উচ্চ রক্তচাপের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এটি শরীরের রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে। এমনকি স্বাভাবিক জীবনযাপন ও কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার মধ্যেও অজান্তে বাড়তে পারে স্ট্রোকের ঝুঁকি। তাই শুধু শারীরিক উপসর্গের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত রক্তচাপ মাপার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এনডিটিভিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন কলকাতার সিকে বিড়লা হাসপাতালের সিএমআরআইয়ের কনসালট্যান্ট ও ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজিস্ট চিকিৎসক দীপ দাস।
নীরবে ক্ষতি করে উচ্চ রক্তচাপ
উচ্চ রক্তচাপের কারণে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি কিংবা চোখে ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা হতে পারে। তবে এসব লক্ষণ উচ্চ রক্তচাপের জন্য নির্দিষ্ট নয়। আবার দীর্ঘদিন রক্তচাপ বেশি থাকলেও অনেকের শরীরে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে বছরের পর বছর উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও অনেকে তা বুঝতে পারেন না। কখনো অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ার পর, আবার কখনো নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় সমস্যাটি ধরা পড়ে।
দীর্ঘদিন রক্তচাপ বেশি থাকলে ধমনির দেয়ালে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এতে রক্তনালির ভেতরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরবর্তী সময়ে সেখানে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে রক্তনালি সরু হয়ে যাওয়া কিংবা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। মস্তিষ্কের রক্তনালিও এর বাইরে নয়।
মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে অথবা রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হতে পারে। ছবি: সংগৃহীত
উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়
মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে অথবা রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ দুই ধরনের স্ট্রোকের ঝুঁকিই বাড়াতে পারে।
- ইস্কেমিক স্ট্রোক: মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে এই ধরনের স্ট্রোক হয়। দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপ ধমনির ক্ষতি করে এবং রক্তনালিতে চর্বি জমার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এ ছাড়া মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র রক্তনালিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- হেমোরেজিক স্ট্রোক: মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি ফেটে গেলে এই ধরনের স্ট্রোক হয়। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে রক্তনালির দেয়ালে ক্রমাগত চাপ পড়ে, যা রক্তনালি ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এই ক্ষতি সাধারণত একদিনে তৈরি হয় না। উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও ধূমপানের মতো ঝুঁকি থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র রক্তনালির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি চলাফেরা, চিন্তাভাবনা ও স্মৃতিশক্তিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
কম বয়সীদেরও হতে পারে উচ্চ রক্তচাপ
উচ্চ রক্তচাপকে অনেকে শুধু বেশি বয়সের সমস্যা মনে করেন। তবে কম বয়সেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, বেশি লবণ খাওয়া এবং অনিয়মিত ঘুম এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ ছাড়া বংশগত প্রবণতা, অ্যালকোহল গ্রহণ, কিডনির রোগ এবং ঘুমের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি হওয়া বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যাও উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত।
নিয়মিত শরীরচর্চা ও সুষম খাবারের অভ্যাস থাকলেও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো যায় না। পারিবারিক ইতিহাস ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
একবার রক্তচাপ বেশি পাওয়া গেলেই উচ্চ রক্তচাপের রোগ নির্ণয় করা যায় না। ছবি: সংগৃহীত
শরীর ভালো থাকলেও কেন মাপবেন রক্তচাপ
একবার রক্তচাপ বেশি পাওয়া গেলেই উচ্চ রক্তচাপের রোগ নির্ণয় করা যায় না। মানসিক চাপ, শরীরচর্চা, ক্যাফেইন গ্রহণ কিংবা ভুল মাপের কাফ ব্যবহারের কারণেও রক্তচাপের পরিমাপে পরিবর্তন আসতে পারে। তাই সঠিক নিয়মে একাধিকবার রক্তচাপ মাপা গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিকভাবে রক্তচাপ মাপতে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি—
- মাপার আগে পাঁচ মিনিট চুপচাপ বসে বিশ্রাম নিন।
- পিঠে ভর দিয়ে বসুন এবং পা মেঝেতে সমানভাবে রাখুন।
- হাত হৃদযন্ত্রের সমান উচ্চতায় রাখুন।
- রক্তচাপ মাপার অন্তত ৩০ মিনিট আগে ধূমপান, ক্যাফেইন গ্রহণ ও শরীরচর্চা এড়িয়ে চলুন।
- রক্তচাপ বেশি এলে কিছুক্ষণ পর আবার মাপুন। বারবার বেশি পাওয়া গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- বাড়িতে নিয়মিত রক্তচাপ মাপলে এর ওঠানামার ধরন বোঝা সহজ হয়।
উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে যা করবেন
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দীর্ঘমেয়াদে জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা জরুরি। খাবারে লবণের পরিমাণ কমানো, নিয়মিত শাকসবজি ও ফল খাওয়া, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং শরীরচর্চা করা সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি তামাক এড়িয়ে চলা, অ্যালকোহল গ্রহণ সীমিত রাখা এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সবার ক্ষেত্রে শুধু জীবনযাপনে পরিবর্তন আনলেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে না। চিকিৎসক ওষুধ দিলে তা নিয়মিত গ্রহণ করতে হবে। রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে এলেও বা কোনো উপসর্গ না থাকলেও নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা নয়
হঠাৎ মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, হাত বা পায়ের দুর্বলতা কিংবা অসাড়তা, কথা বলতে সমস্যা, ভারসাম্য হারানো অথবা দৃষ্টিশক্তিতে আকস্মিক পরিবর্তন স্ট্রোকের সতর্কসংকেত হতে পারে। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। উপসর্গ নিজে থেকে সেরে যাওয়ার অপেক্ষা করা কিংবা বাড়িতে চিকিৎসার চেষ্টা করা বিপজ্জনক।
উচ্চ রক্তচাপ নীরবে শরীরের ক্ষতি করতে পারে। তবে নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, প্রয়োজনমতো চিকিৎসা নেওয়া এবং স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা এর ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মনে রাখতে হবে, শরীর সুস্থ বোধ করলেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে এমন নিশ্চয়তা নেই।