার ওপর প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। তা সত্ত্বেও তেহরান নিয়মিতভাবে ইসরাইলের আকাশে ফাটল ধরাচ্ছে। গত সপ্তাহান্তেও দক্ষিণ ইসরাইলের আরাদ ও ডিমোনা শহরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ২০০ জন আহত হয়েছেন।

ক্রমাগত সাইরেনের শব্দ এবং ক্লাস্টার বোমার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ইসরাইলিদের মধ্যে ক্লান্তি ও হতাশা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন এই যুদ্ধ আর কতদিন চলবে এবং এর শেষ কোথায়।

গার্ডিয়ানের গত বছরের এক তদন্তে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর সময় ইসরাইলও দক্ষিণ লেবাননে ক্লাস্টার বোমা ব্যবহার করেছিল। অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা লিটানি নদীর দক্ষিণে অন্তত দুই ধরনের ইসরাইলি অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করেছেন।