Image description

সরকারি চাকরি বিধি-বিধান ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনা অমান্য করে বেতনের সঙ্গে বাসার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ভাতা নিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষক-কর্মকর্তারা। শুধু তাই নয়, বেতন, পেনশন ও আবাসন সুবিধা সংক্রান্ত চার ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়ম হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। এসব অনিয়মের ফলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি টাকার বেশি।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২০২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষা সম্পন্ন করেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন বিল, পেনশন রেজিস্টার, কোয়ার্টার বরাদ্দের নথি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হিসাবপত্র পর্যালোচনা করে ৩৬ ধরনের আপত্তি জানিয়েছে অধিদপ্তর।

যদিও ঢাবির হিসাব পরিচালক মোহাম্মাদ সাইফুল ইসলামের দাবি, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়ের বাইরেও ডিন, চেয়ারম্যানসহ অন্যরা কোয়ার্টারে অফিসের কাজ করে থাকেন। ফলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়। সেজন্য সিন্ডিকেটে বিদ্যুৎ বিলের বিষয়টি ছাড় করা হয়েছে।’ তার দাবি, ‘কর্মকর্তাদের অবসরের বয়স বৃদ্ধি, কোয়ার্টারে থেকেও বাড়ি ভাড়া নেওয়াসহ সব বিষয়ের সিদ্ধান্ত সিন্ডিকেটে নেওয়া হয়েছে। সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত পাস হওয়ায় তিনি অর্থ ছাড় করেছেন।’

সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে ঢাবির কর্মকর্তাদের অবসর গ্রহণের বয়স ৬২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ২০২০ থেকে ২০২৪ অর্থবছর পর্যন্ত কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত বেতন-ভতা দেওয়া হয়েছে। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১০ কোটি ৬ লাখ ৪৬ হাজার ১৯৮ টাকা।

কোয়ার্টারে থেকে বিদ্যুৎ বিল নেওয়া যায় না, চাকরি থেকে অবসরের বয়স ৫৯ বছর- এসব ক্ষেত্রে অনিয়মের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছিলেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘বিষয়গুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই জানে। অডিট অধিদপ্তরের আপত্তি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’ বিষয়গুলো সমাধান করার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্টায়ারে থেকেও বিদ্যুৎ ভাতা গ্রহণ
শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে বসবাসরত শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের সঙ্গে অনিয়মিতভাবে বিদ্যুৎ ভাতা দেওয়া হয়েছে। এতে এক অর্থ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

ইউজিসির ২০২৩ সালের ২৩ মে’র ৩৭.০১.০০০০.০৫২.২০.০১৫.২০–১৫৬৭(১) নম্বর পরিপত্র অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে বসবাসকারীদের বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস বিলের ওপর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো ধরনের ভর্তুকি দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে ইউজিসির এ নির্দেশনা উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে বসবাসরত শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদ্যুৎ ভাতা দেওয়া হয়েছে, যা আর্থিক শৃঙ্খলা পরিপন্থী বলে জানিয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর।

অবসর বয়স ৬২ বছর ধরে অতিরিক্ত বেতন দেওয়ায় ক্ষতি ১০ কোটি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে অবসরগ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিয়ম পেয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে ঢাবির কর্মকর্তাদের অবসর গ্রহণের বয়স ৬২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ২০২০ থেকে ২০২৪ অর্থবছর পর্যন্ত কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত বেতন-ভতা দেওয়া হয়েছে। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১০ কোটি ৬ লাখ ৪৬ হাজার ১৯৮ টাকা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এসআরও নম্বর ৩০৫-আইন/২০১৯ অনুযায়ী, একজন সরকারি কর্মচারীর অবসর গ্রহণের নির্ধারিত বয়স ৫৯ বছর। তবে ঢাবির ক্ষেত্রে এই বিধান অনুসরণ করা হয়নি। বিধিবহির্ভূতভাবে কর্মকর্তাদের চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করে অর্থ পরিশোধ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

অতিরিক্ত পেনশন ও আনুতোষিকে ক্ষতি কোটি টাকা
অবসরের বয়স সংক্রান্ত একই বিধি লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতায় অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত পেনশন ও আনুতোষিক প্রদান করায় কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বেতন, বিল, রেজিস্টার ও পেনশন সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে এ খাতে ১ কোটি ১৬ লাখ ৬৮ হাজার ৫৯০ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবসর গ্রহণের নির্ধারিত বয়স ৫৯ বছর ধরে হিসাব করা হলে এই অর্থ পরিশোধের সুযোগ থাকত না।

কোয়ার্টারে থেকেও নির্ধারিত হারে বাড়িভাড়া উত্তোলনে ক্ষতি ৫ কোটি ৭৫ লাখ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে বসবাস করার পরও শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পূর্ণ হারে বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা নিয়েছেন। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর জানিয়েছে, চাকরি [স্ব-শাসিত (Public Bodies) এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ] (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫-এর অনুচ্ছেদ ১৬(২) অনুযায়ী, সরকারি বাসস্থানে বসবাসকারী কোনো কর্মচারী বাড়িভাড়া ভাতা পাওয়ার যোগ্য নন।

একই আদেশের অনুচ্ছেদ ১৬(৪) অনুযায়ী ভাড়াবিহীন বাসস্থানে বসবাসকারীরা বাড়িভাড়া ভাতা প্রাপ্য হবেন না। এসব বিধান লঙ্ঘন করে ভাতা প্রদান করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫ কোটি ৭৫ লাখ ১৬ হাজার ৩০৯ টাকা।

শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর এসব অনিয়মের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নিরীক্ষা আপত্তি উত্থাপন করেছে। আপত্তিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান অনুসরণ না করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের আলোকে দায়িত্বশীলদের শনাক্ত করা, ক্ষতিগ্রস্ত অর্থ আদায় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনাধীন রয়েছে।

জানতে চাইলে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. কামরুল আলম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিট আপত্তিগুলো নিয়ে কাজ চলছে। পুরো কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’

সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে তিনি লিখিত আবেদন করতে বলেন। বক্তব্য জানতে লিখিত আবেদনের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি স্পোকস পারসন না। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসিকে (প্রশাসন) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনিই আপনাদের সঙ্গে কথা বলবেন।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাবির প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।