Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে হঠাৎ করেই দেশের সব ধরনের সংগঠনের নির্বাচন স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকবে। ইসির যুক্তি—একই সময়ে একাধিক নির্বাচন হলে বিভ্রান্তি ও প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে। তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, শিক্ষাঙ্গন এবং পেশাজীবী মহলে নানা প্রশ্ন ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) ইসির উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেনের সই করা এক চিঠির মাধ্যমে দেশের সব রিটার্নিং কর্মকর্তাকে এ নির্দেশনা পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ নির্বিঘ্ন করতে পেশাজীবী সংগঠনসহ সব ধরনের সংগঠনকে তাদের নির্বাচন কার্যক্রম ১২ ফেব্রুয়ারির পর আয়োজন করতে হবে।

ইসির এই সিদ্ধান্তের আওতায় পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচন, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন, সাংবাদিক সমিতি, বণিক সমিতি, সমবায় সমিতি ও ট্রেড ইউনিয়নসহ প্রায় সব ধরনের সংগঠন। ফলে যেসব নির্বাচনের তফসিল আগেই ঘোষণা হয়েছিল কিংবা যেগুলো আয়োজনের শেষ পর্যায়ে ছিল, সেগুলোও স্থগিত হয়ে গেছে।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনই কেন প্রশ্নের কেন্দ্রে

ইসির সিদ্ধান্তের সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। বিশেষ করে যেসব ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন পর ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেখানে এই নির্দেশনা নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

এ সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, পূর্বনির্ধারিত শাকসু নির্বাচন ইসির নির্দেশে স্থগিতের ঘোষণা এসেছে। তিনি অভিযোগ করেন, এর আগেও পরিকল্পিতভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বানচাল করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার—ছাত্র সংসদ নির্বাচন—কেবল হারার ভয়ে একটি গোষ্ঠী হতে দিতে চায় না।’

তিনি আরও বলেন, জুলাই–পরবর্তী সময়ে প্রতিটি ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা সরকারের দায়িত্ব ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, একের পর এক অজুহাতে সেই নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

শাবিপ্রবি উত্তাল

ইসির ঘোষণার পরপরই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) বিক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর সোমবার (১৩ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে হল থেকে বেরিয়ে মিছিল নিয়ে শাকসু কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন তাঁরা।

‘শাকসু আমার অধিকার’, ‘২০ তারিখেই শাকসু চাই’, ‘টালবাহানা মানি না’—এ ধরনের স্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা।

শাবিপ্রবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাঈম সরকার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। প্রশাসন যদি অন্ধভাবে ইসির সিদ্ধান্ত মেনে নেয়, তবে সেটি শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে ব্যর্থতারই প্রমাণ হবে।

ছাত্রশিবিরের শাখা সেক্রেটারি মাসুদ রানা তুহিন বলেন, প্রথমে নভেম্বর, পরে ১৭ নভেম্বর, এরপর ২০ জানুয়ারি—বারবার তারিখ বদলে নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এর আগে নির্বাচন কমিশনাররা নিজেরাই বলেছিলেন, জাতীয় নির্বাচন শাকসু নির্বাচনের পথে বাধা হবে না। অথচ এখন হঠাৎ করেই সারা দেশে সব নির্বাচন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অন্য ক্যাম্পাসেও একই অভিযোগ

শুধু শাবিপ্রবি নয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (ব্রাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন পরিকল্পিতভাবে বানচালের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ‘বেরোবি শিক্ষার্থী পরিষদ’ প্যানেলের প্রার্থীরা। ইসির এ সিদ্ধান্ত আসার পরে তারাও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কয়েক দফা তারিখ পিছিয়ে শেষ পর্যন্ত ২৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন নির্ধারণ করার পেছনে ষড়যন্ত্র দেখছেন ‘বেরোবি শিক্ষার্থী পরিষদ’ এর প্রার্থীরা। তাদের ভাষ্য, সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করলে ব্রাকসু নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনাস্থা থেকেই গেছে।

সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা বনাম গণতান্ত্রিক চর্চা

নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, একসঙ্গে একাধিক নির্বাচন হলে ভোটার ও প্রশাসনের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন—জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ছাত্র সংসদ কিংবা পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনের মধ্যে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কি একই রকম?

বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র সংসদ নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকার ফলে ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক চর্চা দুর্বল হয়েছে। এ অবস্থায় জাতীয় নির্বাচনকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে সব নির্বাচন স্থগিত করলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।

জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই প্রস্তুতির নামে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো আরও পিছিয়ে দেওয়া হলে, তার রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্যও কম নয়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।