রাজবাড়ীর বিভিন্ন দাখিল মাদ্রাসায় পরীক্ষার কয়েক দিন আগেই প্রশ্ন ও উত্তর ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
প্রশ্নপ্রত্র ফাঁস হওয়া নিয়ে অনুসন্ধান করেছে আগামীর সময়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেলার অন্তত ২৫টি মাদ্রাসায় একই গাইড কোম্পানির প্রশ্নপত্র ব্যবহার করায় পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে গেছে।
জেলায় দাখিল মাদ্রাসা রয়েছে মোট ৪৮টি। এর মধ্যে অন্তত ২৫টিতে আল ফাতাহ গাইড কোম্পানির প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে অনুসন্ধানে। এ ছাড়া আরও ১২টি মাদ্রাসায় ব্যবহার করা হয়েছে লেকচার প্রকাশনীর প্রশ্নপত্র।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অধিকাংশ দাখিল মাদ্রাসা নিজস্বভাবে প্রশ্ন প্রণয়ন না করে আল ফাতাহ, লেকচার, পাঞ্জেরীসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক গাইড প্রকাশনীর প্রশ্নপত্র ব্যবহার করে। এসব প্রশ্নপত্র বিনামূল্যে সরবরাহ করায় একই প্রশ্ন ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয় একাধিক প্রতিষ্ঠানে।
এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রবিউলস এডুকেয়ার, এনআর আপডেট বিডিসহ কয়েকটি ইউটিউব চ্যানেলে পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন ও উত্তর প্রকাশ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি চ্যানেলের প্রায় অর্ধলক্ষ গ্রাহক রয়েছে। ভিডিওগুলোর মন্তব্যেও অনুরোধ করতে দেখা গেছে পরবর্তী পরীক্ষার প্রশ্ন প্রকাশের।
২০২৬ সালের দাখিল দশম শ্রেণির প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা এবং বিভিন্ন মাদ্রাসার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার রুটিনের সঙ্গে ইউটিউব ভিডিও প্রকাশের সময় মিলিয়ে দেখা গেছে, আল ফাতাহ গাইড কোম্পানির প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া অন্তত ২৫টি প্রতিষ্ঠানের প্রশ্নগুলো প্রকাশ হয়েছে পরীক্ষার আগেই।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, নবম শ্রেণির গণিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ৫ জুলাই। কিন্তু প্রশ্নপত্রের প্রথম পৃষ্ঠা ১৯ জুন এবং দ্বিতীয় পৃষ্ঠা ২০ জুন প্রকাশ করা হয় ইউটিউবে। অর্থাৎ পরীক্ষার প্রায় ১৫ থেকে ১৬ দিন আগেই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যায় প্রশ্ন। একইভাবে নবম শ্রেণির কুরআন মাজিদ ও তাজভীদ বিষয়ের পরীক্ষা ২৯ জুন হলেও প্রশ্ন ও উত্তর প্রকাশ করা হয় ২৬ জুন। ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষার ৯ জুলাই। প্রশ্ন ও উত্তর প্রকাশ করা হয় এর একদিন আগে ৮ জুলাই। ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষার দুই দিন আগে প্রকাশিত হয় প্রশ্ন।
দশম শ্রেণির ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ৫ জুলাই। কিন্তু ২ জুলাই, অর্থাৎ তিন দিন আগেই উত্তরপত্রসহ প্রশ্ন ইউটিউবে পাওয়া যায়। সপ্তম শ্রেণির বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা ছিল ৩০ জুন। এক দিন আগে ২৯ জুন প্রশ্ন প্রকাশ করা হয়।
ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষা ৫ জুলাই হলেও প্রশ্ন প্রকাশ করা হয় ১ জুলাই। ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা ৬ জুলাই অনুষ্ঠিত হওয়ার তিন দিন আগে, ৩ জুলাই প্রশ্ন প্রকাশ করা হয়। অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ৯ জুলাই। অথচ ২৩ জুন, অর্থাৎ ১৬ দিন আগে প্রশ্ন প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞান পরীক্ষার আগের দিন, ১২ জুলাই উত্তরপত্রসহ প্রশ্ন প্রকাশ করা হয়। পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ১৩ জুলাই।
বালিয়াকান্দি উপজেলার ১২টি মাদ্রাসায়ও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পারমিস সুলতানা এবং পরীক্ষা কমিটির সভাপতি মুরাদুল ইসলামের সই রুটিন অনুযায়ী ১ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও বিভিন্ন বিষয়ের প্রশ্ন তিন থেকে ১৯ দিন আগেই রবিউলস এডুকেয়ার ইউটিউবে প্রকাশ করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে দেখা গেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীরা যে প্রশ্নপত্র পেয়েছে, তার সঙ্গে আগে প্রকাশিত ইউটিউবের প্রশ্ন হুবহু মিলেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছে, তারা ইউটিউবে পাওয়া প্রশ্ন দেখেই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন, তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে প্রশ্ন প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও মাদ্রাসা সমিতির সিদ্ধান্তের কারণে তা সম্ভব হয় না। একটি সিন্ডিকেটের কারণে তারা অসহায়।
বালিয়াকান্দি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পারমিস সুলতানা আগামীর সময়কে বলেছেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্বভাবে প্রশ্ন প্রণয়ন করার কথা। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান গাইড কোম্পানির প্রশ্ন ব্যবহার করছে, যা গুরুতর অনিয়ম।
তিনি জানান, যদি সেই প্রশ্ন পরীক্ষার আগেই ইউটিউবে প্রকাশ হয়ে থাকে, তবে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
বালিয়াকান্দি উপজেলা মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মুরাদুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, সিলেবাস অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজস্বভাবে প্রশ্ন তৈরি করে। গাইড কোম্পানির প্রশ্ন কেনার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
রাজবাড়ী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মজিদ আগামরি সময়কে জানিয়েছেন, বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। এরপরও যদি গাইড কোম্পানির প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং সেই প্রশ্ন আগেই ইউটিউবে প্রকাশ হয়, তাহলে অবশ্যই তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন আগামীর সময়কে জানান, এমন ঘটনা কাম্য নয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।