একটি হাতি তার শুঁড় দিয়ে দুটি হরিণবোঝাই নৌকাকে নদীর তীরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার পায়ের কাছে পিঁপড়া হাঁটছে, আর মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে পাখি। দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম পাঠের এই ছবিটির আসল উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের ‘এ’ থেকে ‘ই’ পর্যন্ত বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া ইংরেজি শব্দ শেখানো।
কিন্তু, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কিছু কর্মকর্তা এখন এই ছবির মধ্যেই বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতীকের গন্ধ খুঁজছেন।
বইয়ের মান বা ছাপার মান ঠিক করার দিকে তাদের কোনো নজর নেই। তারা এখন ব্যস্ত এই তর্কে, হাতিটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির আর নৌকাটি বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রতীক কি না।
কিছু কর্মকর্তা এমন অদ্ভুত ব্যাখ্যাও দাঁড় করিয়েছেন, রিপাবলিকান পার্টির হাতিটি আওয়ামী লীগের নৌকাকে খাদ থেকে টেনে তুলছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, এনসিটিবির মূল কাজ হলো সবার কাছে গ্রহণযোগ্য শিক্ষাক্রম ও আধুনিক বই তৈরি করা। কিন্তু একেক সরকার ক্ষমতায় এসে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাসের পাতা বদলে দিয়েছে। বোর্ডের কিছু কর্মকর্তা আবার মন্ত্রীদের মন জুগিয়ে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত।
তারা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বইগুলোতে ৮৮টি নৌকার ছবি খুঁজে বের করে সেগুলো বই থেকে বাদ দেওয়ার কৌশল করছেন।
শিক্ষাবিদ মনজূর আহমেদ টাইমসকে বলেন, ‘একশ্রেণির লোক সবকিছুতেই রাজনীতি খুঁজতে চায়। সরকারের উচিত এই নোংরা রাজনৈতিক খেলা বন্ধ করা। পাঠ্যবইয়ের ছবি বা বাক্যে রাজনৈতিক অর্থ খোঁজার এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা দরকার।’
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্ক পড়াশোনার ভেতরে না টানার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘বইয়ে কী থাকবে আর কী থাকবে না, তার নির্দিষ্ট নিয়ম থাকা উচিত। তা ছাড়া এনসিটিবিতে যাদের বিশেষজ্ঞ হিসেবে বসানো হচ্ছে, তারা আসলেই বিশেষজ্ঞ কি না, সেটাও যাচাই করা দরকার।’
নৌকা খোঁজার ধুম
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বইয়ে নদীপথের নৌকার ছবি অনেক আগে থেকেই আছে, কিন্তু এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তার তাতেই আপত্তি। এমনকি ইংরেজি ‘বি’ বর্ণের জন্য শিশুদের ‘বার্ড’ (পাখি) না শিখিয়ে কেন ‘বোট’ (নৌকা) শেখানো হচ্ছে, তারা সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, তাদের কিছু সহকর্মীর অন্ধ বিশ্বাস–এই ছবিগুলোর মাধ্যমে আসলে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক প্রচার করা হচ্ছে। বই তৈরি ও পরিমার্জনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাবিদ ও কর্মকর্তাদের তারা ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ তকমাও দিচ্ছেন।
আবার কেউ কেউ উল্টো প্রশ্ন তুলছেন, পাকা ধান খেত বা কৃষকের ধান কাটার ছবি বইয়ে থাকলেও বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’ কেন আলাদা করে আঁকা হয় না?
এনসিটিবির জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির একজন সদস্য টাইমসকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক আর বইয়ের এই সাধারণ নৌকা তো এক নয়। এই ছবিগুলো আজকের নয়, বহু বছর ধরেই বইয়ে আছে। গতবারও ছিল। এভাবে যদি প্রতিটি বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয়, তবে তো শিশুদের পড়াশোনাই বন্ধ করে দিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০২৮ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী নতুন বই আসবে। তখন হয়তো অনেক কিছুই বদলাবে এবং এই বইগুলো আর থাকবে না।’
এনসিটিবির প্রাথমিক শিক্ষাক্রমের সদস্য মো. ইকবাল হায়দার টাইমসকে বলেন, ‘আমরা তো নিজেরাও লিখি না, ছবিও আঁকি না। এবার মন্ত্রণালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) চারজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের নেতৃত্বে পাঠ্যবই সংশোধনের দায়িত্ব দিয়েছিল। তা ছাড়া সরকার প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা আলাদা বিশেষজ্ঞ কমিটি বানিয়ে দিয়েছে। সবকিছু তাদের কথামতোই হয়েছে। তাদের নির্দেশ ছাড়া এনসিটিবির কারোরই একটি শব্দ বা ছবি বদলানোর ক্ষমতা নেই।’
দাঁড়িপাল্লার ছবি নিয়ে হাঙ্গামা
সম্প্রতি, ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে জ্ঞান অর্জনের চার স্তরের শেষ স্তর বা ‘প্রজ্ঞা’ বোঝাতে একটি দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। তা নিয়েই শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। কারণ, দাঁড়িপাল্লা হলো জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রতীক। এই বিতর্কের পর এনসিটিবি বাধ্য হয়ে বইটি ছাপা বন্ধ করে দেয় এবং বাজারে ছাড়া বইগুলো সংশোধন করার ঘোষণা দেয়।
এই সিদ্ধান্তের পর চটেছেন জামায়াতপন্থী কর্মকর্তারা। এনসিটিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রাকিবুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘বইয়ের পাঠ্য বিষয়ের সঙ্গেই সংগতি রেখে ছবি বা নকশা করা হয়। এসব ছবি তো গত কয়েক বছর ধরে বইয়ে ছিল, তখন তো কেউ টু শব্দটিও করেনি। এখন হয়তো কেউ ইচ্ছা করে ঝামেলা পাকাতে চাইছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার নিজেই পরিমার্জন কমিটি করে দিয়েছে। সব কাজ সেই বিশেষজ্ঞ প্যানেলই করেছে। এখানে এনসিটিবির কোনো কর্মকর্তার কোনো হাত নেই।’
নৌকার ছবির বিরোধিতা করা এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে টাইমসকে বলেন, ‘দাঁড়িপাল্লার ছবি তো ২০২৪ সালের বইয়েও ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে সেটা বদলে ফেলা হয়। এবার সেটা আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যদি শুধু এই কারণে বই তুলে নিতে হয়, তবে তো নৌকার ছবিওয়ালা সব বইও বাতিল করা উচিত।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং আগামী শিক্ষাবর্ষের বই সংশোধন কমিটির সদস্য এস এম হাফিজুর রহমান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সরকার নিজেই চারজন শিক্ষাবিদকে কমিটিতে রেখেছিল, যারা পরবর্তী সময়ে বাকিদের বাছাই করেন।
এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তক সদস্য মোহাম্মদ আবু নাসের তুহু জানান, ছবি নিয়ে ভেতরে ভেতরে কী রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চলছে, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
বোর্ড কি আধুনিক ও জ্ঞানভিত্তিক পড়াশোনার চেয়ে রাজনীতিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে–এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এসব খুব লজ্জাজনক ব্যাপার। এ নিয়ে আমি আর একটি কথাও বলব না।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব আব্দুল খালেককে একাধিকবার ফোন ও মেসেজ করা হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
সরকার বদলায়, বদলায় ইতিহাস
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাঠ্যবইজুড়ে ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি এবং তার নানা কথা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সেই সরকার পতনের পর বই থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি এবং ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বাদ দেওয়া হয়। এমনকি শেখ হাসিনার নামের আগে জুড়ে দেওয়া হয় ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দ।
এরপর বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাদের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের লেখা এবং তার স্ত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদানের নানা কথা বইয়ে জায়গা পায়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে ইতিহাসও বারবার পাল্টে গেছে। আওয়ামী লীগের আমলে বইয়ে পড়ানো হতো: ‘গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা বদলে লেখা হয়: ‘২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর ২৭ মার্চ তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা বদলে লেখা হয়: ‘২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর ২৭ মার্চ তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’
আর এখন বিএনপি সরকার এসে ইতিহাসের আরেকটি নতুন সংস্করণ যোগ করছে: ‘২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক গণহত্যার খবর পেয়ে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপঅধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে বিদ্রোহ করে ঘোষণা দেন–‘উই রিভোল্ট’ (আমরা বিদ্রোহ করলাম)। এরপর রাত ২টা ১৫ মিনিটে (২৬ মার্চ) ব্যাটালিয়নের সকল বাঙালি কর্মকর্তা ও সৈনিকদের একত্র করে তিনি স্বাধীনতা ও যুদ্ধ শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার মাধ্যমেই মূলত মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। পরে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপন করা হলে ২৭শে মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় মেজর জিয়াউর রহমান অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও মুক্তি ফৌজের প্রধান সেনাপতি হিসেবে আবারও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।’
এনসিটিবির এক সাবেক কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলেও বাড়াবাড়ি করা হয়েছিল, এখনো সেটাই চলছে। কথা হলো, পাঠ্যবইকে নিরপেক্ষ রাখার মতো সৎ ও নিরপেক্ষ শিক্ষাবিদের যেমন অভাব রয়েছে, তেমনি দলের চাটুকার বুদ্ধিজীবীদের হাতে বইয়ের দায়িত্ব তুলে দেওয়ার পুরোনো রোগও আমাদের আছে। এই দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়া সত্যিই কঠিন।’
শত সংশোধনীর পরও ভুলের শেষ নেই
এনসিটিবির বিশেষজ্ঞ দল বই সংশোধনের পর আরেকটি প্যানেল তা খুঁটিয়ে দেখে। এরপর শিক্ষা সচিবের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির সবুজ সংকেত পেলে তবেই বই ছাপাখানায় যায়।
এনসিটিবির এক কর্মকর্তার অভিযোগ, বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন থেকে শুরু করে এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রতি বছর ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা খরচ হয়, অথচ বইয়ের ভুলগুলো থেকেই যায়।
যেমন, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত একটানা আট বছর ধরে নবম-দশম শ্রেণির ‘শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও খেলাধুলা’ বইয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভুল তথ্য পড়ানো হয়েছে।
বইটির চতুর্থ অধ্যায়ে বিখ্যাত ‘দ্য রিপাবলিক’ বইটির লেখক হিসেবে সক্রেটিসের নাম ছাপানো হয়েছিল। অথচ সক্রেটিস জীবনে কোনো বই-ই লেখেননি, বইটি লিখেছেন প্লেটো।
এনসিটিবির সাবেক জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ প্রবীর চন্দ্র রায় ঘটনাটিকে টাইমসের কাছে শুধুই একটি ‘নজরের ভুল’ বলে উড়িয়ে দেন।
অবশেষে দীর্ঘ আট বছর পর ২০২৬ সালের শিক্ষাবর্ষে এসে ভুলটি সংশোধন করা হয়েছে।