Image description

বাগরাম এয়ারফিল্ডে সরাসরি আক্রমণ, তার সঙ্গে পুরো আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালিয়ে পাকিস্তান কার্যত তালেবানের বিরুদ্ধে খোলামেলাভাবেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এই উত্তেজনা এমন সময়ে বাড়ছে, যখন একই সঙ্গে ইরানকে ঘিরেও যুদ্ধ চলছে।

 

ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ আন্তর্জাতিকভাবে বেশি আলোচিত হলেও, প্রতিবেশী আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান এই প্রকাশ্য যুদ্ধ দ্রুত তীব্র হয়ে উঠছে, যা পুরো অঞ্চলে কৌশলগত প্রভাব ফেলতে পারে।

 

মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) আফগানিস্তানের তালেবান সরকার অভিযোগ করেছে, সোমবার রাতে কাবুলের একটি মাদক পুনর্বাসন হাসপাতালে পাকিস্তানের বিমান হামলা চালায়। এতে অন্তত ৪০০ জন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে ২০০০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালে হামলা হয়। নিহতের পাশাপাশি অসংখ্য মানুষ আহত এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এই যুদ্ধকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সীমান্ত সংঘাতের বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

তবে ইসলামাবাদের দাবি, তারা বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করেনি। দেশটির তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার আফগানিস্তানের দাবিকে নাকচ করে বলেছেন, কাবুল ও পূর্বাঞ্চলীয় নাঙ্গারহার প্রদেশে ‘সামরিক স্থাপনা ও সন্ত্রাসী সহায়তা অবকাঠামো’ লক্ষ্য করে পাকিস্তানি বাহিনী ‘নির্ভুল বিমান হামলা’ চালিয়েছে।
পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান, দুই পক্ষই এ সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্য একে অপরকে দায়ী করছে।

 

পাকিস্তান বলছে, তারা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) হামলার জবাব দিচ্ছে। গোষ্ঠীটি আফগান ভূখণ্ডে অবস্থান করছে বলে দাবি তাদের। যদিও তালেবান সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

 

তবে পাকিস্তানের হামলা শুধু টিটিপি লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং কয়েক দিনের মধ্যেই আফগান সামরিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

 

গত ১ মার্চ সাবেক মার্কিন বিমানঘাঁটি বাগরামেও হামলা চালানো হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একটি হ্যাংগার ও দুটি গুদাম ধ্বংস হয়েছে। তবে তালেবান দাবি করেছে, তারা হামলা প্রতিহত করেছে এবং ঘাঁটির কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

 

বাগরাম কেন গুরুত্বপূর্ণ

 

অন্যান্য স্থাপনার বাইরে বাগরামের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা সংঘাতকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। ২০২১ সাল পর্যন্ত এটি আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির প্রধান কেন্দ্র ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কয়েকবার বলেছেন, বাগরাম ছেড়ে দেওয়াটা কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হয়নি। এর কারণ হিসেবে কৌশলগত গুরুত্ব এবং চীনের কাছাকাছি অবস্থানের বিষয় উল্লেখ করেন তিনি। মার্কিন প্রশাসন এই ঘাঁটি পুনরায় ব্যবহার করার সম্ভাবনাও বিবেচনা করেছিল বলে জানা গেছে। যদিও তালেবান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ফেরত আসতে দেবে না।

 

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সমন্বিত হামলার দ্বিতীয় দিনেই পাকিস্তান বাগরামে আক্রমণ করে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, কীভাবে একাধিক আঞ্চলিক সংঘাত একই সময়ে এগোচ্ছে। যদিও সংঘাতগুলোর একের অন্যের সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।

 

পাকিস্তান ও তালেবান: জটিল এক সম্পর্কের ইতিহাস

 

ঐতিহাসিকভাবে তালেবান ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান শাসনের পয়লা মেয়াদের সময় কূটনৈতিকভাবে কাবুলকে স্বীকৃতি দেওয়া তিনটি মাত্র দেশের একটি ছিল পাকিস্তান। সাবেক সরকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং বিশ্লেষকরা বারবারই পাকিস্তানের সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার কিছু অংশের আর্থিক, লজিস্টিক ও নিরাপত্তা সহায়তার কথা উল্লেখ করেছেন।

 

২০২১ সালে তালেবান আবারও ক্ষমতায় আসে। শুরুর দিকটায় ইসলামাবাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল। পাকিস্তানের উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা নিয়মিত কাবুল ও কান্দাহার সফর করতেন এবং আন্তর্জাতিক মহলে আফগানিস্তানকে একঘরে হয়ে পড়া থেকে রক্ষার চেষ্টা করত পাকিস্তান। তবে সাম্প্রতিক এই সম্পর্ক তীব্র অবনতির দিকে চলে গেছে।

 

ইসলামাবাদ অভিযোগ করছে, টিটিপির বিরুদ্ধে তালেবান কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তালেবান এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও টিটিপির বিরুদ্ধে বড় সামরিক অভিযান চালাতেও অনীহা দেখাচ্ছে। ফলে একসময়কার কৌশলগত অংশীদারিত্ব এখন বিবাদপূর্ণ সম্পর্কে পরিণত হয়েছে।

 

পাকিস্তানের জন্য টিটিপির হুমকি

 

পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ হুমা বাকাইয়ের মতে, নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে তালেবানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের এই হামলা প্রয়োজনীয়, কারণ দেশটি এখন ‘অস্তিত্বগত হুমকির’ মুখে রয়েছে। টিটিপির হামলা বেড়ে যাওয়ায় ইসলামাবাদকে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক সহায়তা না দিলেও, পাকিস্তানের অভিযান চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ‘অবশ্য’ ওয়াশিংটনের পূর্ণ সম্মতি রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

বাকাই আরও বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র আবার বাগরামে সামরিক উপস্থিতি স্থাপন করে, তবে তারা পাকিস্তান, ইরান, রাশিয়া ও চীনের খুব কাছাকাছি অবস্থান নেবে, যা ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

সম্প্রতি আফগানিস্তানে ইরানের ডি-ফ্যাক্টো রাষ্ট্রদূত আলিরেজা বিকদেলি প্রকাশ্যে তালেবানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, কারণ তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বাগরাম ব্যবহার করতে দেয়নি। এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য কতটা সূক্ষ্ম হয়ে উঠেছে, এই ঘটনায় তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

 

১২ মার্চ আফগান টিভি চ্যানেল শামশাদকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিকদেলি বলেন, তালেবানের এই সিদ্ধান্ত আফগানিস্তানকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করেছে, কারণ সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি তেহরানের জন্য বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারত।

 

রাশিয়া ছাড়া বিশ্বের অন্য কোনো দেশের মতো ইরান এখনও তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে বিকদেলি ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ বিষয়ে তাদের আলাপ চলমান এবং অদূর ভবিষ্যতেই আফগানিস্তানের পক্ষে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

 

ইরান যুদ্ধের আবডালে সংঘাত

 

প্যারিসের ইনালকো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সর্দার রহিমির মতে, এই সময়টিকে পাকিস্তান কৌশলগতভাবে কাজে লাগাচ্ছে। এই আফগান গবেষক বলেন, ‘ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সঙ্গে মিলিয়ে পাকিস্তানের হামলার সময় নির্বাচন তাদের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ তৈরি করেছে।’ তার মতে, তালেবানের সঙ্গে সংঘাতে পাকিস্তান অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীরব সমর্থন বা আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা ছাড়া পাকিস্তান দীর্ঘমেয়াদে এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে না বলে মনে করেন তিনি। বাগরামে হামলাকে তাই রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

 

বাগরাম এয়ারফিল্ডে হামলাকে ট্রাম্পের জন্য এক ধরনের হ্যাঁ-বাচক অবস্থান নিয়ে এসেছে বলে রহিমি মন্তব্য করেন। এতে করে এই সংকেত স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর আফগানিস্তানের নিরাপত্তা দায়িত্ব নিতে পাকিস্তান প্রস্তুত। এই পুরো বিষয়টিকে এক ‘বিশাল ভূ-রাজনৈতিক ধাঁধা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি, যেখানে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ অনুসারে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চাচ্ছে।

 

চীনের সাবেক আফগান রাষ্ট্রদূত সুলতান আহমদ বাহিনের মতে, পাকিস্তানের এই হামলার পেছনে একাধিক উদ্দেশ্য রয়েছে। ইরানের ঘটনাপ্রবাহের কারণে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কম থাকায় এই হামলাগুলো তুলনামূলকভাবে কম নজরে এসেছে। কিছু বিশ্লেষক ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সমন্বয়ের সম্ভাবনার কথাও বলেছেন, বিশেষ করে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের প্রেক্ষাপটে। তবে বাহিনের কথা, পরিস্থিতি এর চেয়েও জটিল। তার যুক্তি হলো, পাকিস্তান একদিকে টিটিপিকে দুর্বল করতে চাইছে, এটি ঠিক। একইসঙ্গে নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট থেকেও তারা দৃষ্টি সরাতে চায়।

 

এছাড়া কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের হামলায় সাবেক মার্কিন সামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে এখনও আমেরিকান অস্ত্র থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে সবুজ সংকেত থাকলে এই বিষয়টিও আলোচনায় থাকত বলে মনে করেন তিনি।

 

দীর্ঘমেয়াদে পাকিস্তান একটি পরিচিত কৌশল অনুসরণ করছে বলে মনে করেন বাহিন। তার মতে, ইসলামাবাদ পুরোপুরি স্থিতিশীল ও স্বাধীন আফগানিস্তান চায় না; বরং এমন একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি চায়, যা তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকবে। পাকিস্তানের লক্ষ্য ঠিক তালেবানকে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং এমন শক্তিগুলোকে দুর্বল করা, যারা পাকিস্তানের প্রভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়—এমনটাই মনে করেন তিনি।

 

লেখক: সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী

 

ডয়চে ভেলের কনফ্লিক্ট বিভাগে প্রকাশিত প্রতিবেদনের আলোকে অনূদিত।