Image description

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত যোগ্যতার শর্ত পূরণ না করলেও আর্থিক লেনদেন ও প্রভাব খাটিয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে ময়মনসিংহের সরকারি ফুলবাড়ীয়া মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু ওবায়দার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, তার নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করা হলেও সেই তথ্য গোপন করে তিনি ওই পদেই বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র, মামলার নথি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) জমা হওয়া অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, আবু ওবায়দা ২০০১ সালের ২৬ জুন ফুলবাড়ীয়া সরকারি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তার যোগদানের আট বছর পর ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর বিদ্যালয়ের প্রধান ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিদ্যালয়টি তখন এমপিওভুক্ত ছিল। এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে আবেদন করতে হলে ন্যূনতম ১০ বছর এবং প্রধান শিক্ষক পদে ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

এমপিও নীতিমালার এ শর্ত লঙ্ঘন করে মোহাম্মদ আবু ওবায়দাকে সহকারী প্রধান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ পদে নিয়োগের আবেদনের সময় আবু ওবায়দার চাকরির অভিজ্ঞতা ছিল ৮ বছর। এমপিওভুক্তির তারিখ বিবেচনা করা হলে আবু ওবায়দার অভিজ্ঞতা মাত্র ৭ বছর তিন মাস। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনের যোগ্যতা না থাকলেও আর্থিক লেনদেন ও প্রভাব খাটিয়ে এ পদ বাগিয়ে নেন তিনি।

বিদ্যালয়ের ভবনে চুন ব্যবহার ও রং করা, বাউন্ডারি দেয়াল পুনর্নির্মাণের নামে ভুয়া ভাউচার তৈরির করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু ওবায়দার বিরুদ্ধে। ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের নামে ব্যয় বহির্ভূত ভাউচার দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করেছেন তিনি। এছাড়া এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, পুরোনো লোহা, টিন, কেচি গেট ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার উত্তরপত্র বিক্রি অর্থ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, মোহাম্মদ আবু ওবায়দাকে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের সময় বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ছিলেন তার শ্বশুর মো. শামছুদ্দিন। এই সম্পর্কের প্রভাব খাটিয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পান তিনি। এ অনিয়মের প্রতিবাদে ম্যানেজিং কমিটির সসদস্য আব্দুর রহমান এবং সহকারী প্রধান পদে নিয়োগপ্রত্যাশী মো. মোখলেছুর রহমান আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি এখনো আদালতে বিচারাধীন।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ফুলবাড়ীয়া সরকারি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘নিয়োগ সংক্রান্ত বিধি অনুযায়ী, একজন শিক্ষকের সমগ্র শিক্ষা জীবনে সর্বোচ্চ একটি তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য। একাধিক তৃতীয় বিভাগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা উচ্চতর পদে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্য না হলেও আবু ওবায়দাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আবু ওবায়দার শিক্ষাগত সনদে একাধিক তৃতীয় বিভাগ থাকলেও নিয়োগ কমিটি সেটি উপেক্ষা করেছেন। মূলত তার শ্বশুর তৎকালীন প্রভাবশালীদের মাধ্যমে এ পদে তাকে বসিয়েছেন।’

তথ্য গোপন করে স্বপদে বহালের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হয়। জাতীয়করণের সময় সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ সংক্রান্ত মামলা আদালতে চলমান থাকলেও মামলার তথ্য গোপন করে বিশেষ তদবিরের মাধ্যমে স্বপদে বহাল থাকেন আবু ওবায়দা। পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হলে ওই পদে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন তিনি।

বিদ্যালয় পরিচালনায় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ
বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যালয় পরিচালনায় নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন আবু ওবায়দা। ক্ষমতার অপব্যবহার করে নানা আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম শুরু করেন। শিক্ষকদের মতামত উপেক্ষা করে একক সিদ্ধান্তে প্রধান শিক্ষকের সরকারি বাসভবন ও বিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী প্রধান ফটক ভেঙে ফেলা হয়। ভাঙনের পর বেঁচে যাওয়া ইট ও গ্রিল ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

‘অভিযোগটি অনেক আগে দায়ের হয়েছিল। বর্তমানে কী অবস্থায় রয়েছে সেটি বলতে পারছি না। তবে অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।’— প্রফেসর বি এম আব্দুল হান্নান, মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব), মাউশি

বিদ্যালয়ের ভবনে চুন ব্যবহার ও রং করা, বাউন্ডারি দেয়াল পুনর্নির্মাণের নামে ভুয়া ভাউচার তৈরির করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু ওবায়দার বিরুদ্ধে। ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের নামে ব্যয় বহির্ভূত ভাউচার দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করেছেন তিনি। এছাড়া এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, পুরোনো লোহা, টিন, কেচি গেট ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার উত্তরপত্র বিক্রি অর্থ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক জানান, ভুয়া বিল ভাউচার তৈরির ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভুয়া স্বাক্ষর নেওয়া হত। কেউ স্বাক্ষর দিতে না চাইলে তার ওপর খড়গ নেমে আসত। পরে বাধ্য হয়ে ওই শিক্ষক ভুয়া বিলে স্বাক্ষর করতেন।’

শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব অনিয়ম অব্যাহত থাকলে উপজেলার স্বনামধন্য সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়বে। তারা মোহাম্মদ আবু ওবায়দার নিয়োগের বৈধতা এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফুলবাড়ীয়া সরকারি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু ওবায়দা। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আপনাকে ফোনে কোনো বক্তব্য দিতে পারব না। আমি আপনাকে চিনি না। আপনার তথ্য দিয়ে রাখেন, পরিচয় যাচাইয়ের পর আপনার সাথে যোগাযোগ করা হবে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব)  অধ্যাপক বি এম আব্দুল হান্নান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘অভিযোগটি অনেক আগে দায়ের হয়েছিল। বর্তমানে কী অবস্থায় রয়েছে, সেটি বলতে পারছি না। তবে অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।’