Image description

বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি দিনের কথা মনে পড়লেই আমার চোখের সামনে যে কজন মানুষের মুখ ভেসে ওঠে, তাদের মধ্যে শাবানা আপা অন্যতম। আমরা দুজনই একই সময়ের শিল্পী, একই ইন্ডাস্ট্রির মানুষ। দর্শক আমাদের অনেক সময় প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছেন, কিন্তু বাস্তবে আমাদের সম্পর্ক ছিল গভীর শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা আর বন্ধুত্বের। আজ এত বছর পর দাঁড়িয়ে যখন পেছনে তাকাই, তখন মনে হয়, শাবানা আপাকে ছাড়া আমার চলচ্চিত্রজীবনের গল্প কখনও পূর্ণ হতে পারে না।

শাবানা আপা আমার অনেক আগেই চলচ্চিত্রে এসেছেন। ১৯৬৭ সালে এহতেশামের পরিচালনায় ‘চকোরী’ সিনেমার মাধ্যমে তাঁর নায়িকা হিসেবে অভিষেক হয়। আর আমি নায়িকা হিসেবে কাজ শুরু করি ১৯৬৯ সালে ‘শেষ পর্যন্ত’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে। এটি পরিচালনা করেন জহির রায়হান।

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আমাদের খুব একটা দেখা হয়নি। যতদূর মনে পড়ে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) আমাদের প্রথম পরিচয় হয়।

আমি তখন সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় অভিনয় করে দেশে ফিরেছি। এফডিসিতে আমাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে শাবানা আপা আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। প্রথম দেখাতেই তাঁর ভেতরে এক ধরনের আন্তরিকতা খুঁজে পেয়েছিলাম। হাসিমুখে আমাকে অভিনন্দন জানালেন। চলচ্চিত্রাঙ্গনে প্রতিযোগিতা থাকাটা খুব স্বাভাবিক, বিশেষ করে দুই জনপ্রিয় নায়িকার মধ্যে। কিন্তু আমাদের সম্পর্ক কখনও সেই জায়গায় যায়নি। বরং আমরা একে অপরের কাজকে সম্মান করতাম এবং সাফল্যে আনন্দ পেতাম।

এরপর আলাদা আলাদা সিনেমার শুটিং করতে গিয়ে এফডিসিতে প্রায়ই দেখা হতো। ধীরে ধীরে পরিচয় থেকে সম্পর্কের গভীরতা বাড়তে থাকে। আমাদের একসঙ্গে প্রথম অভিনয় ছিল সাইফুল আজম কাশেম পরিচালিত ‘সোহাগ’ সিনেমায়, যা মুক্তি পায় ১৯৭৮ সালে। এটি বেশ দর্শকপ্রিয়তা পায়। এরপর আলমগীর কুমকুমের ‘কাপুরুষ’, দারাশিকোর ‘ফকির মজনু শাহ’, দেওয়ান নজরুলের ‘বারুদ’ এবং সিরাজুল ইসলাম সিরাজের ‘সোনার হরিণ’ সিনেমায় আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি।

 

শাবানা ও ববিতা

শাবানা ও ববিতা

 

একসঙ্গে কাজ করতে গিয়েই শাবানা আপাকে আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। শুটিংয়ের সময় আমাদের মধ্যে খুব সুন্দর বোঝাপড়া ছিল। আমরা যে যার কাজ মন দিয়ে করতাম, কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কটা ছিল ভীষণ আন্তরিক। সেই সময়ে কিছু পত্রিকায় আমাদের সম্পর্ক নিয়ে নানা ধরনের খবর ছাপা হতো। বলা হতো, আমাদের মধ্যে নাকি দূরত্ব বা প্রতিযোগিতা আছে। কিন্তু সেসব ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বাস্তবে আমরা ছিলাম খুব কাছের মানুষ।

শাবানা আপার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তাঁর অসাধারণ পেশাদারিত্ব। শুটিং ফ্লোরে তিনি সব সময় সময়মতো উপস্থিত থাকতেন। সংলাপ মুখস্থ, চরিত্র নিয়ে প্রস্তুতি– সবকিছু এত নিখুঁতভাবে করতেন যে নতুন শিল্পীরাও তাঁকে দেখে শিখতেন। আমি বহুবার দেখেছি, কোনো কঠিন দৃশ্যের আগে তিনি এক কোণে চুপচাপ বসে চরিত্র নিয়ে ভাবছেন। ক্যামেরা অন হওয়ার পর যেন অন্য এক মানুষ হয়ে যেতেন। বিশেষ করে আবেগঘন দৃশ্যে তাঁর অভিনয় ছিল অসাধারণ। অনেক সময় আমি নিজেই শট দিতে গিয়ে তাঁর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতাম।

শাবানা আপার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর চোখের ভাষা। সংলাপ ছাড়াও শুধু দৃষ্টির মাধ্যমে আবেগ প্রকাশ করার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। দর্শক কেন তাঁকে এত ভালোবাসতেন, সেটা খুব সহজেই বোঝা যেত। তাঁর অভিনীত ‘ভাত দে’ সিনেমার কিছু অংশ আমি টেলিভিশনে দেখেছিলাম। সেখানে তাঁর অভিনয় আমাকে ভীষণভাবে স্পর্শ করেছিল।

তবে আমি তাঁকে শুধু বড় অভিনেত্রী হিসেবেই দেখি না, একজন অসাধারণ মানুষ হিসেবেও দেখি। এত জনপ্রিয়তা, এত সাফল্যের পরও তাঁর মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। তিনি সবার সঙ্গে খুব সহজভাবে মিশতেন। ইউনিটের ছোট কর্মচারী থেকে শুরু করে পরিচালক– সবাইকে সমান সম্মান দিতেন। হাসিমুখে কথা বলতেন। এটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ।

শুটিংয়ের ফাঁকে আমাদের অনেক আড্ডা হতো। তখনকার দিনে সবাই আলাদা আলাদা টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে আসত। সবাই তো সব খাবার খেত না, তাই আমরা খাবার ভাগাভাগি করে খেতাম। সেই ছোট ছোট মুহূর্ত এখন খুব মনে পড়ে। শাবানা আপা ইউনিটের অন্য মেয়েদের সঙ্গেও গল্প করতেন। তাদের পরিবারের খবর নিতেন, সংসার কেমন চলছে জানতে চাইতেন। একজন বড় তারকা হয়েও তিনি খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন।

একবার কক্সবাজারে শুটিং করতে গিয়ে একটি মজার ঘটনা ঘটেছিল। আমরা তখন হোটেল শৈবালে ছিলাম। তিনি এক সিনেমার শুটিং করছিলেন, আমি অন্য সিনেমার। হঠাৎ একদিন দরজায় বারবার নক শুনে খুলে দেখি শাবানা আপা দাঁড়িয়ে। তিনি হেসে বললেন, ‘তোমার কাছে একটা জিনিস চাইতে এসেছি।’

আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম– কী লাগবে? তিনি বললেন, একটি গানের দৃশ্যে তাঁর আধুনিক পোশাক পরতে হবে। কিন্তু তিনি এ ধরনের পোশাক খুব কম পরতেন। তাই আমার কাছে কোনো ম্যাক্সি আছে কিনা দেখতে বললেন। আমি তাঁকে বললাম, ‘আমার পোশাক তো আপনার গায়ে হবে না।’ কারণ তখন আমি খুব পাতলা ছিলাম। তিনি হেসে বললেন, ‘সেলাই খুলে ঠিক করে নেব।’ পরে আমি তাঁকে পোশাক দিলাম। এরপর বললেন, ‘তোমার মডার্ন পরচুলাও তো আছে, সেটা দাও।’ আমার সুটকেসে সব সময় বিভিন্ন ধরনের চুল থাকত। সেটাও তাঁকে দিয়েছিলাম।

এই ছোট ছোট ঘটনাই আমাদের সম্পর্কের আন্তরিকতার প্রমাণ। কিন্তু এসব সুন্দর স্মৃতি খুব কমই পত্রিকায় এসেছে। বরং তখন অনেক সাংবাদিক পত্রিকায় উল্টাপাল্টা গল্প লিখতেন। অথচ বাস্তবে আমাদের সম্পর্ক ছিল ভীষণ সুন্দর।

শাবানা আপার প্রথম সন্তান হওয়ার পর আমি তাঁকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম। একদিন তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি তো প্রায়ই ভারতে যাও, সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে কাজ করো। কলকাতার শাড়ি আমার খুব পছন্দ। গেলে আমার জন্য একটা শাড়ি নিয়ে এসো।’ পরে আমি তাঁর জন্য শাড়ি এনে উপহার দিয়েছিলাম। সম্পর্ক ভালো না হলে কি এসব হয়?

আমাদের সময়ের চলচ্চিত্র জগৎ আজকের মতো প্রযুক্তিনির্ভর ছিল না। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হতো। কখনও প্রচণ্ড গরমে, কখনও বৃষ্টির মধ্যে শুটিং করেছি। অনেক কষ্ট ছিল, কিন্তু আনন্দও ছিল। কারণ আমরা সিনেমাকে ভালোবাসতাম। আর সেই যাত্রাপথে শাবানা আপা ছিলেন আমার অন্যতম সেরা সহযাত্রী।

একসময় তিনি ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে গেলেন। এরপর আমিও অভিনয় কমিয়ে দিই। তারপর একদিন কলকাতার একটি দোকানে হঠাৎ আমাদের দেখা হয়ে যায়। আমরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। অনেকদিন পর দেখা হওয়ায় দুজনের চোখই ছলছল করছিল। সেই মুহূর্তটা আজও ভুলতে পারি না।
মানুষ ভাবে, নায়িকাদের মধ্যে শুধু প্রতিযোগিতা থাকে। কিন্তু আমাদের সম্পর্ক ছিল তার উল্টো। ক্যামেরার সামনে হয়তো প্রতিযোগিতা ছিল– কে ভালো অভিনয় করবে, কে দর্শকের মন জয় করবে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে আমাদের মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না। ছিল শুধু সম্মান আর ভালোবাসা।

আজকের প্রজন্ম হয়তো আমাদের সময়ের সংগ্রাম পুরোপুরি বুঝবে না। কিন্তু আমাদের কাজগুলো দেখলে তারা নিশ্চয়ই বুঝবে, আমরা কতটা নিষ্ঠা আর ভালোবাসা দিয়ে সিনেমা করেছি। শাবানা আপা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং মানবিকতা তাঁকে সত্যিকারের একজন তারকায় পরিণত করেছে।

জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমি বলতে পারি, শাবানা আপা সত্যিই অনন্য একজন। মানুষ হিসেবে, শিল্পী হিসেবে তিনি সব সময় আমার হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে থাকবেন। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়, কিন্তু কিছু স্মৃতি কখনও পুরোনো হয় না। শাবানা আপার সঙ্গে কাটানো দিনগুলোও ঠিক তেমনই– আজও উজ্জ্বল, আজও হৃদয়ের খুব কাছের।

অনুলিখন: এমদাদুল হক মিলটন