সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, তারকাদের অংশগ্রহণের ঘোষণা আর বর্ণিল আয়োজন, সব মিলিয়ে কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল-২০২৬ ঘিরে তৈরি হয়েছিল ব্যাপক প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কুয়াকাটায় ছুটে আসেন পর্যটক ও দর্শনার্থীরা। কিন্তু দুই দিনব্যাপী আয়োজন শেষ হলেও প্রচারণায় নাম আসা অনেক তারকার দেখা মেলেনি।
সেলিব্রিটি ক্রিকেটার তাওহীদ হৃদয়, মোহাম্মদ আশরাফুল, হাবিবুল বাশার ও জামাল ভূঁইয়ার উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তাদের কেউই আসেননি। চলচ্চিত্র তারকা শাকিব খান, সিয়াম আহমেদ, চাষী ভাই, তানজিয়া জামান মিথিলা, কেয়া পায়েল, নোমোনি ও সংগীতশিল্পী আরমান আলিফসহ একাধিক তারকার নাম ঘোষণা করা হলেও তাদেরও দেখা যায়নি। একইভাবে অনেক ইনফ্লুয়েন্সারের নাম প্রচার করা হলেও তারা অংশ নেননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আগত পর্যটক, দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, তারকাদের উপস্থিতির প্রত্যাশা তৈরি করে মানুষকে আকৃষ্ট করা হলেও বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কেউ কেউ একে প্রতারণা বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, এমন ঘটনা কুয়াকাটার পর্যটন ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গত ২৩ ও ২৪ অক্টোবর বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে আয়োজিত হয় দুই দিনব্যাপী ‘কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল-২০২৬’। দীর্ঘ বিরতির পর আয়োজিত এ উৎসবের উদ্দেশ্য ছিল কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে দেশব্যাপী তুলে ধরা। বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে গান, নৃত্য, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক কর্মসূচিতে মুখর ছিল সমুদ্রসৈকত। তবে তারকাদের অনুপস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
কার্নিভালের প্রস্তুতি নিয়ে গত ৪ অক্টোবর কুয়াকাটা পর্যটন হলিডে হোমসের হলরুমে অনুষ্ঠিত এক সভায় অ্যাকশন কাট এন্টারটেইনমেন্টের অর্গানাইজার অনন্য মামুন তারকাদের থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন তারকা ও ইনফ্লুয়েন্সারের নাম ঘিরে প্রত্যাশা তৈরি হয়। কিন্তু কার্নিভালের দুই দিনের আয়োজনে প্রচারিত অনেক তারকাকে দেখা যায়নি। বিশেষ করে জাতীয় দলের পরিচিত ক্রিকেটার ও ফুটবলারদের অংশগ্রহণের প্রত্যাশা থাকলেও তাদের অনুপস্থিতি দর্শনার্থীদের হতাশ করে।
স্থানীয় তরুণ আশিক তালুকদার বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা কুয়াকাটায় এসেছেন শুধু কার্নিভাল উপলক্ষে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব তারকার নাম ঘোষণা করা হয়েছিল, তাদের কাউকেই আসতে দেখলাম না। আমি সেলিব্রিটি ক্রিকেটার দেখতে এসে জাতীয় দলের একজন নারী খেলোয়াড় ছাড়া ঘোষণায় থাকা কাউকেই পেলাম না। এটা একরকম প্রতারণা। এর ফলে কুয়াকাটার সুনাম অনেকটা ক্ষুণ্ন হলো।
আশিকের মতো অনেক দর্শনার্থীরও অভিযোগ, বড় তারকাদের অংশগ্রহণের প্রত্যাশা তৈরি করে প্রচারণা চালানো হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের অনুপস্থিতির বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা সামনে আসেনি। এতে শুধু দর্শকদের প্রত্যাশাই ভঙ্গ হয়নি, ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজনের প্রচারণার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কার্নিভাল উপলক্ষে আয়োজিত ম্যারাথনে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা দৌড়বিদদের কাছ থেকেও অভিযোগ উঠেছে। তাদের দাবি, রেজিস্ট্রেশনের জন্য ৫০০ টাকা করে নেওয়া হলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টি-শার্ট, চিকিৎসাসেবা ও সময়মতো পানি সরবরাহ করা হয়নি।
ম্যারাথনে অংশ নেওয়া হৃদয় নামের এক দৌড়বিদ বলেন, আমি রেজিস্ট্রেশন করেছি। আগের দিন রাতে আয়োজকদের বুথ থেকে টি-শার্ট দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাউকে পাইনি। পরদিন সকালেও টি-শার্ট দেওয়া হয়নি। টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করেও প্রতিশ্রুত সুবিধা না পাওয়ায় হতাশ হয়েছি।
শুধু হৃদয় নন, একই অভিযোগ করেছেন মাদারীপুর থেকে ম্যারাথনে অংশ নিতে আসা রোকনুজ্জামানও। তাদের অভিযোগ, নির্ধারিত ফি নেওয়ার পরও অংশগ্রহণকারীদের জন্য প্রতিশ্রুত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। বিশেষ করে ম্যারাথনের মতো শারীরিক পরিশ্রমনির্ভর আয়োজনে পর্যাপ্ত পানি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা না থাকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে বিচ ফুটবলের মধ্য দিয়ে শুরু হয় কার্নিভালের কার্যক্রম। বিকেলে পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত কার্নিভালের উদ্বোধন করেন। এসময় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব শামীমুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, পর্যটনসংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকেরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। কার্নিভালে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, সংগীত ও নৃত্যের আয়োজন দর্শকদের আকৃষ্ট করে।
স্থানীয়দের মতে, কোনো আয়োজনের প্রচারণায় তারকাদের নাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, পরিবর্তন হলে তা আগেই জানানো এবং দর্শনার্থীদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন। অন্যথায় স্বল্পমেয়াদে মানুষের সমাগম বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে পর্যটনকেন্দ্রটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কার্নিভালের মূল উদ্দেশ্য ছিল কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনাকে সামনে আনা। কিন্তু যে তারকাদের ঘিরে দর্শনার্থীদের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তাদের অনুপস্থিতি এখন আলোচনার কেন্দ্রে।