Image description

‘কৌতুক অভিনেতা’ বললেই সবার আগে দিলদারের নাম মাথায় আসে। তাঁকে সবাই ভালোবেসে ‘হাসির রাজা’ বলতেন। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই দর্শকদের মনে আনন্দের ঢেউ। একের পর এক হাততালিতে মুখর হয়ে উঠত সিনেমা হল। তবে সেই সোনালি দিনগুলো আজ শুধুই স্মৃতি। ২০০৩ সালের ১৩ জুলাই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে বোঝা যায়, দিলদারের প্রয়াণের পর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়, বহু মুখ এসেছে রুপালি পর্দায়, কিন্তু দিলদারের মতো কেউ আর হয়ে উঠতে পারেননি। বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি কমেডির যে অনন্য উচ্চতা ও ভালোবাসার আসন তৈরি করে গেছেন, সেই শূন্যস্থান আজও কেউ পূরণ করতে পারেনি।

‘অ্যাকশন লাগবে, সাসপেন্স লাগবে, দিলদার লাগবে।'

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দিলদার প্রায় পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মাতিয়ে রেখেছিলেন। ১৯৭২ সালে ‘কেন এমন হয়’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর পথচলা শুরু হয়। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘তুমি শুধু আমার’ সিনেমার জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও অর্জন করেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না, স্বপ্নের পৃথিবী, বিক্ষোভ, অন্তরে অন্তরে, স্বপ্নের নায়ক, আনন্দ অশ্রু, গুন্ডা নাম্বার ওয়ান, শান্ত কেন মাস্তান, খাইরুন সুন্দরী, নসিমন, কন্যাদান, শুধু তুমি, প্রিয়জন, বাঁশিওয়ালা, গাড়িয়াল ভাই, প্রেম যমুনা, অচিন দেশের রাজকুমার, লাইলি মজনু এবং নাগ নাগিনী।

 

সিনেমার পর্দায় দিলদার। ছবি: বাংলা মুভি ডেটাবেজসিনেমার পর্দায় দিলদার। ছবি: বাংলা মুভি ডেটাবেজ

 

ঢাকাই চলচ্চিত্রের পরিচালক মালেক আফসারী গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘আমরা যখন স্ক্রিপ্ট করতে যাই, রাইটারের সাথে বসি তখন তাকে বলি সিনেমায় কী কী থাকতে হবে। একটা নতুন আউটডোর লোকেশন লাগবে, নতুন গল্প লাগবে, আর কী লাগবে? কমেডি লাগবে। কিন্তু আমরা ‘কমেডি শব্দটা’ উচ্চারণ করতাম না। আমরা বলতাম যে অ্যাকশন লাগবে, সাসপেন্স লাগবে, দিলদার লাগবে।’’

আশি ও নব্বইয়ের দশকের সিনেমাগুলোতে দিলদার হয়ে উঠেছিলেন ‘কমেডি’র অন্য নাম। তাঁর জনপ্রিয়তা সিনেমার নায়ক-নায়িকাকেও ছাড়িয়ে যেত কখনও কখনও। নির্মাতা মালেক আফসারী দিলদারের জনপ্রিয়তার কথা বর্ণনা করে বলেন, একদিন উত্তরার লোকেশনে শুটিং করছিলেন। সেখানে নায়ক-নায়িকার অটোগ্রাফ নিতে প্রচুর মানুষ ভিড় করছিল। ভক্তদের হট্টগোল দেখে নায়ক-নায়িকা দুজনেই বেশ বিরক্ত হচ্ছিলেন। এর মধ্যে শুটিং সেটে হঠাৎ দিলদারের গাড়ি এসে থামে। গাড়ি দেখা মাত্র ‘চাল্লি আসছে’ বলে সবাই চিৎকার করে উঠল। মুহূর্তে নায়ক-নায়িকাকে ফেলে সবাই দিলদারের গাড়ি ঘিরে ধরল। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল দিলদারের অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য।

‘আপনি কি আমার পেটে লাথি দিতে আসছেন?’

দিলদারের জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে ছিল যে, তাঁকে নায়ক করে নির্মিত হয় ‘আব্দুল্লাহ্’ সিনেমাটি। সেসময়ের অন্যতম ব্যবসাসফল এই সিনেমাটি সাড়ে তিন কোটি টাকা আয় করেছিল। তোজাম্মেল হক বকুলের এই সিনেমায় নায়ক হওয়ার প্রস্তাব পেয়ে দিলদার নিজেই অবাক হয়েছিলেন। রসিকতা করে নির্মাতাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি কি আমার পেটে লাথি দিতে আসছেন?’

অবশ্য অনেক অনুরোধের পর দিলদার এই চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি হন। তবে দিলদারের বিপরীতে কে নায়িকা হবেন তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। সেসময়ের প্রথম সারির নায়িকা মৌসুমী ও শাবনূরসহ বেশ কয়েকজন এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর নির্মাতা নূতনকে এই চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দিলে তিনি সম্মতি জানান। সম্মতি দেওয়ার পর নূতনের কাছে অনেক ফোন আসতে শুরু করে। সবাই তাঁকে সিনেমাটি না করার জন্য নানাভাবে চাপ দিচ্ছিল। সিনেমাটি তৈরির পরেও নির্মাতা ও প্রযোজক ভয়ের মধ্যে দিন পার করছিলেন। দিলদারকে নিয়ে কেন এই ঝুঁকি নেওয়া হলো, হলমালিকদের কাছ থেকেও তাঁদের এমন প্রশ্ন শুনতে হয়েছে।

 

সিনেমার পর্দায় একসঙ্গে দিলদার ও নাসরিন। ছবি: বাংলা মুভি ডেটাবেজসিনেমার পর্দায় একসঙ্গে দিলদার ও নাসরিন। ছবি: বাংলা মুভি ডেটাবেজ

 

তবে মুক্তির পর সিনেমা হলের দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। প্রথম দিন থেকেই সিনেমা হলে দর্শকদের ভিড় জমতে শুরু করে। কৌতুক অভিনেতা থেকে ‘নায়ক’ হওয়ার এই পরিবর্তন দেখতে মুখিয়ে ছিল দিলদারের ভক্তরা।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই ব্যবসাসফল সিনেমাটি থেকে দিলদার কোনো পারিশ্রমিকই পাননি! গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দিলদারের বড় মেয়ে ‘আবদুল্লাহ’ ছবির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ছবির প্রযোজকের সঙ্গে বাবার চুক্তি হয়েছিল, যদি ছবিটি সিনেমা হলে চলে, তাহলে তাঁরা বাবাকে ১০ লাখ টাকা পারিশ্রমিক দেবেন, ব্যর্থ হলে কোনো টাকা পাবেন না। কারণ, নায়ক হিসেবে বাবাকে নিয়ে প্রযোজক ঝুঁকি নিচ্ছেন। বাবাও রাজি হন। কিন্তু পরে “আব্দুল্লাহ” ছবিটি হিট হলেও বাবা ছবির পারিশ্রমিক পাননি।’

কেন আরেকটা ‘দিলদার’ তৈরি হলো না

দিলদারের পর বাংলাদেশে আর তেমন কোনো ‘কৌতুক অভিনেতা’ তৈরি হননি। টেলি সামাদ, আফজাল শরিফের মতো অনেকেই পর্দায় কৌতুক অভিনেতা হিসেবে এসেছেন কিন্তু জনপ্রিয়তায় শীর্ষে ছিলেন একজনই।

 

 

 

এর পেছনে মূল কারণ হলো ঢাকাই চলচ্চিত্রের গল্প ও নির্মাণশৈলীর পরিবর্তন। বর্তমান যুগের নির্মাতারা চলচ্চিত্রে আলাদা করে কোনো কৌতুক চরিত্র রাখতে চান না। একসময় খল নায়কের মাধ্যমেই চলচ্চিত্রে হাস্যরস ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে এ টি এম শামসুজ্জামান ও হুমায়ুন ফরীদি্র কথা বলা যায়। ক্যারিয়ারের শুরুতে এ টি এম শামসুজ্জামান পর্দায় মূলত খল অভিনেতা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে তিনি কৌতুকধর্মী চরিত্রে অভিনয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং সেই ভূমিকাতেই দর্শকদের নির্মল বিনোদন দেন। তাঁর দেখানো সেই পথেই পরবর্তীতে খল ও কৌতুক অভিনয়ের দুর্দান্ত মিশেলে নিজস্ব স্বকীয়তা গড়ে তোলেন আরেক গুণী অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি।

ফলে কৌতুক অভিনেতাদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো চরিত্র ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। কৌতুক অভিনেতা না থাকার আরেকটি কারণ হলো তাঁদের যথাযথ পারিশ্রমিক ও সামাজিক মূল্যায়নের অভাব। বাংলাদেশে কমেডি চরিত্রগুলোকে বরাবরই কিছুটা ছোট করে দেখা হয়েছে। মানসম্মত চিত্রনাট্যের অভাব এবং স্থূল ও সস্তা কৌতুকের ব্যবহার দর্শকদের এই ধারা থেকে বিমুখ করেছে।