শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার ৮৭ নম্বর আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে মারধরের একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার পর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক একে অপরের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। সহকারী শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে তার স্ত্রীর অবৈধ সম্পর্কের জেরে দীর্ঘদিন ধরে তার সংসার ভেঙে পড়েছে এবং তিনি নানা হয়রানির শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক অভিযোগ, প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে তার স্ত্রীর অনৈতিক সম্পর্কের থাকাই দীর্ঘদিন থেকেই তার সাথে ওই শিক্ষকের ঝামেলা ছিল। সেই জেরে ওই শিক্ষকের ওপর হামলা চালিয়েছেন তিনি। এ ঘটনায় উভয় অভিযোগেরই তদন্ত শুরু করেছে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ।
ঘটনার পর সহকারী শিক্ষকের অভিযোগসংবলিত নথি, অডিও রেকর্ড এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের হাতে এসেছে। যদিও এছবিগুলো এবং তথ্য-উপাত্তগুলো এআই দিয়ে তৈরি বলছে প্রধান শিক্ষক। এদিকে প্রধান শিক্ষক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, উভয় অভিযোগই তদন্তাধীন এবং তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও করা হয়।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (৩ জুলাই) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে ৮৭ নম্বর আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলী আসাদ মিয়া বলেন, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের কাজে অনিয়ম করে আসছেন। তিনি নিয়মিত দেরিতে বিদ্যালয়ে আসেন এবং কাউকে কিছু না জানিয়ে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। একাধিকবার মৌখিকভাবে সতর্ক করা হলেও তিনি সংশোধন হননি। চলতি বছরে তিনি ইতোমধ্যে ১২ দিন নৈমিত্তিক ছুটি ভোগ করেছেন। গত ১ জুলাই সকাল ১১টার দিকে কাউকে কিছু না বলে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন এবং আর ফিরে আসেননি।
প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আমার প্রায় ২০ মাস, অর্থাৎ দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বিরোধ চলছে। তিনি আমার স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়েছেন। এর কারণে আমার সংসার দুইবার ভেঙেছে। তিনি আমার স্ত্রীকে ব্ল্যাকমেইল করে আমার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করিয়েছেন। গত দেড় বছর ধরে আমি সেই মামলা পরিচালনা করছি।—দেলোয়ার হোসেন, সহকারী শিক্ষক, আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
অভিযোগে প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, পরদিন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ২২ জন প্রধান শিক্ষককে নিয়ে একটি জরুরি ছিল। পরে সকাল ৯টা ৫ মিনিটে সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন তার কাছে নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করেন। তিনি ছুটি না নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে পরিদর্শন ও সভার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু দেলোয়ার হোসেন তার কথা না শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে গালিগালাজ করতে থাকেন এবং একপর্যায়ে তার গলা চেপে ধরেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এরপর তিনি এলোপাতাড়ি কিল, ঘুষি ও লাথি মারতে থাকেন এবং বলতে থাকেন। পরে উপস্থিত অন্যান্য শিক্ষক তাকে উদ্ধার করেন। ঘটনার সময় বিদ্যালয়ের অন্যান্য সহকারী শিক্ষক এবং দপ্তরি-কাম-প্রহরী উপস্থিত ছিলেন। নিজের নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে তিনি ঘটনার তদন্তপূর্বক সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
এ বিষয়ে ৮৭ নম্বর আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলী আসাদ মিয়া দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ঘটনাটি গত বৃহস্পতিবার সকালে ঘটে। বর্তমানে আমরা ডিজিটাল হাজিরা দিই। সেদিন সকাল ৯টার মধ্যে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে হাজিরা সম্পন্ন করি। এরপর সব শিক্ষককে ক্লাসে চলে যেতে বলি, কারণ সেদিন বিদ্যালয় পরিদর্শনের কথা ছিল এবং বিকেলে একটি সভাও নির্ধারিত ছিল। এ সময় সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন আমার কাছে ছুটির আবেদন করেন। আমি তাকে বলি, যদি ছুটি প্রয়োজন হয় তাহলে আগের দিন জানানো উচিত ছিল। সেদিন সকাল ৯টার সময় ছুটির আবেদন গ্রহণ করা সম্ভব নয়, কারণ বিদ্যালয় ভিজিট ও বিকেলের মিটিং ছিল। এ কথা বলার পর তিনি আমাকে গালিগালাজ করেন। আমি এর প্রতিবাদ করি।’
প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘পরে আমি কক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় তিনি চেয়ার থেকে উঠে এসে আমার ওপর হামলা করেন। তিনি আমার কলার ধরে কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন এবং গলা চেপে ধরেন। পরে উপস্থিত শিক্ষকরা আমাকে উদ্ধার করেন। এরপর আমি কক্ষ থেকে বের হয়ে সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানাই। তাদের পরামর্শে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিই। পরে থানায় গিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করি।’
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর আমরা সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে যাচ্ছি। ঘটনার বিস্তারিত জেনে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে—শাহ মো. ইকবাল মনসুর, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, শরীয়তপুর
সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ প্রসঙ্গে মো. আলী আসাদ মিয়া বলেন, ‘এ অভিযোগ সত্য নয়। তিনি আমার সহকারী শিক্ষক হওয়ায় তাদের পারিবারিক সমস্যার বিষয়টি জানতাম। বিয়ের পর থেকেই প্রায় ১০ বছর ধরে তাদের দাম্পত্য কলহ চলছিল। বিষয়টি নিয়ে তারা বিচ্ছেদের দিকেও গিয়েছিলেন। অন্য শিক্ষকরা আমাকে তাদের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করতে বললে আমি তাদের মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরে তিনি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। তিনি আমার মোবাইল চুরি করে এবং তার স্ত্রীর মোবাইলের কিছু তথ্য ব্যবহার করে ইমো চ্যাট ও কল রেকর্ড সম্পাদনা করে অভিযোগ তৈরি করেছেন। ইমোতে সাধারণত নাম দেখা যায়, মোবাইল নম্বর নয়। কিন্তু অভিযোগে সম্পাদনা করে নম্বর সংযুক্ত করা হয়েছে। এসব বিষয় দেখিয়ে তিনি এবং তার স্ত্রী আমার কাছে টাকা দাবি করেছেন এবং বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেইল করেছেন। তবে এগুলো ভিন্ন বিষয়। মূল ঘটনা হলো, ঘটনার দিন তিনি অনিয়ম করেছিলেন।’
নিজের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে এবং শোকজ করা হয়েছিল। তবে বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে বিষয়টির তদন্ত হচ্ছে। আগামী ৬ জুলাই তদন্ত হওয়ার কথা রয়েছে।’
দেলোয়ার হোসেনের বদলি প্রসঙ্গে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘তিনি আমার বিদ্যালয়ে নিয়মিত অনিয়ম করতেন। ঠিকমতো বিদ্যালয়ে আসতেন না, ক্লাস নিতেন না এবং ইচ্ছামতো চলে যেতেন। এসব বিষয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পর তাকে পাশের একটি বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে পাঠানো হয়। পরে শুনেছি, সেখানে একজন সহকারী শিক্ষকের সঙ্গে নারী-সংক্রান্ত অভিযোগ ওঠে। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকও শিক্ষা অফিসে অভিযোগ করেন। এরপর তাকে আবার আমার বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আমার মনে হয়, কর্তৃপক্ষ তাকে আমার বিদ্যালয়ে না দিয়ে অন্য কোনো বিদ্যালয়ে দিলে হয়তো এই সংঘাতের সৃষ্টি হতো না।’
অভিযোগের বিষয়ে সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আমার প্রায় ২০ মাস, অর্থাৎ দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বিরোধ চলছে। তিনি আমার স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়েছেন। এর কারণে আমার সংসার দুইবার ভেঙেছে। তিনি আমার স্ত্রীকে ব্ল্যাকমেইল করে আমার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করিয়েছেন। গত দেড় বছর ধরে আমি সেই মামলা পরিচালনা করছি।’
তিনি বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক আমার স্ত্রীকে ব্যবহার করে অধিদপ্তর, ডিসি অফিস, ডিডি অফিসসহ বিভিন্ন জায়গায় আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন। এসব কারণে আমি তিন সন্তান নিয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েছি। মামলা ও অন্যান্য ঝামেলা সামলাতে গিয়ে আমি প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়েছি। আমি তার বিরুদ্ধেও অধিদপ্তরের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছি। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও রয়েছে। এ কারণে তিনি আমার প্রতি ক্ষুব্ধ।’
ঘটনার দিনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার আমার সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার আগে দুই দিন আমাদের বাসায় গ্যাস ছিল না। গ্যাস কেনার মতো টাকাও আমার কাছে ছিল না। এমনকি হোটেলে নিয়ে একবেলা খাওয়ানোর সামর্থ্যও ছিল না। আগের রাতে মসজিদ থেকে খিচুড়ি এনে রেখেছিলাম। আমার সন্তান সেটিই সকাল, দুপুর ও রাতে খেয়েছিল। পরে রাতে তার পেটে সমস্যা দেখা দেয়। সকালে তাকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার প্রয়োজন হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমি বিদ্যালয়ে গিয়ে সবার স্বাক্ষরের সময় প্রধান শিক্ষকের কাছে একটি ছুটির আবেদন দিই। কিন্তু তিনি আমাকে ছুটি দেননি। আমার ধারণা, তিনি মনে করতেন আমি ছুটি নিয়ে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করতে যাই, তাই তিনি ছুটি দিতে চাননি।’
দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘২৭ জুন এই বিদ্যালয়ে ফেরার পর তিন দিনের মধ্যেই আমার বিরুদ্ধে অফিসে অভিযোগ দেওয়া হয় যে আমি নিয়মিত ক্লাস করি না এবং বিভিন্ন অনিয়ম করি। কিন্তু আমার পারিবারিক পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন। আমার তিনটি সন্তান রয়েছে। ছোট সন্তানের বয়স এখনো পাঁচ বছর হয়নি। গত দেড় বছর ধরে আমার স্ত্রী আমার সঙ্গে থাকেন না। এত চাপের মধ্যে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। এমনকি একসময় আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলাম।’
বেদরগঞ্জ উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. রিপন মিঞা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছেন জেলা শিক্ষা অফিস। এছাড়াও উপজেলা নির্বাহী অফিসারও বলেছেন তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, কাল (৬ জুলাই) এটি তদন্ত করতে মানিকগঞ্জ থেকে একজন কর্মকর্তা আসবেন।
এ বিষয়ে শরীয়তপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহ মো. ইকবাল মনসুর দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর আমরা সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে যাচ্ছি। ঘটনার বিস্তারিত জেনে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে সহকারী শিক্ষকের স্ত্রীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওই বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে এবং প্রধান শিক্ষক দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’