Image description

সিলেটে গিয়েছিলেন বৈরাগী বাজারের হজরত ছাবাল শাহ্ (রহ.)–এর মাজারের বার্ষিক ওরসে গান পরিবেশনের জন্য। যাওয়ার আগে সবাইকে আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন। সেখানে ভক্তদের মাতালেও আর জীবিত বাড়ি ফেরা হলো না উদীয়মান বাউল ও লোকশিল্পী পেহেলি ভৈরবীর।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকালে সিলেটের ওসমানীনগরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে আরও ৮ জনের সঙ্গে পেহেলি ভৈরবীও নিহত হয়েছেন। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌর শহরের চণ্ডীবের উত্তরপাড়ায়। উদীয়মান এই শিল্পীর মৃত্যুতে এলাকায় শোক নেমে এসেছে।

বিকাল ৫টা ৪ মিনিটের দিকে পেহেলি ভৈরবীর লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের বাড়ির সড়কে এসে থামে। মুহূর্তেই স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। একজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘মেয়েটা সুন্দর গান করতো। বেঁচে থাকলে আরও অনেক মানুষকে গান শোনাতে পারতো।’

লাশের পায়ের কাছে বসে ছিলেন মা রোজিনা বেগম। কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, ‘এত তাড়াতাড়ি কেমনে চইল্লা গেলি। আমার কী হইবো? আমি কারে নিয়া থাকুম। কে আমারে গান শোনাইবো।’

রোজিনা বেগম নিজেও একজন সংগীতশিল্পী। তিনিই ছিলেন মেয়ের প্রথম গানের শিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই মেয়েকে গান শেখাতেন। মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে। রোজিনা বেগম বলেন, ‘রাত ১টার সময় মেয়ের সঙ্গে কথা হইছে। বুঝতেই পারিনি, সকালে আর ওর সঙ্গে কথা বলতে পারবো না।’

 

স্বজনেরা জানালেন পেহেলি ভৈরবীর প্রকৃত নাম ইসরাত জাহান। তবে মঞ্চ, ভক্ত–শ্রোতা, স্বজন ও এলাকায় পেহেলি ভৈরবী নামেই তিনি পরিচিত। তার ফেসবুক পেজটিও এই নামে। ফলোয়ার সংখ্যা অর্ধলক্ষাধিক। তার বয়স মাত্র ২০ বছর, বিয়ে হয়নি। বাবা বাবুল মিয়া পেশায় ঠিকাদার। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে পেহেলি ছিলেন ছোট। ছোটবেলা থেকে মায়ের উৎসাহে গান শুরু করেন। তবে মঞ্চে নিয়মিত গান গাইছিলেন প্রায় পাঁচ বছর ধরে। বাউল ও লোকগানই ছিল তার প্রধান পরিচয়।

অল্প সময়েই সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার অঞ্চলে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন পেহেলি ভৈরবী। বছরের বিভিন্ন সময় অসংখ্য গানের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হতো তাকে। বৃহস্পতিবারও গিয়েছিলেন গানের অনুষ্ঠানে। কোনও অনুষ্ঠানে তিনি একা যেতেন না। কখনো মা, কখনো বাবা সঙ্গে থাকতেন। এবার সঙ্গী ছিলেন বাবা বাবুল মিয়া। দুর্ঘটনায় তিনিও গুরুতর আহত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

ইউটিউবের বিভিন্ন চ্যানেলে পেহেলি ভৈরবীর গান প্রকাশিত হয়েছে। কয়েকটি গানের দর্শকসংখ্যা মিলিয়ন (১০ লাখ) ছাড়িয়েছে। তার একটি অ্যালবামও প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে ছিল ১০টি গান। পরিবার জানায়, গত এক বছরে গান গেয়ে তিনি ভালো সম্মানীও পেতে শুরু করেছিলেন। বিভিন্ন সংগঠন থেকে পেয়েছেন সম্মাননাও।

পেহেলির মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই তার বাড়ি ছুটে আসেন সহশিল্পী ও শুভানুধ্যায়ীরা। সহশিল্পী উবায়দুল কাওয়াল বলেন, ‘পেহেলির গানের ধারা এক, আমারটা আরেক। ওর জনপ্রিয়তা বাড়তে দেখে ভালো লাগতো। এত অল্প বয়সে একজন বাউলশিল্পীর চলে যাওয়া মানে মনের গান গাওয়ার একজন মানুষ কমে যাওয়া।’

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শেষবার অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ জানিয়ে দেওয়া পোস্টে অনেকে শোক জানাচ্ছেন। শুভ সেন নামের একজন লিখেছেন, ‘প্রোগ্রামে দেখা হইলেই ভাইয়া কইয়া ডাক দিতেরে। তর ভাইয়া ডাকটা বড্ড মিস করমু। পরপারে ভালো থাকিস রে বইন।’