কোথাও তালা, কোথাও পানির অভাব, কোথাও বখাটেদের উৎপাত। এই হচ্ছে পাবলিক টয়লেটের চিত্র। ফলে পাবলিক নাম থাকলেও বাস্তবে এ সুবিধা কখনোই গণমানুষের হয়নি।
এমন এক বাস্তবতার মধ্যে ‘জাতীয় পাবলিক টয়লেট নীতিমালা ২০২৬’ অনুমোদন দিয়েছে সরকার। প্রতিশ্রুতি এবার আরও বড়— সারা দেশে মানসম্মত টয়লেট, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবহারবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার। সরকারের দাবি, এ উদ্যোগ বদলে দেবে স্যানিটেশন খাতের চিত্রও। কিন্তু নতুন নীতিমালার পরও কি পাবলিক টয়লেট পৌঁছাবে সেই মানুষগুলোর কাছে, যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন— এ প্রশ্ন তুলেছেন তারাই।
প্রশ্নটা তখন আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে, যখন চোখে ভাসে এক দিনমজুরের কথা। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় কাজ করতে করতে হঠাৎ জরুরি প্রয়োজন; কিন্তু পকেটে টাকা নেই। সামনে থাকা টয়লেটটি ব্যবহার করতে গেলে ফি দিতে হবে। তখন কী করবেন তিনি? বাস্তবতা বলছে, অনেকেই ফিরে যান। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় মলমূত্র আটকে রাখেন, যা নিঃশব্দে ডেকে আনে শারীরিক জটিলতা। আর যাদের আর কোনো উপায় থাকে না, তারা আশ্রয় নেন উন্মুক্ত স্থানে। এতে শুধু পরিবেশ বা জনস্বাস্থ্যই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় একজন মানুষের মৌলিক মর্যাদাবোধও।
বাসা থেকে বেরোনোর আগে শেষ মুহূর্তে বারবার বাড়ির টয়লেট ব্যবহার করেন অনেকে। বিশেষ করে বয়স্করা, যাতে পথে টয়লেটে যেতে না হয়। কেউ আবার পানি পানের পরিমাণই কমিয়ে দেন। এগুলোও স্বাস্থ্য সমস্যা ডেকে আনে।
সরেজমিন রাজধানীর বাংলা মোটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, তেজগাঁও এলাকায় দেখা যায়, পাবলিক টয়লেট ব্যবস্থার বাস্তবচিত্রও ভিন্ন নয়। প্রয়োজনের তুলনায় কম স্থাপনা থাকলেও তার অনেকটাতেই দেখা যায় পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ না থাকার মতো নানা সমস্যা। কোথাও আবার ব্যবহারকারীদের জন্য নির্ধারিত ফি-ই নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বাড়তি চাপ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেকে এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এ বাস্তবতার মধ্যেই কথা হয় এক পথবাসীর সঙ্গে। নূর আলী থাকেন বাংলা মোটরের পান্থকুঞ্জ পার্কের ফুটপাতে। পাবলিক টয়লেটই তার ভরসা। কোথায় টয়লেট করেন, জানতে চাইলে তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমরা তো রাস্তাতেই থাকি। যখন দরকার হয়, টাকা না থাকলে অনেক টয়লেটে ঢুকতেই দেয় না। তখন দূরে যেতে হয়। আবার অনেক জায়গা এত নোংরা যে, ব্যবহার করা যায় না। তখন খুব কষ্ট হয়— কোথায় যাব, কী করব, বুঝে উঠতে পারি না।’
অবকাঠামো উন্নয়ন, মানসম্মত নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার নানাদিক বিশদভাবে উল্লেখ থাকলেও দরিদ্র, পথবাসী বা প্রান্তিক মানুষের জন্য বিনামূল্যে বা সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি স্পষ্ট নয় নতুন টয়লেট নীতিমালায়, যা গত ৭ মে অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। যেখানে বলা হয়েছে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা সুবিধা নিশ্চিত করার কথা। সড়ক ও মহাসড়কের নির্দিষ্ট দূরত্বে টয়লেট স্থাপন, সেফটি ট্যাংক বাধ্যতামূলক করা এবং পরিবেশ সুরক্ষার নির্দেশনাও নীতিমালায় রয়েছে।
একজন মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানালেন, মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় অন্য এক মন্ত্রী শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহারবিধি সম্পর্কে সচেতন করতে কর্মসূচি নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেন। পরে বিষয়টি নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাংলা মোটরের টয়লেট ব্যবহার করতে হলে ফি দিতে হয় ১০ টাকা। এই ফি অতিরিক্ত বলে ব্যবহারকারীরা জানিয়েছেন। এ কারণে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় এ সেবাটিই হয়তো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যাদের, তাদের কাছে অধরাই থাকার আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমেদ বলেছেন, ‘পাবলিক টয়লেট কোনো বিলাসী সুবিধা নয়— এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্য ও মানবিক মর্যাদার সঙ্গে জড়িত একটি মৌলিক অধিকার। যখন মানুষ হাতের কাছে টয়লেট পায় না, তখন সে বাধ্য হয়ে অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্পের দিকে যায়। আর হাতের কাছে পেলেও টাকা-কড়ির বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ অনেক সময় বাধ্য হয় উন্মুক্ত স্থানে নিজের প্রয়োজন মেটাতে। কখনো দীর্ঘ সময় প্রয়োজন আটকে রাখতে হয় তাদের। ফলে সংক্রামক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে, পরিবেশ দূষিত হয় এবং ব্যক্তির শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই শুধু অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়; সবচেয়ে জরুরি হলো— এ সেবাটি যেন সত্যিকার অর্থেই সবার জন্য সহজলভ্য, নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে ব্যবহারযোগ্য হয়।’
মন্ত্রিসভার একই বৈঠকে ‘জাতীয় পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নীতিমালা ২০২৬’-এর মাধ্যমে স্যানিটেশন খাতকে একটি বিস্তৃত কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে স্যানিটেশনকে মৌলিক সেবা হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিটি গৃহস্থালিতে উন্নত ল্যাট্রিন এবং জনসাধারণের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বস্তি বা নিম্ন আয়ের এলাকায় কমিউনিটি ল্যাট্রিনকে গ্রহণযোগ্য সমাধান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানালেন, সরকারের লক্ষ্য হলো সবার জন্য স্যানিটেশন নিশ্চিত করা। নীতিমালায় অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিকীকরণের পরিকল্পনাও এতে রয়েছে। পাশাপাশি স্যানিটেশন খাতে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করেন, নতুন নীতিমালায় ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত হবে। তবে রক্ষণাবেক্ষণ ও ফি নির্ধারণ— এ জায়গাগুলোতেই চ্যালেঞ্জ বেশি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাদের জন্য সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে।
যদিও শুধু টয়লেট নির্মাণ নয়— জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জোর দিয়েছেন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপরও। শুধু নতুন টয়লেট নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না— সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এর টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ এবং সবার জন্য ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করা। তাই পরিকল্পনার পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিং, জবাবদিহি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
ধানমন্ডি ১২ নাম্বার ব্রিজের পাশে পাবলিক টয়লেট নিয়মিত ব্যবহার করেন শফিক আহমেদ। লেকের পাড়ে দীর্ঘ প্রাতঃভ্রমণের সময় তাকে পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে হয়। সাবেক এই আমলার কথা, ‘সরকার পাবলিক টয়লেটের নতুন নীতিমালা করেছে। এটি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও ইতিবাচক। তবে বাস্তবতা বলছে, দেশের অধিকাংশ পাবলিক টয়লেট এখনো অপরিচ্ছন্ন, অচল বা অনিরাপদ এবং অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহারের জন্য ফি দিতে হয়, যা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য একটি বড় বাধা। এসব সমস্যা আগে দূর করা দরকার।