Image description

গুজব, কৌতূহল আর নানামুখী ব্যাখ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও চাঞ্চল্য। এবারের বিষয়—আইসিসিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি কে—তামিম ইকবাল না আমিনুল ইসলাম? আইসিসির ওয়েবসাইটে আমিনুলকে কেন এখনো বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সদস্য বলা হচ্ছে? তামিমকে কেন নয়?

মজার ব্যাপার হলো, শুধু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) নয়, মহসিন নাকভির নেতৃত্বাধীন এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) এক্সিকিউটিভ বোর্ড মেম্বারদের তালিকায়ও বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে এখনো সাবেক বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামের নামই আছে। বিসিবির মসনদে পটপরিবর্তনের তিন সপ্তাহ হয়ে গেলেও দুটি সংস্থার ওয়েবসাইটেই এখনো আমিনুলকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

অথচ বিসিবির অ্যাডহক কমিটির প্রথম সভায় সভাপতি তামিম ইকবালকে আইসিসি ও এসিসিতে বিসিবির প্রতিনিধি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয় এবং এটাই রীতি। দুটি সংস্থার বোর্ড অব ডিরেক্টরসে সদস্যদেশগুলোর বোর্ডপ্রধানরাই থাকেন যাঁর যাঁর দেশের প্রতিনিধি হিসেবে। সভাগুলোতেও সাধারণত তাঁরাই যোগ দেন, অথবা বিশেষ পরিস্থিতিতে তাঁদের মনোনীত কোনো প্রতিনিধি যোগ দেন। এ ছাড়া এ দুটি সংস্থায় চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসারদেরও সভা (সিইসি) হয়, যেটিতে যোগ দেন সদস্য বোর্ডগুলোর সিইওরা (চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার)।

তাহলে তামিম বিসিবি প্রধান হওয়ার পরও কেন আইসিসি এবং এসিসির ওয়েবসাইটে আমিনুলকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে দেখানো হচ্ছে? তিনি কীভাবে এখনো সংস্থা দুটির এক্সিকিউটিভ বোর্ড মেম্বার থাকেন?

আইসিসিরটাই আগে বলা যাক। কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ডে নতুন সভাপতি এলে শুধু ওই বোর্ডে বসে সিদ্ধান্ত নিলেই হয় না যে এখন থেকে ইনিই আইসিসিতে আমাদের প্রতিনিধি। এর একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া আছে, যেটি সম্পন্ন করতে তামিম ইকবালকে আইসিসির পরবর্তী বোর্ড সভার আগেই একবার দুবাইয়ে সংস্থাটির সদর দপ্তরে যেতে হবে।

আইসিসির ওয়েবসাইটে এখনো বিসিবির প্রতিনিধি আমিনুল ইসলাম
আইসিসির ওয়েবসাইটে এখনো বিসিবির প্রতিনিধি আমিনুল ইসলামআইসিসি ওয়েবসাইটের স্ক্রিনশট

কী সেই আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া?

আইসিসির দাপ্তরিক ভাষায় এটাকে বলে ‘ইনডাকশন প্রসেস’ (অভিষেক বা সূচনা বা বরণপ্রক্রিয়া)। বলতে পারেন অনেকটা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নবীনবরণ’–এর মতো ব্যাপার।

বিসিবির মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে তামিম তাঁর প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস নিয়ে আইসিসিতে যাবেন, আনুষ্ঠানিকভাবে বিসিবির প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত হবেন, আইসিসির পরিচালকদের জন্য নির্দিষ্ট শর্ত ও আচরণবিধিতে সই করবেন, আইসিসির দায়িত্বপ্রাপ্তরা আইসিসির বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত ব্রিফ করে তাঁকে তাঁর প্রথম বোর্ড সভার জন্য প্রস্তুত করবেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি হবে আইসিসির হেড অব লিগ্যালের তত্ত্বাবধানে।

‘ইনডাকশন প্রসেস’ সম্পন্ন হওয়ার আগপর্যন্ত আগের সভাপতিই কাগজ-কলমে থেকে যাবেন আইসিসির ‘বোর্ড মেম্বার’। এখানে উল্লেখ্য, সাবেক বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাঁর আগের বিসিবি সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামালই ছিলেন কাগজ-কলমে আইসিসিতে বিসিবির প্রতিনিধি এবং সেটি আসলে ছিলেন নামমাত্র।

আমিনুল ইসলাম ও তামিম ইকবাল
আমিনুল ইসলাম ও তামিম ইকবালপ্রথম আলো

এটুকু পড়ে বিষয়টিকে খুব সহজ মনে হলেও সামান্য একটু জটিলতা আছে। তামিম তো বিসিবির নির্বাচিত সভাপতি নন। তাঁকে কি বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেবে আইসিসি?

আইসিসি যে প্রক্রিয়ায় নতুন বোর্ড মেম্বারদের ‘বরণ’ করে নেয়, তার অন্যতম শর্তই হলো, সংশ্লিষ্ট বোর্ড সভাপতিকে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হতে হবে এবং ওই বোর্ডের ক্রিকেট পরিচালনায় সরকারের হস্তক্ষেপ থাকা যাবে না। তামিমের ইনডাকশন প্রসেসে নীতিগতভাবে বাধা হতে পারে দুটো বিষয়ই। আবার আইসিসি যদি বাংলাদেশের বিষয়টিকে কোনো কারণে ‘বিশেষ বিবেচনা’র দৃষ্টিতে দেখে, তাহলে ভিন্ন কথা।

ধাপে ধাপে বললে পুরো প্রক্রিয়াটি অনেকটা এ রকম—

নিজ দেশের বোর্ড থেকে মনোনয়ন:

সাধারণত আইসিসির পূর্ণ সদস্যদেশগুলো তাদের বোর্ডের প্রেসিডেন্ট বা চেয়ারম্যানকেই আইসিসির বোর্ডে পাঠায়। ওই ব্যক্তিকে অবশ্যই নিজের বোর্ডের প্রতিনিধি হিসেবে অনুমোদিত হতে হয়।

আইসিসির নিয়ম মেনে চলা:

যে বোর্ড মনোনয়ন দিচ্ছে, তাদের গঠনতন্ত্র আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী হতে হবে। সেখানে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন থাকতে হবে এবং ক্রিকেট পরিচালনায় সরকারের হস্তক্ষেপ থাকা যাবে না।

পরিচিতি যাচাই:

আইসিসি নিশ্চিত হবে যে ওই ব্যক্তি সত্যিই তার দেশের বোর্ডের প্রধান প্রতিনিধি কি না। এটা আইসিসির নিজস্ব প্রক্রিয়ার (ইনডাকশন প্রসেস) মাধ্যমে করা হয়।

শেষ ধাপ:

মনোনয়ন ও যাচাই শেষ হলে, নতুন প্রতিনিধি আইসিসির বোর্ডে যোগ দেন এবং অন্য সদস্যদের সঙ্গে সভায় অংশ নেন।

কাজেই আমিনুল ইসলামকে এখনো আইসিসির বোর্ড মেম্বার দেখানো এবং তামিম ইকবালকে না দেখানোর সম্ভাব্য কারণ দুটো—

১) তামিম এখনো আইসিসির প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে ‘ইনডাকশন প্রসেস’ সারেননি। এই আনুষ্ঠানিকতা সারলেই আইসিসির বোর্ড সদস্য হিসেবে আমিনুলের জায়গায় চলে আসবে তামিমের নাম ও ছবি।

অথবা—

২) আমিনুলের পর বিসিবিতে আর কোনো নির্বাচিত সভাপতি এসেছেন বলে আইসিসি জানে না। নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচিত সভাপতি ছাড়া তাদের কাউকে বোর্ড সদস্য করার কথা নয়। সেটা হলে বিসিবিতে পরবর্তী নির্বাচিত সভাপতি আসার আগ পর্যন্ত আমিনুলের নাম ও ছবি আইসিসির ওয়েবসাইট থেকে সরবে না। তামিমও হয়তো আইসিসির বোর্ড সভায় যোগ দিতে পারবেন না।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিসিবি এখন যে কমিটি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, সেটি কোনো নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ নয়, এটি সরকার মনোনীত অ্যাডহক বা আহ্বায়ক কমিটি; যাদের কাজ মূলত বিসিবিতে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন আয়োজন করা। এই কমিটির প্রধানকে ‘সভাপতি’ বলাটাও বিভ্রান্তিকর। এ ধরনের কমিটি প্রধানের পদের নামটা সাধারণত হয় ‘আহ্বায়ক’। কমিটির অন্য সদস্যরাও ‘বোর্ড পরিচালক’ নন, তাঁরা হলেন ‘অ্যাডহক/আহ্বায়ক কমিটি’র সদস্য।

৭ এপ্রিল বিসিবির অ্যাডহক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নেন তামিম ইকবাল
৭ এপ্রিল বিসিবির অ্যাডহক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নেন তামিম ইকবালশামসুল হক

আমিনুলেরও একই কথা

আইসিসি কেন আমিনুলকেই এখনো তাদের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ড সদস্য দেখাচ্ছে, সে ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা নেই আমিনুলের নিজেরও।যোগাযোগ করা হলে আজ অস্ট্রেলিয়া থেকে তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা দুটো কারণে হতে পারে। প্রক্রিয়াগত এবং আইনগত। হয়তো নতুন সভাপতির ইনডাকশন প্রসেস শেষ হয়নি বলে এখনো আমাকে প্রতিনিধি দেখায়। অথবা আইনগত বাধার কারণেও হতে পারে, সে ক্ষেত্রে ইনডাকশন প্রসেসও হবে না। কারণটা আসলে কী, সেটা আইসিসিই ভালো বলতে পারবে।’

বিসিবির বক্তব্য

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজাম উদ্দীন চৌধুরীর কাছেও। তিনিও ‘ইনডাকশন প্রসেসে’র কথাই বলেছেন। নিজাম উদ্দীন বলেন, ‘এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে একটু সময় লাগে। এটি বড় কোনো সমস্যা নয়। আইসিসির পরবর্তী বোর্ড সভার আগেই আশা করি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। তখন আইসিসির ওয়েবসাইটেও এটা আপডেট হবে।’

বিসিবির সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম
বিসিবির সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলামশামসুল হক

আইসিসি কী বলে

আইসিসি কিছুই না বলে আসলে একটা ‘সাসপেন্স’ই রেখে দিচ্ছে এখানে। সরকার তামিমের নেতৃত্বে বিসিবিতে অ্যাডহক কমিটি বসানোর পর সেটিকে ‘অবৈধ’ বলে নিজেকে তখনো বিসিবির সভাপতি দাবি করেন আমিনুল। বিষয়টি স্পষ্ট করতে এ ব্যাপারে ই-মেইলে আইসিসির ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হলেও আজ পর্যন্ত তারা তা জানায়নি।

ওদিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, বিসিবির বর্তমান অ্যাডহক কমিটিকে ‘অবৈধ’ এবং আগের পরিচালনা পর্ষদকে ‘বৈধ’ দাবি করে আমিনুলের পক্ষ আইসিসির সঙ্গে জুম মিটিংয়ে বসার চেষ্টা করেও এখনো সফল হয়নি। একাধিক চেষ্টার পর আজই দুই পক্ষে একটি সভার সময় নির্ধারণ হয়েছিল। কিন্তু দুই দিন আগে আইসিসি সেটি বাতিল করে জানায় পরবর্তী কোনো সময় তারা এর জন্য সময় দেবে। জুম মিটিংয়ে আইসিসির পক্ষ থেকে কোম্পানি সেক্রেটারি ও লিগ্যাল বিভাগের কর্মকর্তাদের থাকার কথা ছিল।

এসিসিতে কী হয়

এসিসিতে বোর্ড প্রতিনিধি বদল নিয়ে এত জটিলতা নেই। সেখানে সংশ্লিষ্ট বোর্ড যাকে নমিনেশনের কাগজ ধরিয়ে মিটিংয়ে পাঠাবে, তিনিই তাৎক্ষণিকভাবে ওই দেশের প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ড অব ডিরেক্টরসের মেম্বার হয়ে যাবেন ও সভায় যোগ দেবেন। তামিমের ক্ষেত্রেও তা–ই হওয়ার কথা। তবে বিতর্কিত বিষয়ে এসিসি আইসিসিকে অনুসরণ করে চলে।

আইসিসির পরবর্তী সভা হওয়ার কথা ভারতের আহমেদাবাদে আইপিএল ফাইনালের (৩১ মে) এক দিন আগে বা পরে। ধারণা করা হচ্ছে, এই সভাতেই বিসিবির ব্যাপারে আইসিসি তাদের অবস্থান পরিষ্কার করবে। তখন এ–ও জানা যাবে, আইসিসিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি আসলে কে—আমিনুল ইসলাম, নাকি তামিম ইকবাল?