বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন ছয় দশকের বেশি সময়ের সংগীতজীবনে অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন। শৈশব, নতুন গান, দেশীয় সংগীতাঙ্গনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মীর রাকিব হাসান
কেমন আছেন?
আমি ভালো আছি। সবসময়ই ভালো থাকি। সম্প্রতি টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম, সেখানেও বলেছি— আমি ভালো আছি। সবাইকেই বলি আমি ভালো আছি, আমাকে নিয়ে কেউ দুশ্চিন্তা করবেন না।
কোনো নতুন গান রেকর্ড করেছেন?
হ্যাঁ। প্রায় ১০-১৫ দিন আগে তরুণ গায়ক মোমিন বিশ্বাস আর আমি একটি দ্বৈত গান করেছি। আপাতত এটাই সর্বশেষ কাজ। ইউটিউবের জন্য এর মিউজিক ভিডিও তৈরি হবে।
এখন নতুন গান নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোন বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেন?
সবসময় মেলোডিয়াস গান পছন্দ করি। মিষ্টি সুরের গান ভালো লাগে আমার। যে গানে যত বেশি মেলোডি থাকবে, সেই গান আমার কাছে তত বেশি ভালো। সারা জীবন মেলোডি গানই বেশি গেয়েছি। তাই নতুনদের মধ্যে কেউ যদি সুন্দর মেলোডি গান নিয়ে আসে, অবশ্যই সেটি গুরুত্ব দেবো।
ঈদের মতো উৎসববিষয়ক গান করার ব্যাপারে কখনো ভেবেছেন?
আমি তো গান তৈরি করি না। যারা গান লেখেন আর সুর ও সংগীত পরিচালনা করেন, তারা এসব নিয়ে ভাবলে ভালো। আমি কাউকে বলে গান তৈরি করাতে পারি না। আমার পুরনো সুরকারদের অনেকেই আর বেঁচে নেই। নতুনদের সঙ্গে খুব বেশি কাজও করিনি। ফলে এমন কাউকে দেখি না, যাকে ডেকে বসে এসব নিয়ে আলোচনা করব। তারা যদি নিজেরা ইচ্ছা করে, নিশ্চয়ই করতে পারবে। আমাদের দেশীয় সব উৎসব নিয়েই গান হওয়া উচিত। বাংলাদেশ বেতার এবং বিটিভির জন্য ঈদের কিছু গান গেয়েছিলাম। তবে দুই-একটার অংশ ছাড়া সেসব খুব একটা মনে নেই।
ঈদ এলে গ্রামের বাড়ি নিয়ে নস্টালজিয়া কাজ করে?
না। আমি কখনো গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরায় থাকিনি। জীবনে মাত্র একবার গিয়েছি, সেটাও পাঁচ-ছয় বছর আগে। তাই গ্রামের বাড়ি নিয়ে আমার কোনো নস্টালজিয়া নেই।
শৈশবের কথা মনে পড়ে?
ছোটবেলায় খুব দুষ্টুমি করতাম। এত দুষ্ট ছিলাম যে, সব বোনের চেয়ে আম্মার কাছে নাকি আমিই সবচেয়ে বেশি মার খেয়েছি! বোনদের মধ্যে আমি সবার ছোট ছিলাম। সবার আদর পেলে যা হয় আর িক! আমার বড় দুই বোন ফরিদা ইয়াসমীন ও ফওজিয়া খানের জন্য গানের ওস্তাদ আসতেন। আমাকে তাদের পাশে বসানো হতো। কিন্তু আমি দৌড়ে পালিয়ে যেতাম! সেসব ঘটনা খুব মনে পড়ে।
একসময় গান নিয়ে আপনার ব্যস্ততা এত বেশি ছিল যে, দিনের পর দিন স্টুডিওতে কেটে যেত। এখন কীভাবে সময় কাটে?
এখনো গান নিয়েই আমার সময় কাটে। নিয়মিত রেওয়াজ করি। গান শুনি। স্টেজ শো করি, বিশেষ করে বিদেশে। এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকি। অবসর পেলে রান্না করি, ঘরের কাজ করি। মূলত গানই আমার সময়ের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে থাকে।
সমসাময়িক শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে?
আমি কোনো দিনই আড্ডাবাজ ছিলাম না। ‘আড্ডা’ শব্দটাই আমার ভালো লাগে না। আড্ডা দিয়ে কী হবে? তবে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। সম্প্রতি টিভি অনুষ্ঠানে গিয়ে আবিদা সুলতানার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। অনেক আলাপ করেছি আমরা। রফিকুল আলম ভাই ও খুরশীদ আলম ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয় প্রায়ই। এ ছাড়া পুরনো কিছু সংগীতশিল্পী আছেন, যারা ৩০-৩৫ বছর ধরে আমার সঙ্গে বাজাচ্ছেন। তারা মাঝেমধ্যে বাসায় এলে গল্প হয়।
আপনার সন্তানেরা গানকে পেশা হিসেবে নেননি। আপনি কী চেয়েছিলেন?
আমার ছেলে লন্ডনে থাকে। সে গানের সঙ্গে যুক্ত নয়। আমার মেয়ে ব্যাংকে চাকরি করে। একসময় কিছু গান করেছিল, কিন্তু এখন সময়ের অভাবে আর করে না। তারা কেউই গানকে পেশা হিসেবে নেয়নি। এটাকে অস্বাভাবিক মনে করি না। আশা ভোঁসলে, মোহাম্মদ রফি সাহেব, তালাত মাহমুদ, মান্না দের সন্তানরা গানকে পেশা হিসেবে বেছে নেননি। কিশোর কুমারের ছেলে কিছু গান করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ কিংবদন্তি শিল্পীর সন্তানই এই পেশায় আসেননি।
নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে কারও গান ভালো লাগে?
অনেকের গানই ভালো লাগে। অনেকেই খুব ভালো কাজ করছে। তবে অনেকের কণ্ঠস্বর আর গায়কী এত কাছাকাছি মনে হয় যে, শুনে সবসময় বোঝা যায় না কোনটা কার গাওয়া! আগের শিল্পীদের আলাদা বৈশিষ্ট্য ছিল। এখন মাঝেমধ্যে সেটা কম মনে হয়। তবে নবীনদের কাজের প্রশংসা করি আমি। ভালো গান শুনলে অবশ্যই ভালো লাগে।
জীবনে কোনো অপ্রাপ্তি বা আক্ষেপ আছে?
ব্যক্তিগতভাবে আমার নিজের জীবন নিয়ে কোনো অপ্রাপ্তি নেই। যা পেয়েছি, তাতে আমি সন্তুষ্ট। তবে একটা অপ্রাপ্তি আছে, আমাদের দেশে যথাযথভাবে রয়্যালটি সিস্টেম নেই। যারা গান লেখেন, সুর করেন ও কণ্ঠ দেন; তাদের কাজের যথাযথ মূল্যায়নের জন্য যে রয়্যালটি ব্যবস্থা থাকা উচিত, সেটা আমাদের দেশে কার্যকরভাবে নেই। এটা খুবই দুঃখজনক। ধরুন, আজও আব্দুল আলীম ভাইয়ের শত শত গান রেডিও-টেলিভিশনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান, মেলা, মাঠে-ঘাটে ও দোকানে বাজতে শোনা যায়। সঠিক রয়্যালটি ব্যবস্থা থাকলে তার পরিবার লাভবান হতো।
একইভাবে আব্দুর রহমান বয়াতির পরিবার, কাঙালিনী সুফিয়া, আলাউদ্দিন আলীর পরিবারের মতো আরও অনেক শিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালকের পরিবার উপকৃত হতে পারত। আজও তাদের সৃষ্টিকর্মে মানুষ বিনোদিত হচ্ছে, কিন্তু শিল্পী বা তাদের পরিবার কোনো আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে না। এটা খুব কষ্টের বিষয়। কবে এই ব্যবস্থা হবে, আদৌ হবে কি না, সেটাও জানি না। শুধু আমার একার নয়, আমাদের দেশের সব শিল্পীরই অন্যতম অপ্রাপ্তি এটা।