চিররঞ্জন সরকার
রাষ্ট্রের চোখে নাগরিকের পরিচয় কী? মানুষ, ভোটার, করদাতা, নাকি প্রয়োজনমতো ব্যবহারযোগ্য একেকটি সংখ্যা? ভোটের আগে মানুষ ‘জনগণ’, ভোটের পরে ‘সাধারণ মানুষ’; ক্ষমতার চেয়ারে বসার পর সেই মানুষই হয়ে যায় ‘পাবলিক’। তাকে অপেক্ষা করানো যায়, ধমক দেওয়া যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা যায়। ক্ষমতাবানদের যেন অলিখিত বিশ্বাস—জনগণ সব সহ্য করার জন্যই জন্মেছে। তাদের কাজ কর দেওয়া, ভোট দেওয়া, নিয়ম মানা আর সময়মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলা। প্রশ্ন করা কিংবা সম্মান দাবি করা? ওসব আবার কেমন নাগরিকসুলভ আচরণ! নাগরিকের মুখে প্রশ্ন দেখলে কর্তাব্যক্তিদের কারও কারও প্রতিক্রিয়া এমন, যেন গণতন্ত্রের দরজায় ভুল করে কেউ জুতা পরে ঢুকে পড়েছে।
ক্ষমতার একটি অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব আছে। ক্ষমতা পাওয়ার আগে মানুষ অন্যের কষ্ট বোঝে; ক্ষমতা হাতে এলে সেই মানুষগুলোই ক্রমশ দৃষ্টির বাইরে চলে যায়। মন্ত্রী, আমলা, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ কর্মকর্তা, পরিবহনমালিক, এমনকি একটি ক্লাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিও সামান্য কর্তৃত্ব পেয়ে এমন ভাব ধরেন, যেন মানবসভ্যতার ভার তাঁদের কাঁধে, আর বাকিরা সেই ভারের নিচে চাপা পড়া পিঁপড়ে। রাষ্ট্রের বড় ক্ষমতা থেকে প্রতিষ্ঠানের ছোট্ট চাবির গোছা—সবখানেই একই প্রবণতা: ক্ষমতা মানেই অন্যকে অপেক্ষা করানোর অধিকার। অফিসের দারোয়ান থেকে মন্ত্রণালয়ের কর্তা—সুযোগ পেলে সবাই যেন নিজের সাম্রাজ্যের সম্রাট।
বাংলাদেশের রাস্তাঘাট ও গণপরিবহনে এই মানসিকতার নমুনা প্রতিদিন দেখা যায়। অফিসের সময় বাসে ভিড় হবে, ঈদের আগে রেলস্টেশনে চাপ বাড়বে—এসব কি অজানা? তবু পরিকল্পনার বেলায় কর্তৃপক্ষের আচরণ এমন, যেন মানুষ হঠাৎ আকাশ থেকে ঝরে পড়েছে। বাসে যাত্রী ঝুলছেন, চালক অন্য বাসের সঙ্গে রেষারেষি করছেন; দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্ত কমিটি হবে। যাত্রী বাঁচলেন কি মরলেন, তাৎক্ষণিকভাবে যেন সেটি গৌণ। স্টিয়ারিং হাতে উঠলেই কেউ কেউ ভুলে যান, তিনিও একসময় পথের মানুষ ছিলেন। ক্ষমতার আসনে বসলে নিজের অতীতটাও বোধ হয় রিয়ারভিউ মিররে ছোট হয়ে আসে। সড়কে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে রেখে গন্তব্যে কয়েক মিনিট আগে পৌঁছানো যেন জীবনের সাফল্যের একটি বিশেষ সূচক!
রাষ্ট্রের চোখে আমজনতা কীটপতঙ্গ নয়, মানুষ—এই সত্য প্রতিষ্ঠায় বড় বড় ভাষণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরাপদ পরিবহন, মানবিক প্রশাসন, জবাবদিহিমূলক পুলিশ, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা এবং সমান মর্যাদার চর্চা। ক্ষমতার আসল পরীক্ষা ক্ষমতাহীন মানুষের সঙ্গে তার আচরণে। যে রাষ্ট্র দুর্বলতম নাগরিককেও সম্মান দিতে পারে, সেই রাষ্ট্রই শক্তিশালী। আর যে ক্ষমতা মানুষকে শুধু সংখ্যা হিসেবে দেখে, তার পতনের বীজও সেই অবজ্ঞার মধ্যেই রোপিত হয়।
উৎসবের সময়ও একই নাটক। গানের আসরে কিংবা মণ্ডপে দর্শনার্থীর ঢল নামলে আয়োজকদের গর্বের শেষ থাকে না। ছবি ওঠে, প্রচার হয়, পুরস্কারের আলোচনায় জনসমাগমের হিসাব জমা পড়ে। কিন্তু প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ নিরাপদ কি না, অসুস্থ মানুষ বা শিশুদের জন্য ব্যবস্থা আছে কি না—এসব প্রশ্ন তুললে আনন্দের মধ্যে অযথা বাধা সৃষ্টির অভিযোগ উঠতে পারে। ভিড়ের ছবি প্রচারের কাজে লাগে, ভিড়ের দুর্ভোগের ছবি আবার ভাবমূর্তির জন্য বিপজ্জনক।
দর্শনার্থীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন; বিশেষ অতিথি এসে সরাসরি মঞ্চে প্রবেশ করেন। গলায় পরিচয়পত্র, হাতে বিশেষ পাস, সামনে নিরাপত্তারক্ষী—ক্ষমতার অলংকারগুলো বেশ চমৎকার! যেন দেবী দর্শনেরও শ্রেণিবিন্যাস আছে: কারও জন্য অপেক্ষা, কারও জন্য অগ্রাধিকার। দেবীর সামনে সবাই সমান, কিন্তু মণ্ডপের প্রবেশপথে সেই সমতা বোধ হয় জুতা খুলে বাইরে অপেক্ষা করে। ধর্মের মঞ্চে সাম্য, বাস্তবে ভিআইপি সংস্কৃতি—কী চমৎকার সমন্বয়!
এ প্রবণতা কোনো একটি সরকার, দল কিংবা সময়ের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। ক্ষমতা বদলায়, মুখ বদলায়, পতাকা বদলায়; সাধারণ মানুষকে ভিড় হিসেবে দেখার অভ্যাস বদলায় না। রাজনৈতিক সভায় জনসমুদ্র দেখিয়ে জনপ্রিয়তা প্রমাণ করা যায়, কিন্তু সেই মানুষ স্বেচ্ছায় এসেছেন কি না, সভা শেষে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারছেন কি না, তা ব্যানারে লেখা থাকে না। হাজার মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেই আয়োজক জনপ্রিয়—এমন নয়। মানুষ হয়তো বিকল্প না পেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করছেন, পরেরবার আর আসবেন না। জনসমাগমকে সন্তুষ্টির প্রমাণ ভাবার সুবিধা হলো, মানুষের মুখের কথা শুনতে হয় না; ওপর থেকে ভিড় দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
সরকারি দপ্তরে একটি সনদ তুলতে গিয়ে মানুষকে এক কাউন্টার থেকে অন্য কাউন্টারে ঘুরতে হয়। অনলাইনে আবেদন করতে না পারলে নাগরিকের অসহায়ত্ব যেন তাঁর নিজের অপরাধ। ওয়েবসাইটে লেখা, ‘আপনার আবেদন সফলভাবে জমা হয়েছে’; বাস্তবে সেই আবেদনের খোঁজে তিনটি ভবন, চারটি কক্ষ আর পাঁচজন কর্মকর্তার দরজায় ঘুরতে হয়। ডিজিটাল ব্যবস্থায় ফাইলের চলাচল সহজ হয়েছে কি না, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—নাগরিকের দৌড়ঝাঁপ কমেছে কি? প্রযুক্তি মানুষের সময় বাঁচানোর কথা, অথচ প্রযুক্তির নামে কখনো নতুন হয়রানির দরজা খুলে যায়। যিনি ডিজিটাল ব্যবস্থায় দক্ষ নন, তাঁর জন্য রাষ্ট্রের বার্তা যেন একটাই—আমাদের পর্দায় সব ঠিক আছে, আপনার ভোগান্তি আপনার ব্যক্তিগত সমস্যা!
ব্যাংক, হাসপাতাল, রেলস্টেশন কিংবা সরকারি সেবাকেন্দ্রে অপেক্ষমাণ মানুষটির সময়ের দামও বড় বিচিত্রভাবে নির্ধারিত হয়। বিশেষ সুবিধা কেনার সামর্থ্য থাকলে আলাদা কাউন্টার, দ্রুত প্রবেশ, অগ্রাধিকার—সবই মেলে। ফলে নিয়ম সবার জন্য হলেও অপেক্ষা সবার জন্য সমান থাকে না। গণতন্ত্রে নাগরিকের মর্যাদা সমান হওয়ার কথা; বাস্তবে মর্যাদারও যেন ভিআইপি টিকিট চালু হয়েছে। সাধারণ মানুষকে বলা হয়, ‘নিয়ম মেনে চলুন’; ক্ষমতাবানদের জন্য নিয়মের নিচে অদৃশ্য একটি ফুটনোট—‘বিশেষ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়’।
স্বাস্থ্যসেবাও নাগরিকের মর্যাদার পরীক্ষা। জরুরি চিকিৎসা, হাসপাতালের শয্যা কিংবা রক্তের প্রয়োজন হলে মানুষ শুধু রোগের সঙ্গে লড়েন না; লড়েন ব্যবস্থা, যোগাযোগ ও সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার সঙ্গেও। যাঁর অর্থ আছে, তিনি বিকল্প খোঁজেন; যাঁর নেই, তাঁর অপেক্ষা দীর্ঘ হয়। সরকারি হাসপাতালে জনবল, সরঞ্জাম ও সেবার ঘাটতি তাই নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। রোগী যখন জরুরি চিকিৎসার জন্য ছোটাছুটি করেন, তখন ‘প্রক্রিয়া চলছে’ কথাটি সান্ত্বনার বদলে নিষ্ঠুর রসিকতা হয়ে উঠতে পারে। ভোটের সময় নাগরিক গুরুত্বপূর্ণ, অসুস্থ হলে অসহায়—এই দ্বৈত বাস্তবতা বদলানো জরুরি।
তবে দায় শুধু ক্ষমতাবানদের নয়। আমরাও সুযোগ পেলে এই সংস্কৃতির অংশ হয়ে যাই। পরিচিত কেউ কর্মকর্তা হলে নিয়মের বাইরে সুবিধা নেওয়াকে বুদ্ধিমত্তা ভাবি; ট্রাফিক সিগন্যালে অন্যদের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার জন্য জরুরি কাজের অজুহাত দিই; সামান্য কর্তৃত্ব পেলে অধস্তন কর্মীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করি। অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করে নিজেদের চালাক মনে হয়। আজ যে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে অপমানিত হচ্ছেন, কাল সুযোগ পেলে তিনিই অন্য কাউকে লাইন থেকে সরিয়ে দিতে পারেন। আজ নিপীড়িত, কাল সামান্য ক্ষমতা পেয়ে নিপীড়ক—এভাবেই অবমাননার সংস্কৃতি টিকে থাকে। ক্ষমতার অনুকরণ শুধু ওপরতলায় নয়, আমাদের দৈনন্দিন আচরণেও।
নাগরিকের আত্মসম্মান মানে প্রতিটি নিয়মের বিরোধিতা করা নয়। এর অর্থ নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা, অন্যের মর্যাদা স্বীকার করা এবং ক্ষমতাবানদের কাছে জবাবদিহি দাবি করা। সরকারি সেবা দেরি হচ্ছে কেন, গণপরিবহন নিরাপদ নয় কেন, উৎসবের ভিড় সামলানোর পরিকল্পনা কোথায়, হাসপাতালে জরুরি সেবার ঘাটতি কেন—এসব প্রশ্ন করা অবাধ্যতা নয়, নাগরিক দায়িত্ব। প্রশ্নকে অপরাধ ভাবলে রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক নাগরিকত্ব থেকে প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্কে নেমে আসে। রাষ্ট্র নাগরিককে সেবা দেবে; নাগরিককে সেবার জন্য করুণা ভিক্ষা করতে হবে না।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এই মনস্তত্ত্ব বদলানোর ওপরও। উৎসবের সাফল্য ভিড়ের সংখ্যায় নয়, নিরাপদে ঘরে ফেরা মানুষের হাসিতে। পরিবহনের সাফল্য বাসের সংখ্যা নয়, নিরাপদ যাত্রায়। সরকারি দপ্তরের সাফল্য ফাইলের স্তূপে নয়, সমস্যার সমাধানে। আর গণতন্ত্রের সাফল্য শুধু ভোটের বাক্সে নয়, ভোটের পরেও নাগরিকের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখায়। মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস’ বলা সহজ; সেই জনগণকে দপ্তরের দরজায় অপমানিত হতে না দেওয়াই আসল পরীক্ষা।
ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। পদ, পরিচয়পত্র, নিরাপত্তাবলয় কিংবা বিশেষ প্রবেশপথ একদিন হারিয়ে যেতে পারে। তখন ক্ষমতাবানকেও সাধারণ মানুষের ভিড়ে দাঁড়াতে হতে পারে, হাসপাতালের কাউন্টারে অপেক্ষা করতে হতে পারে কিংবা সরকারি দপ্তরে নিজের ফাইল খুঁজতে হতে পারে। তখন যেন তিনি আবিষ্কার না করেন, এত দিন যাদের পোকামাকড় ভেবেছিলেন, তাঁদের জীবনই তাঁর নিজের জীবনের আয়না। ক্ষমতার চেয়ার মানুষকে উঁচুতে বসায়, মানুষ হিসেবে বড় করে না। বড় হওয়ার প্রমাণ অন্যকে কতটা ছোট করা গেল, তাতে নয়; অন্যের মর্যাদা কতটা রক্ষা করা গেল, তাতে।
রাষ্ট্রের চোখে আমজনতা কীটপতঙ্গ নয়, মানুষ—এই সত্য প্রতিষ্ঠায় বড় বড় ভাষণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরাপদ পরিবহন, মানবিক প্রশাসন, জবাবদিহিমূলক পুলিশ, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা এবং সমান মর্যাদার চর্চা। ক্ষমতার আসল পরীক্ষা ক্ষমতাহীন মানুষের সঙ্গে তার আচরণে। যে রাষ্ট্র দুর্বলতম নাগরিককেও সম্মান দিতে পারে, সেই রাষ্ট্রই শক্তিশালী। আর যে ক্ষমতা মানুষকে শুধু সংখ্যা হিসেবে দেখে, তার পতনের বীজও সেই অবজ্ঞার মধ্যেই রোপিত হয়। আমজনতাকে কীটপতঙ্গ ভাবার আগে ক্ষমতাবানদের মনে রাখা উচিত—মানুষকে তুচ্ছ করা যায়, কিন্তু তার অস্তিত্বকে চিরকাল অস্বীকার করা যায় না।
লেখক : সিনিয়র কলামিস্ট।