ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমোর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর নানান ধরনের তথ্য সামনে আসছে। ঘটনাস্থল একটি ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধারের পর ত্রিভুজ প্রেমের কারণে ঘটনাটি ঘটেছে বলে ধারণা বিশ্ববিদ্যালয় ও তদন্ত সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, ঘটনার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের শ্রেণিকক্ষে অভিযুক্ত শিক্ষককে আরেক ছাত্রীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে ফেলেছিলেন মিমো, এমন তথ্য জানতে পেরেছেন। বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও আত্মহত্যার পেছনে এটি কারণ হতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।
মিমোর ফোনেও এ ধরনের নানান তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেলে বলে পরিবার ও পুলিশসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ইতোমধ্যে এসব তথ্য ও সুইসাইড নোটের ভিত্তিতে আত্মহত্যার প্ররোচনার দায়ে শিক্ষকের বিরুদ্ধে বাড্ডা থানায় একটি মামলা করেছে তার পরিবার। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তারের পর আদালতে প্রেরণ করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে তার এক সহপাঠীকে আটক করা হলেও পরে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
রবিবার (২৬ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর বাড্ডার নিজ বাসা থেকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় মিমোর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুদীপ চক্রবর্তী। শিক্ষকতার পাশাপাশি একজন নাট্য পরিচালকও ছিলেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার জনপ্রিয় লোকগাথা ‘আরব্য রজনী’ অবলম্বনে নির্মিত একটি নাটকও পরিচালনা করেছেন এ শিক্ষক। নাটকটির পোশাক পরিকল্পনায় (কস্টিউম ডিজাইন) ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমো। সে সুবাদে ওই শিক্ষকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান তিনি। ওই নাটকে অভিনয় করেছেন একই বিভাগের আরেক ছাত্রী।
সুদীপ স্যারকে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। ... (সহপাঠীর নাম) আর সুদীপ স্যার ভালো থাকো, স্যারের দেওয়া গিফটগুলো ফেরত দেয়া।— নিহত ছাত্রীর পাশে উদ্ধার হওয়া সুসাইড নোট
মিমোর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মিমো সচরাচর দরজা খোলা রেখে ঘুমাতেন। তবে ঘটনার দিন ফজরের আজানের পর দরজা বন্ধ দেখে পরিবারের সদস্যরা ধাক্কাধাক্কি করেন। তবে কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান। তার সহপাঠীরা জানিয়েছেন, রবিবার সকাল ৯টার দিকে তারা খবর পেয়ে বাড্ডা এলাকায় তার বাসভবনে আসেন। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া সুইসাইড নোটে সুদীপ চক্রবর্তী ও আরেক ছাত্রীর নাম থাকায় তাদের হেফাজতে নেয় পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া সুইসাইড নোটে লেখা ছিল— ‘সুদীপ স্যারকে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। ... (সহপাঠী) আর সুদীপ স্যার ভালো থাকো, স্যারের দেওয়া গিফটগুলো ফেরত দেয়া...।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা, বিভাগটির শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সূত্রে জানা গেছে, মিমোর মৃত্যুর একদিন আগে বৃহস্পতিবার (২১ এপ্রিল) দুপুরে ঢাবির কলাভবনের ৬০১ নম্বর কক্ষে শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তী ও আরেক ছাত্রীকে ‘অন্তরঙ্গ’ মূহুর্তে দেখেন মিমো। এ নিয়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধ হয় বলে জানা গেছে।
যদিও বিষয়টি নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান কাজী তামান্না হক সিগমা। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ঘটনার দিন দুপুর ১টার পর আমি অফিসে ছিলাম না। তাই পরবর্তীতে কী ঘটেছে সে বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের বিভাগের করিডোর বা ক্লাসরুমে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। একটি আছে বাইরে, সেটির নিয়ন্ত্রণও আমাদের কাছে নেই। ওই ক্যামেরা ডিন অফিস নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেটিও আমাদের কক্ষ বরাবর নয়।’
কলা ভবনের কক্ষের (৬০১ নম্বর) কথা বলা হচ্ছে, সেটি মূলত একটি ক্লাসরুম। সেখানে একজন শিক্ষকের সাথে একজন শিক্ষার্থীর এমন উপস্থিতি স্বাভাবিক নয়। আমরা প্রক্টর স্যারের সাথে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি, কিন্তু এ অভিযোগের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা এখনো পাইনি। যদি এমন কিছু ঘটতো, তবে বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা অন্য শিক্ষকরা অবশ্যই টের পেতেন।—অধ্যাপক ড. আহমেদুল কবির, থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাবি।
তদন্তের বিষয়ে চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিষয়টি এখন আইনি প্রক্রিয়ায় পুলিশের হাতে রয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বা কোনও প্রমাণ ছাড়া এ বিষয়ে সত্যতা নিশ্চিত করা বিভাগের পক্ষে সম্ভব নয়।’
ঘটনার বিষয়ে বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমেদুল কবির দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘কলা ভবনের যে কক্ষের (৬০১ নম্বর) কথা বলা হচ্ছে, সেটি মূলত একটি ক্লাসরুম। সেখানে একজন শিক্ষকের সাথে একজন শিক্ষার্থীর এমন উপস্থিতি স্বাভাবিক নয়। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি, কিন্তু এ অভিযোগের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা এখনো পাইনি। যদি এমন কিছু ঘটতো, তবে বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা অন্য শিক্ষকরা অবশ্যই টের পেতেন।’
সিসি ক্যামেরার ফুটেজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘লিফটের কাছে সিসি ক্যামেরা রয়েছে। আমরা প্রক্টর স্যারকে অনুরোধ করেছি, ফুটেজ যাচাই করার জন্য। যাতায়াতের দিক বিশ্লেষণ করলে হয়তো সিসি ক্যামেরায় বিষয়টি ধরা পড়তে পারে।’
নিহত ছাত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে ওই শিক্ষকের নামেই মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।— এসআই ইকবাল হোসেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা
শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের গুঞ্জন প্রসঙ্গে এ অধ্যাপক বলেন, ‘অভিযুক্ত শিক্ষক বছরের অর্ধেক সময় দেশের বাইরে থাকেন। এমন কোনো সম্পর্কের আভাস আমরা আগে পেলে অবশ্যই দুপক্ষকে সচেতন করতাম এবং ব্যবস্থা নিতাম। থিয়েটার বিভাগ নিয়ে অনেকেই নানা মুখরোচক গল্প তৈরি করেন, তবে আমরা এসব বিষয়ে সব সময়ই কঠোর অবস্থানে থাকি।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আত্মহত্যা করা ওই ছাত্রীর কাছে একটি চিরকুট পাওয়া গেছে। সেই চিরকুটের সূত্র ধরে এবং শিক্ষার্থীর ফোনে থাকা কিছু নথিপত্র বা ডকুমেন্টের ভিত্তিতেই পুলিশ ওই শিক্ষককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও শিক্ষক একই বিভাগের। আমরা জেনেছি ওই ছাত্রী কিছুটা সিনিয়র ছিলেন। পুরো বিষয়টি এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খতিয়ে দেখছে।’
গ্রেফতারকৃত শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ফৌজদারি অপরাধে যদি কারো চূড়ান্ত সাজা হয়, তবে নিয়ম অনুযায়ী তার চাকরি চলে যাবে। তবে বর্তমানে কেবল মামলা ও গ্রেফতারের প্রক্রিয়া চলছে। এরপর চার্জশিট এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার ফলাফল অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাড্ডা থানার এস আই ইকবাল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে ওই শিক্ষকের নামেই মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, ‘ঘটনাস্থল থেকে আমরা একটি চিরকুট (সুইসাইড নোট) উদ্ধার করেছি। সেখানে ওই বিভাগের একজন প্রফেসরের নাম উল্লেখ ছিল। সেই চিরকুটের সূত্র ধরেই তার পরিবার মামলা করে।’ সুইসাইড নোটে অন্য কোনো শিক্ষার্থীর নাম থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, মামলায় কেবল একজনের নামই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে কোনো বিশেষ সম্পর্ক ছিল কি না, তা বিস্তারিত তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এ বিষয়ে ডিএমপির গুলশান জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (গুলশান বিভাগ) এম তানভীর আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, মামলাটি এখনও তদন্তাধীন তাই এই বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে কিছু আলামত আমরা পেয়েছি সেই আলামতের ভিত্তিতেই ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়। বিস্তারিত তদন্তে জানা যাবে।