ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশের পর পতিত আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে শরিকদের ‘মূল্যায়নের’ উদ্যোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। শিগগির সরকারে যুক্ত হতে যাচ্ছেন শরিক দলের নেতারা। যোগ্যতা অনুসারে মন্ত্রিসভা থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করা হতে পারে বিএনপির সমমনা জোট ও দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে। ১৬ আগস্ট বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হবে। এরপর মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে। ছয় মাসের ভাবমূর্তি ও কর্মদক্ষতা অনুযায়ী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কাজের মূল্যায়ন করবেন প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রিসভায় রদবদলের পাশাপাশি আকারও বাড়তে পারে। এতে যুক্ত হতে পারেন বাদ পড়া দলের অনেক সিনিয়র নেতা। একই সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ শরিক দলের যোগ্য নেতাদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া। বিএনপি, শরিক দল ও সরকারের সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্রগুলো জানান, সমমনা শরিক দলগুলো থেকে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সভাপতি সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের নাম ক্যাবিনেটে যুক্ত হওয়ার আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) নেতা মোস্তফা জামাল হায়দার, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, এনপিপির ড. ফরহাদুজ্জামান ফরহাদ, ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, জেএসডির তানিয়া রব, শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরামসহ আরও বেশ কজন তাঁদের স্ব স্ব যোগ্যতা অনুসারে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দপ্তরে পদ পেতে পারেন।
অবশ্য যুগপৎ আন্দোলনে শরিক ৪২ দলের মধ্যে বেশির ভাগ দলের নেতারা স্থান না পেলেও প্রথম গঠিত মন্ত্রিসভায় গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকিকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে (ভিপি নুর) প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাকি দলের নেতারা হতাশা ও অসন্তুষ্টি নিয়ে জাতীয় সরকারের অংশীদার হওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং শরিক দলের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সরকারের বিশাল উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ তথা কর্মসূচি বাস্তবায়নে শরিক দলের নেতাদের বিভিন্ন স্তরে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেটি তাদের স্ব স্ব যোগ্যতা তথা যিনি যে সেক্টরে পারদর্শী তাঁকে সেই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হতে পারে। সেটি মন্ত্রিসভা হতে পারে কিংবা সরকারের অন্য যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের নানান পদেও হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও ভবিষ্যতে তাঁদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা ইতোমধ্যে বলেছেন।’
নির্বাচন ও আন্দোলন চলাকালে শরিকদের দেওয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিএনপি এবং মিত্র দলগুলোর মধ্যে সম্প্রতি দূরত্ব ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় যুগপৎ আন্দোলনে শরিক দলগুলোর মূল্যায়ন ও অংশীদারি না থাকায় মিত্রদের দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে-এমন অভিযোগ তুলে শরিক দলগুলোর শীর্ষনেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ এস এম ফায়েজ বলেন, ‘রাজনীতিতে একে-অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকাটা জরুরি। একজন আরেকজনকে সম্মানের চোখে দেখতে হবে। ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে শরিক দলগুলো একসঙ্গে আন্দোলন করেছে। জামায়াত এবং এনসিপির নেতারাও তখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। এখন বিএনপি সরকার গঠন করেছে। অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপি বিরোধী দলে গেছে। জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের যার যার ভূমিকা পালন করাটা স্বাভাবিক। কিন্তু সংসদের বাইরে একে-অন্যের বিরুদ্ধে যেভাবে বিষোদ্গার করা হচ্ছে এবং বর্তমানে যে পরিবেশ-পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। এ অবস্থায় সরকারের সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুগপৎ আন্দোলনে শরিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকার কোনো বিকল্প নেই। তাদের যথাযথ সম্মান এবং মূল্যায়নও করতে হবে সরকারকে।’
জানা যায়, ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের ‘হানিমুন’ পর্ব প্রায় শেষ। এখন যুগপৎ আন্দোলনে শরিক রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চায়। তারা চায় সরকারের অংশীদারিসহ কীভাবে তাদের মূল্যায়ন করা হবে তার পদ্ধতি প্রকাশ করা হোক। একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের মতোই জোরালো ঐক্য বজায় রেখে সরকারবিরোধী সব চক্রান্ত-অপপ্রচার মোকাবিলা করে তাদের ৩১ দফা প্রতিশ্রুতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এ বিষয়ে শরিকদের যথাযথ মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়েছেন এবং তাদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকলেও কোনো মৌলিক বিভেদ নেই বলে মত প্রকাশ করেছেন। তারপর প্রায় তিন সপ্তাহ পার হতে চললেও তা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ না থাকায় শরিক দলের নেতারা প্রশ্ন তুলছেন। বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে আলাপকালে শরিক দলগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতারা এসব অভিমত প্রকাশ করেছেন।
যুগপৎ আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের মতে তাঁরা বর্তমানে ‘দৃশ্যত সরকার দেখছেন, কিন্তু (রাজনৈতিক দল) বিএনপিকে চোখে দেখতে পাচ্ছেন না’। বরং ‘গুপ্ত-সুপ্ত’ গোষ্ঠীর চক্রান্তে ও অপপ্রচারে দেশব্যাপী বিএনপি কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। তাদের পাশাপাশি পতিত সরকারের দোসর-চক্রান্তকারীরা চাচ্ছে বর্তমান সরকার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হোক। এ চক্রান্তের হাত থেকে সরকারকে রক্ষা করে সাফল্যের দিকে নিয়ে যেতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে চায় শরিক দলগুলো। আর এজন্য নির্বাচনের আগে শরিকদের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো সরকারকে দ্রুত পূরণের দাবি জানান তাঁরা।
নেতারা জানান, আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের অসন্তুষ্টির আভাস পেয়ে ২০ জুলাই সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় শরিক দলগুলো নিয়ে বিশেষ সভা ও নৈশভোজের আয়োজন করে বিএনপি। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই টেবিলে টেবিলে গিয়ে নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এ সময় জাতীয় সরকার গঠনসহ নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ না করায় বিএনপির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য দেন জোটের শরিক শীর্ষ নেতারা। জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট শরিক দলগুলোর নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করার জোরালো আশ্বাস দেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আন্দোলনে শরিকদের মধ্যে ছোটখাটো মতভিন্নতা থাকতে পারে, তবে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যে কোনো ধরনের অনৈক্য বা বিভেদ নেই।
যুগপৎ আন্দোলনে ৪২ শরিক দলের ১৮৪ নেতাকে নিয়ে নৈশভোজে যথাযথ মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের যুগপৎ আন্দোলনে শরিক দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে, তবে কোনো বিভেদ নেই। ৩১ দফা ও জুলাই সনদের আলোকে সবাইকে নিয়ে সম্মিলিতভাবে দেশকে এগিয়ে নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে আছি, একসঙ্গে ছিলাম, ইনশাল্লাহ ভবিষ্যতেও একসঙ্গে থাকব।’
যা বললেন শরিক নেতারা : গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষনেতা, যুগপৎ আন্দোলনের অন্যতম শরিক দল নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘জামায়াতসহ একটি গোষ্ঠী সরকারবিরোধী কার্যক্রমে এগিয়ে রয়েছে। এখন সরকার যদি নিজেই ব্যর্থ হতে চায় সে ক্ষেত্রে তো আমাদের কিছুই করার নেই। তবে সরকার যদি আমাদের সহযোগিতা চায় আমরা তা করব।’ তিনি বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় সরকার গঠনসহ সব প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন চান।
একই বিষয়ে শরিক দলের শীর্ষনেতা বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘সাম্প্রতিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কথাবার্তা এবং আপ্যায়নে আমরা অভিভূত ও মুগ্ধ। আমরা সরকারের গৃহীত পজিটিভ পদক্ষেপগুলোর জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছি। পাশাপাশি এ-ও বলেছি যে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। সরকারের বিরুদ্ধে, জুলাই চেতনার বিরুদ্ধে যেসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে সেগুলো বিএনপি মোকাবিলা করতে পারছে না।
আমরা এখন দেশে দৃশ্যমান সরকারকে দেখছি (রাজনৈতিক দল) বিএনপিকে দেখতে পাচ্ছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এসব অপপ্রচার রোধে জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেই। আন্দোলনের শরিকদের নিয়ে একসঙ্গে চলার কোনো নমুনাও দেখছি না। সংরক্ষিত আসনে এমপি মনোনয়ন কিংবা জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ কোনো ক্ষেত্রেই শরিকদের সঙ্গে সরকারের কেউ কোনো আলোচনা করেনি।
৩১ দফা কিংবা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বা “রেইনবো নেশন” প্রতিষ্ঠারও কোনো উদ্যোগ নেই। ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি থেকেও সরকার সরে গেছে। অথচ জামায়াত সংরক্ষিত আসনে মাত্র ১৩টি সিট পেয়েও তাদের ১১-দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করেই সবকিছু করছে। তাই আর সময় নষ্ট না করে সরকারকে এখন পরিষ্কার করা উচিত তারা কী পদ্ধতিতে জোটের শরিকদের মূল্যায়ন করবে।’
জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক দলগুলোর মধ্যে যে ঐক্য বিদ্যমান তা আরও শক্তিশালী করে তুলতে হবে। কারণ দেশ ও সরকারের বিরুদ্ধে দেশিবিদেশি ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। তারা সরকারকে ব্যর্থ করে দিতে চায়।’ তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘এ মুহূর্তে সরকারের উচিত দেশপ্রেমিক সেই শক্তিগুলোকে একত্রিতভাবে যথাসময়ে যথাস্থানে ব্যবহার করা।’
জাতীয় গণতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছি। স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এবং জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন চাই। এ বাস্তবায়ন কাজে সরকারের প্রতি আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম বলেন, ‘আমরা চাই সরকার তার প্রতিশ্রুতিগুলো যথাযথভাবে পূরণ করুক। আমরা সরকারের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের মতো ঐক্যবদ্ধভাবেই কাজ করতে চাই। মোকাবিলা করতে চাই দেশ ও সরকারবিরোধী সব ষড়যন্ত্র।’