ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ‘জেনারালাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস (জিএসপি)’ সুবিধা তিন বছরের জন্য স্থগিত হওয়ায় ভারতের রফতানি খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। তবে এই সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য-মানচিত্রে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে, যেখানে বাংলাদেশের জন্য খুলে গেছে সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া ও হালকা শিল্পপণ্যে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ইইউ’র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন বছরের জন্য ভারতের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে ইইউতে ভারতের প্রায় ৮৭ শতাংশ রফতানি পণ্যে এখন পূর্ণ এমএফএন (মোস্ট ফেভার্ড নেশন) শুল্ক প্রযোজ্য হবে।
অবশ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কমার্স মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের জন্য ঘোষিত নতুন জিএসপি নিয়মের বাস্তব প্রভাব মোট ভারতীয় রফতানির মাত্র ২.৬৬ শতাংশে পড়বে।
তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ’ এ বিষয়ে অন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। তারা বলছে, ভারতের জন্য আগে যে পণ্যগুলোতে জিএসপি সুবিধা ছিল, তার একটি বড় অংশই নতুন নিয়মে বাধ্যতামূলক ‘মোস্ট ফেভার্ড নেশন’ শুল্কের আওতায় চলে গেছে। এই কারণে তারা মনে করছে, প্রায় ৮৭ শতাংশ শুল্ক সুবিধা কার্যত হারাচ্ছে।
এতে ইউরোপীয় বাজারে ভারতীয় পণ্যের মূল্য বাড়বে এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগে কোনও পোশাক পণ্যে ১২ শতাংশ এমএফএন শুল্ক থাকলেও জিএসপি সুবিধায় ভারতীয় রফতানিকারককে দিতে হতো মাত্র ৯.৬ শতাংশ। এখন সেই সুবিধা উঠে যাওয়ায় পুরো ১২ শতাংশ শুল্ক গুনতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদে ভারতের শিল্প ও রফতানিনির্ভর খাতগুলোতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে— বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। শুল্ক সুবিধা হারানোর ফলে ইউরোপীয় ক্রেতাদের জন্য ভারতীয় পণ্যের আকর্ষণ কিছুটা কমতে পারে।
এর বিপরীতে বাংলাদেশ এখনও ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্ক সুবিধা ভোগ করছে। ফলে দাম ও সরবরাহের প্রতিযোগিতায় ইউরোপীয় ক্রেতাদের দৃষ্টি ঘুরে আসতে পারে ঢাকাকেন্দ্রিক রফতানি শিল্পের দিকে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি টেক্সটাইল, চামড়া ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যে বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে রফতানি প্রবৃদ্ধিতে নতুন গতি আসতে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ভারতের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার বাংলাদেশের জন্য কোনও স্বয়ংক্রিয় সাফল্য নয়। এটি মূলত একটি সময়-সীমাবদ্ধ সুযোগ। দক্ষতা বৃদ্ধি, উৎপাদন সক্ষমতা উন্নয়ন, শ্রম ও পরিবেশগত মান বজায় রাখা এবং নীতিগত প্রস্তুতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে সম্ভাবনাটি হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তাদের মতে, ইইউ’র জিএসপি সুবিধা ভারত থেকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কেবল একটি প্রতিবেশী দেশের রফতানি সংকট নয়—এটি বাংলাদেশের জন্য ইউরোপীয় বাজারে অবস্থান আরও দৃঢ় করার একটি কৌশলগত সুযোগ। সময়মতো প্রস্তুতি ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রফতানি কাঠামোকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে।
মূল শক্তি: শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার
বাংলাদেশ বর্তমানে ইইউতে ডিউটি-ফ্রি ও কোটামুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। ফলে যেখানে ভারতীয় রফতানিকারকদের ৯-১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের পণ্য ইউরোপে প্রবেশ করছে শূন্য শুল্কে। এই ব্যবধানই ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।
বিশেষ করে পোশাক খাতে, যেখানে মুনাফার মার্জিন অত্যন্ত কম, সেখানে এই শুল্ক পার্থক্যই অর্ডার স্থানান্তরের জন্য যথেষ্ট।
তৈরি পোশাক: সবচেয়ে বড় সুবিধা ভোগ
ইইউ বাজারে বাংলাদেশের মোট রফতানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ভারতের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারের ফলে
বেসিক নিটওয়্যার, ডেনিম ও ক্যাজুয়াল ওভেন পোশাক—এই পণ্যগুলোর অর্ডার বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো এখন খরচ কমাতে ও সরবরাহ ঝুঁকি কমাতে একাধিক সোর্সে অর্ডার ভাগ করছে। ভারতীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সেই অর্ডারের একটি অংশ বাংলাদেশে সরিয়ে নেওয়াই হবে সবচেয়ে সহজ সিদ্ধান্ত।
এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেছেন, ইউরোপীয় বাজারে ভারতের গার্মেন্টস পণ্যের ওপর শুল্ক সুবিধার পরিবর্তন নতুন বা শাস্তিমূলক কোনও সিদ্ধান্ত নয়। এটি মূলত জিএসপি সুবিধার ধারাবাহিকতা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যমান বাণিজ্য ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই কার্যকর হয়েছে।
বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “আসলে এখানে নতুন করে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জিএসপি বেনিফিটের যে ধারাবাহিক সিস্টেম ইউরোপের রয়েছে, সেটারই একটি অংশ হিসেবে বিষয়টি হয়েছে। নতুন করে আমরা বিষয়টি জানতে পারছি মাত্র।”
তিনি জানান, ভারতের তৈরি পোশাক পণ্যে ইউরোপীয় বাজারে আগেই গড়ে প্রায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ শুল্ক আরোপিত ছিল। অপরদিকে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ইবিএ (এভরিথিং বাট আর্ম) সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত থাকায় ভারত তুলনামূলকভাবে শুল্ক সুবিধা পেতো আরএসপি ব্যবস্থার মাধ্যমে। সেই সুবিধার আওতায় ভারত একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শুল্ক ছাড় পেতো।
বর্তমানে সেই সুবিধা উঠে যাওয়ায় ভারতের পোশাক রফতানিতে গড়ে প্রায় আড়াই শতাংশের মতো অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হতে পারে বলে মনে করেন মহিউদ্দিন রুবেল। তিনি বলেন, “গড়ে আড়াই শতাংশ শুল্ক বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি ছোট মনে হলেও বাস্তবে এক শতাংশ শুল্ক বাড়াও এখন বড় বিষয়। কারণ ইউরোপের বাজারে ভারত আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠেছিল।”
তার মতে, ভারতের ওপর এই অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ ইউরোপীয় বাজারে তাদের প্রতিযোগিতাকে কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত করবে। এতে করে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে যেতে পারে।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “বাংলাদেশ এমনিতেই ইউরোপের বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা চাপের মধ্যে ছিল। সেই জায়গায় ভারতের জন্য পরিস্থিতি একটু কঠিন হলে সেটি বাংলাদেশের জন্য স্বাভাবিকভাবেই ভালো দিক হিসেবেই দেখা যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, ‘‘এই সুবিধাটি স্থায়ী নয়—এটি মূলত একটি সাময়িক সুযোগ। কারণ ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত হলে ধাপে ধাপে শুল্ক কমে আসবে। ফলে এফটিএ কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্তই বাংলাদেশ এই শুল্ক সুবিধার সুফল ভোগ করতে পারবে।
শুধু পোশাক নয়, নতুন খাতেও সম্ভাবনা
বাংলাদেশের জন্য সুযোগ কেবল গার্মেন্টসেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের শুল্ক সুবিধা হারানোর প্রভাবে ইউরোপে যে পণ্যগুলো প্রতিযোগিতায় পড়বে, তার মধ্যে রয়েছে—চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ও হালকা প্রকৌশল পণ্য।
এই খাতগুলোতে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, যা এখন অর্ডার টানার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
বড় ঝুঁকি: এলডিসি উত্তরণ
তবে এই সম্ভাবনার বিপরীতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এলডিসি উত্তরণ। এলডিসি পরবর্তী সময়ে যদি বাংলাদেশ ইইউ’র জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়— তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই দেশটিও ভারতের মতো শুল্কচাপে পড়তে পারে। এ কারণে এই সময়টা শুধু অর্ডার বাড়ানোর নয়, বরং—ক্রেতার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি ও পণ্যের বৈচিত্র্য। এসব ক্ষেত্রে ভিত্তি গড়ে তোলার সময়।
সিব্যাম ও পরিবেশ মান: প্রস্তুতির সুযোগ
ইইউর কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম) ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রফতানিতেও প্রভাব ফেলবে। তবে তুলনামূলক বাংলাদেশের গ্রিন ফ্যাক্টরি সংখ্যা বেশি হওয়ায়, সঠিক প্রস্তুতি নিলে এটি ঝুঁকির বদলে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধায় পরিণত হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এখনই কার্বন ফুটপ্রিন্ট পরিমাপ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
ভারতের শুল্ক বাড়া মানেই বাংলাদেশের দামের সুবিধা
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের মতো অত্যন্ত মূল্যসংবেদনশীল বাজারে ১-২ শতাংশ শুল্ক পরিবর্তনও অর্ডার স্থানান্তরের জন্য যথেষ্ট। আগে যেখানে ভারতীয় গার্মেন্টস পণ্যে গড়ে ৯.৬ শতাংশ শুল্ক দিতে হতো, এখন সেখানে দিতে হবে পূর্ণ ১২ শতাংশ। এই বাড়তি খরচ সরাসরি পণ্যের দামে প্রতিফলিত হবে।
অপরদিকে, বাংলাদেশ ইউরোপে এখনও ডিউটি-ফ্রি ও কোটামুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। ফলে একই মানের পণ্যে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা স্বাভাবিকভাবেই মূল্য সুবিধায় এগিয়ে থাকবে।
এক ইউরোপীয় সোর্সিং এজেন্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের কাছে দামই শেষ কথা। ভারতীয় সরবরাহকারীর দাম যদি বাড়ে, তখন বাংলাদেশই স্বাভাবিক বিকল্প হয়ে ওঠে।”
জিএসপি কেন স্থগিত
জিএসপি হলো ইইউ’র একতরফা বাণিজ্য সুবিধা, যার আওতায় উন্নয়নশীল দেশগুলো কম শুল্কে বা শুল্কমুক্তভাবে ইউরোপে পণ্য রফতানি করতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনও পণ্যে রফতানি একটি নির্ধারিত সীমা টানা তিন বছর অতিক্রম করলে, সেই খাতে ‘গ্র্যাজুয়েশন’ নীতির আওতায় সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়।
ইউরোপীয় কমিশনের সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ গৃহীত কমিশন ইমপ্লিমেন্টিং রেগুলেশন (ইইউ) অনুযায়ী, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও কেনিয়াকে ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের জন্য জিএসপি সুবিধা থেকে গ্র্যাজুয়েট করা হয়েছে।