Image description

ফার্স্ট স্পাউস ডা. জুবাইদা রহমানকে নিয়ে জাপান সফরে এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরে কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা, কৃষি, নিরাপত্তা ও জ্বালানি খাতে সহায়তার বিষয়ে আটটি সমঝোতা ও সহযোগিতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি চলছে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে অটোমোবাইল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অবকাঠামো নির্মাণ এবং অন্যান্য উৎপাদন শিল্পে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন (৬.৩৫ বিলিয়ন ডলার) জাপানি বিনিয়োগের ঘোষণা আসতে পারে এই সফরে।

 

জাপানের এই বিশাল বিনিয়োগ পরিকল্পনা দেশটির ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ, যার মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে চীনের প্রভাব হ্রাস করা। বাংলাদেশকে ঘিরে, বিশেষ করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে জাপান যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, তাতে দেশটির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং কৌশলগত মিত্র ভারতের যুক্ত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। জাপান বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট বা বিগ-বি উদ্যোগে ভারতকে সঙ্গে নিয়েই অগ্রসর হতে চায়।

গতকাল রোববার রাত ১২টা ১০ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে টোকিওর উদ্দেশে রওনা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরসূচি অনুযায়ী, আজ স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে তার।

 

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যখন নানামুখী অস্থিরতা চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর টোকিও সফর দিল্লির জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তারেক রহমানের জাপান সফরকে তাই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। দ্বিপক্ষীয় এই সফরের ভূরাজনৈতিক ও আঞ্চলিক যোগাযোগবিষয়ক সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে ভারতের কৌশলগত স্বার্থ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের বিশেষ আগ্রহও তাৎপর্যপূর্ণ।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তা এবং কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরকে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিকÑদুদিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাদের মতে, তারেক রহমানের জাপান সফর বাংলাদেশের জন্য একদিকে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জও তৈরি করতে পারে। জাপান বাংলাদেশের প্রধান দাতা দেশগুলোর একটি এবং অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী। এই অঞ্চলে চীন ও জাপানের মধ্যে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর সামনে রেখে জাপানি গণমাধ্যমে চীনের প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। এছাড়া ভারতের সঙ্গে জাপানের ঘনিষ্ঠতা বেড়েই চলেছে।

 

বিশ্লেষকদের পরামর্শ, কোনোভাবেই জাপান-চীন ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হওয়া যাবে না। এক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক যেন অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অস্বস্তি তৈরি না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে বাংলাদেশকে।

বিশ্লেষকরা আরো জানান, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ভূরাজনৈতিক হিসাব পাল্টে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। আগামী দিনগুলোয় চীনের প্রভাব আরো বাড়তে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই বাংলাদেশকে অগ্রসর হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র এক কূটনীতিক আমার দেশকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর জাপানের মধ্যে একধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। জাপান মনে করে, বাংলাদেশ চীনের প্রতি অনেক বেশি ঝুঁকে পড়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রীকে টোকিও নিতে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে জাপান। অনেকটা তড়িঘড়ি করেই প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত হয়েছে।

 

ওই কূটনীতিক আরো বলেন, ঢাকা বেইজিংয়ের দিকে অনেক বেশি ঝুঁকে পড়েছেÑটোকিওর এমন ধারণা একেবারেই ঠিক নয়। কারণ প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর এমন কিছুই ঘটেনি, যা অন্য দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের ঠিক আগে জাপান থেকে রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহারের ঘটনা সফরের ওপর একধরনের ছায়া ফেলেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের বিষয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর জাপান ও বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরো সুদৃঢ় করবে। বাংলাদেশ জাপানের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার। দুই দেশ স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের মতো অভিন্ন মূল্যবোধ ও নীতিতে বিশ্বাসী। এছাড়া এই সফর মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দুই দেশের সহযোগিতা জোরদার করবে। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতি সফরের কৌশলগত গুরুত্বের দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

 

এই সফরের সময় বঙ্গোপসাগর ঘিরে নতুন করে সাজানো ‘বিগ-বি’ পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে চায় জাপান। হালনাগাদ বিগ-বিতে বিনিয়োগ, জ্বালানি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি একসূত্রে গাঁথা। ২০১৪ সালের বিগ-বি পরিকল্পনা প্রধানত মাতারবাড়ীকে ঘিরে শিল্প ও বন্দর গড়ে তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বঙ্গোপসাগরের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এটি এখন চারটি স্তম্ভের ভিত্তিতে হালনাগাদ করা হচ্ছে।

প্রথমত, আঞ্চলিক সংযোগ ও সমন্বিত লজিস্টিকসকে প্রাধান্য দিয়ে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও এলএনজি অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত করা। এর লক্ষ্য ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে পণ্য পরিবহনের সুবিধা তৈরি করা।

 

দ্বিতীয়ত, ঝুঁকি মোকাবিলা ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা, যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈশ্বিক সংঘাত বা সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশকে বিকল্প সামুদ্রিক পথ হিসেবে প্রস্তুত রাখা যায়।

তৃতীয়ত, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ও ব্যবসার আধুনিক নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের নিয়মভিত্তিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো যায়।

 

চতুর্থত, আঞ্চলিক শান্তি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা, যাতে বঙ্গোপসাগরে মুক্ত এবং নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা যায়। জাপান ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে পাঁচটি টহল নৌযান হস্তান্তর করেছে। এই সফরে কোস্ট গার্ডকে ৩৫ মিটার দীর্ঘ একটি আধুনিক টহল জাহাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিগ-বির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব লুকিয়ে আছে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক অবস্থানে। বঙ্গোপসাগর শুধু বাংলাদেশের বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে যুক্ত করার প্রধান সামুদ্রিক পথও। একদিকে চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) মাধ্যমে এ অঞ্চলে অবকাঠামোগত উপস্থিতি ও প্রভাব বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে জাপান ও তার মিত্ররা সামনে এনেছে অবাধ এবং মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরের (এফওআইপি) ধারণা।

চীনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশে বড় ধরনের বিনিয়োগে আগ্রহী জাপান। দেশটির প্রভাবশালী গণমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে আগামী পাঁচ বছরে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬.৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে জাপান। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ ৭৭ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের জন্য এই অর্থের সংস্থান করতে রাজি হয়েছে জাপান সরকার। এতে আরো বলা হয়েছে, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে বিনিয়োগের বিষয়টি ঘোষণা করা হবে।

নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘোষণার প্রধান লক্ষ্য বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং এশীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব হ্রাস করা। পাশাপাশি বাংলাদেশকে বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

জাপানের এই বিনিয়োগ বাংলাদেশে অটোমোবাইল, অন্যান্য উৎপাদন শিল্প এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করা হবে। একই সঙ্গে জাপানি ট্রেডিং হাউস সুমিতোমো করপোরেশনসহ অন্য অংশীদারের উদ্যোগে গড়ে তোলা ‘বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন’-এ জাপানি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করবে। বাংলাদেশের সঙ্গে গত ফেব্রুয়ারিতে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে জাপান।

 

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ভারতীয় গণমাধ্যমেও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দ্য হিন্দু, এনডিটিভিসহ দেশটির প্রধান গণমাধ্যমগুলোয় প্রায় প্রতিদিনই এই সফর নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে তারেক রহমানের সফরকে ভারতের স্বার্থের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফরের সময় জাপান তাদের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিগ-বি) উদ্যোগে ভারতকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার ওপর বিশেষ জোর দেবে। এটি জাপানের মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকবিষয়ক বৃহত্তর দর্শনেরই অংশ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ওই অঞ্চলে জাপানের কৌশলগত হিসাবনিকাশ প্রভাবিত হয়েছে এবং উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা কিছুটা জটিল হয়ে পড়েছে। বিগ-বি জাপানের আঞ্চলিক সংযোগবিষয়ক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

 

জাপান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। ভারতও বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত সংযোগ প্রকল্পগুলোয় কাজ করে যাচ্ছে। এসব প্রকল্পের লক্ষ্য ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের পণ্য চলাচল সহজ করা। বঙ্গোপসাগর অভিমুখী সংযোগ স্থাপনে উভয় দেশেরই স্বার্থ রয়েছে। ঢাকা ও টোকিও ভারতের জন্য এই উদ্যোগে যোগ দেওয়ার পথ খোলা রেখেছে। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ভারত এতে যুক্ত হতে পারবে।

২০২৩ সালে ভারত সফরের সময় জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা আশা প্রকাশ করেছিলেন, জাপান বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে মিলে আঞ্চলিক সমৃদ্ধি অর্জনে কাজ করবে। তিনি বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এই অঞ্চলকে আরো স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ করে তোলার ওপর জোর দিয়েছিলেন।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন জাপানি রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি বলেছিলেন, জাপানের মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক দর্শনের জন্য বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরো বলেছিলেন, আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বোঝাপড়া থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে চায় ঢাকা ও টোকিও। ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তার কার্যালয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

পররাষ্ট্র সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হবে। তিনি বলেন, কৃষি ও মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন এবং দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার বিষয়ে জাপানের সঙ্গে আটটির মতো সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে।

ভূরাজনীতির এই জটিল সমীকরণ সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের বিষয়ে আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপে বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম শহীদুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগসহ নানা কৌশলগত বিষয় সামনে আসবে। কোন বিষয়ে বাংলাদেশ কতটা যুক্ত হবে, সে বিষয়ে নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী আগেই হোমওয়ার্ক করেছেন।

 

ভারতের সঙ্গে জাপানের সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সফর যেন অস্বস্তির কারণ না হয়। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তাই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থিতিশীলÑএ কথা বলা যাবে না। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর অনেক কিছু বদলাতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর এই নির্বাচনের পর হলে ভালো হতো।

প্রধানমন্ত্রীকে সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দিয়ে এই বিশ্লেষক বলেন, আগামী দিনগুলোয় পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে। বাংলাদেশকে নানামুখী কূটনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হতে পারে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর এ প্রসঙ্গে আমার দেশকে বলেন, জাপান বাংলাদেশের প্রধান দাতা দেশগুলোর একটি। উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে দেশটি নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। জাপান এখন বড় বিনিয়োগের কথা বলছে, যা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিনিয়োগ গ্রহণ করার মতো সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে কি না।

 

তিনি বলেন, ২০১৪ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ১৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা বলেছিলেন। ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সক্ষমতার অভাবে বাস্তবে এসব প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ আসেনি।

সাবেক এই রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, ভারতের সঙ্গে জাপানের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। চীন ও জাপানের মধ্যে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। চীন বিআরআই এবং জাপান বিগ-বি নিয়ে এগোচ্ছে। বাংলাদেশের কোনোভাবেই এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়ানো ঠিক হবে না। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেই দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।