Image description

দুর্লভ ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির গাছের জন্য বেশ আলোচিত রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)। সর্ব উত্তরের এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নয়নাভিরাম ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য হজম করছে দুর্নীতি নামের কীটপতঙ্গ। উপাচার্য আসে উপাচার্য যায়, বদলায় না চিত্র। পাঠদানে কৃতিত্বের জন্য পুরস্কারের পরিবর্তে তিরস্কৃত হয়েছেন সরকারি টাকা আত্মসাতের মামলায়। এ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা ছয় উপাচার্যের মধ্যে পাঁচজনের বিরুদ্ধেই উঠেছে অনিয়ম-দুর্নীিতর অভিযোগ।

‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি আর প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছেন একের পর এক উপাচার্য। এখন সময় পরিবর্তনের’— হয়রানির ভয়ে নাম না জানিয়ে ক্ষোভ উগরে দিলেন অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক।

উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে পড়া উত্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য ২০০৮ সালে রংপুরে স্থাপিত হয় বেরোবি। লক্ষ্য ছিল বিদ্যা-বুদ্ধিতে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়বে এই ক্যাম্পাসের নাম। কিন্তু হয়েছে উল্টোটা; একের পর এক উপাচার্যকে কারাগারে যেতে হয়েছে দুর্নীতির মামলায়। গ্রেপ্তার এড়াতে কেউ কেউ আছেন পালিয়ে বা গা-ঢাকা দিয়ে। তবে ব্যতিক্রমও ছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম উপাচার্য ড. লুৎফর রহমান ‘অতিরিক্ত সততার কারণে’ মাত্র সাত মাস টিকতে পেরেছিলেন বলে শোনা যায়। তিনি ছাড়া সব উপাচার্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও পূর্ণ করেছেন নির্দিষ্ট মেয়াদ। কারও কারও বিরুদ্ধে ‘সরকারকে ম্যানেজ’ করে অতিরিক্ত মেয়াদেও দায়িত্ব পালনের অভিযোগ আছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, দ্বিতীয় উপাচার্য ড. আবদুল জলিল মিয়ার বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন ছাড়া নিয়োগেরও অভিযোগ রয়েছে। প্রায় চার বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০১৩ সালের ৪ মে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে পালান কানাডায়। ২০১৭ সালের ২০ জুলাই রংপুরের একটি আদালতে তিনি হাজির হলে পাঠানো হয় কারাগারে। পরে জামিনে মুক্তি পান তিনি।

তৃতীয় ও চতুর্থ উপাচার্য এ কে এম নুরুন্নবী ও ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পের ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালের ১৮ জুন মামলা করেছে দুদক। এই মামলায় প্রকৌশলী, ঠিকাদারসহ পাঁচজন আসামি। তাদের মধ্যে ড. কলিমউল্লাহকে গত বছরের আগস্টে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তিনি এখন কারাগারে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে পঞ্চম উপাচার্য ড. হাসিবুর রশীদের সময়ে। তার বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য ও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ আছে। পাশাপাশি শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলারও আসামি। এই মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন তিনি।

সাবেক দুই উপাচার্য গ্রেপ্তারে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরাজ করছে স্বস্তি। সিএসই বিভাগের শিক্ষার্থী রহমত আলীর ক্ষোভ, ‘অপকর্ম করলে শাস্তি পেতেই হবে। তবে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আমরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছি, সেখানকার অভিভাবক দুর্নীতিবাজ হলে আমাদের ভবিষ্যতেও পড়ে নেতিবাচক প্রভাব।’

সঙ্গে অন্য অপরাধীদেরও গ্রেপ্তার চাইলেন বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শামসুর রহমান সুমন। তার ভাষ্য, উপাচার্যের সঙ্গে দুর্নীতি করে যারা ফায়দা নিয়েছেন, কমিশন পেয়েছেন, তাদেরও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

দুর্নীতির কারণে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি ও সুনামই ক্ষুণ্ন হয়নি, অবনতি হয়েছে মানেও। হয়রানির শিকার হওয়ার ভয়ে নাম প্রকাশ না করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বললেন, কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় তৎকালীন রেজিস্ট্রার শাহজাহান মণ্ডল, উপপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) এ টি জি এম গোলাম ফিরোজ, সহকারী রেজিস্ট্রার মোর্শেদুল আলম রনি ও সহ-পরিচালক (বাজেট) খন্দকার আশরাফুল আলমও আসামি ছিলেন। কিন্তু শুধু উপাচার্য ও রেজিস্ট্রার জেল খাটলেও অন্য তিনজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, যা রহস্যজনক।

একইভাবে নুরুন্নবী ও কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পের ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের মামলায় প্রকৌশলী ও ঠিকাদারসহ পাঁচজন আসামি। উপাচার্য দুজনকে আইনের আওতায় আনা হলেও অন্য তিনজন অপকর্ম চালাচ্ছেন দেদার— উল্লেখ করলেন তিনি।

তার অভিযোগ, অনিয়ম-দুর্নীতিতে ডুবে থাকায় শিক্ষায় মনোযোগ দিতে পারে না প্রশাসন। পড়াশোনার মান নিচে নেমে গেছে। এমনকি মানের দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি আসতে পারেনি আন্তর্জাতিক কোনো র‌্যাংকিংয়ে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের রংপুর মহানগর সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জুর ক্ষোভ, ‘উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে যারা কলঙ্কিত করেছেন, শাস্তিই তাদের প্রাপ্য। বেছে বেছে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের নয়, পদে থাকা কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে বন্ধ হবে না এই ধারা।’

অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে ষষ্ঠ উপাচার্য ড. শওকাত আলীর দাবি, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে তিনি বদ্ধপরিকর। আর বরদাশত করা হবে না কোনো ধরনের দুর্নীতি, পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত বা রাজনৈতিক প্রভাব।