বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) আইন বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসের বাইরে নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে র্যাগিং দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একই বিভাগের ইমিডিয়েট সিনিয়র ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। এ সময় তাদের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান ভুক্তভোগীরা। বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) বেলা ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ভোলারোডে বিটাক ভবনের নির্মাণাধীন একটি ভবনের নিচতলায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় নবীন শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে ইমিডিয়েট সিনিয়রদের বরিুদ্ধে। এ সময় এক নারী শিক্ষার্থী অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। কয়েকজন আতঙ্কিত হয়ে কান্নাকাটি করেন বলে জানা গেছে।
র্যাগিংয়ের শিকার একাধিক শিক্ষার্থী জানান, তাদেরকে কুকুরের থেকেও নিম্ন বলে সম্বোধন করা হয়েছে। ক্যাম্পাসের কুকুর দেখলেও সালাম দিতে বলে। সাথে বিভিন্ন হুমকি ধামকি ও গালাগালি দেয়া হয়েছে। ফোন, মানিব্যাগ ও ঘড়ি পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হয়। কয়েকজন ছেলে শিক্ষার্থী এটা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করায় তাদেরকে সিনিয়ররা মারার জন্য হুমকি দেয়।
এগুলো সম্পর্কে শিক্ষকরা অবগত আছে জানিয়ে তারা বলেন, শিক্ষকদের কাছে বলেও কোনো লাভ নেই বলে জানানো হয় তাদের। শেষে হুমকি দেয়া হয়, কেউ যদি জানায় তাহলে তার ক্যাম্পাস জীবন ‘হেল’ করে দেওয়া হবে। র্যাগিংয়ের শিকার নবীন শিক্ষার্থীরা ভয়ে কেউ নাম প্রকাশ করতে চাননি। বিষয়টি ভয়ে ও আতঙ্কে শিক্ষকদের পর্যন্ত জানানি বলে জানান তারা।
ভুক্তভোগী এক নবীন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ওয়ারিন্টেশনে সিনিয়ররা আমাদের অনেক আপ্যায়ন করেছে, আমাদের সাথে ভালো ব্যবহার করছে ক্লাসরুমে। কিন্তু তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটের সামনে একটি পাঁচ তলা কনস্ট্রাকশন বিল্ডিংয়ে নিয়ে গিয়ে আমাদের পাঁচ ঘণ্টা মেন্টালি ট্রমা দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্নভাবে হুমকি ধামকি ও ভয়ভীতি দেখিয়েছে। একজন মেয়ে অজ্ঞান পর্যন্ত হয়ে যায় এবং কয়েকজন মেয়ে কান্না করে দেয়ার পরও এসব চালানো হয়। আমাদের সাথে এসব যে করা হয়েছে, এগুলো শিক্ষকদের সাথে যেন না বলি সেজন্যও আমাদেরকে শাসিয়ে তারপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে।’
ভুক্তভোগী এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, ‘সিনিয়রা আমাদের বিভিন্ন রেস্ট্রিকশন দিয়েছে, বাসে পর্যন্ত উঠতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আমাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং ৫ ঘণ্টার বেশি সময় বিল্ডিংয়ের মধ্যে শ্বারুদ্ধকর পরিবেশে আটকে রেখে নানাভাবে র্যাগিং ও বুলিং করেছে।’
আরেক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, ‘সিনিয়রদের র্যাগিংয়ে নার্ভাস হয়ে এক মেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তারপর ওকে সরিয়ে ভাইয়েরা আবার শুরু করে। পরবর্তীতে আরও কয়েকজন মেয়ে কান্না শুরু করে। মেয়েদের সাথেও ঝাড়ি দিয়ে কথা বলছে।’
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আরও বলেন, ‘আমাদেরকে কুকরদের থেকেও নিম্ন বলে সম্বোধন করা হয়েছে এবং কুকুরকেও আমাদের সালাম দিতে বলা হয়েছে। এগুলোর লিড দিয়েছে ইমিডিয়েট সিনিয়র ব্যাচের সিআর।’
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী তৌফিক ওমর অপু বলেন, ‘আমরা ক্লাসে স্যারদের অনুমতি নিয়ে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ওদের সাথে কথা বলি এবং খাবার বিতরন করি। এর বাইরে ওদের নিয়ে বসা বা অন্য কিছু আমি বা আমার ব্যাচ করেনি। অভিযোগটি মিথ্যা এবং বানানো।’
অভিযুক্ত আর এক শিক্ষার্থী জয় বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ একেবারেই মিথ্যা। ওদের আমরা ক্যাম্পাসের বাইরে কোথাও নেইনি। আমরা ক্লাসরুমে বসে অনুষ্ঠান করে ভার্সিটির মধ্যেই ওদের সাথে কথা বলে ওদের ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু এই যে অভিযোগটি করা হয়েছে, এটা একেবারেই ভিত্তিহীন।’
আইন বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক সরদার কায়সার আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, ‘বিষয়টির মৌখিক কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। এটি জানার পর থেকে এটি নিয়ে আমি কাজ করে যাচ্ছি। এ বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত করে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেব। র্যাগিয়ের বিষয়ে আইন বিভাগের অবস্থান একদম জিরো টলারেন্স। ঘটনা ছোট হোক বড় হোক, তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ড. গাজী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের সাক্ষ্য ও এভিডেন্সের ভিত্তিতে ২-১ কর্ম দিবসের মধ্যে দৃশ্যমান পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গ্রহণ করবে। অতিসত্বর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে র্যাগিং মুক্ত ক্যাম্পাস হিসেবে ঘোষণা করতে গুরুত্ব সহকারে কাজ চলমান আছে। র্যাগিং ইস্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান জিরো টলারেন্স।’