Image description

আর কয়েকদিন পরেই আসছে ঈদুল আজহা। এই ঈদকে কেন্দ্র করে সারাদেশেই বাড়বে ঘরমুখো মানুষের ব্যাপক যাতায়াত। ঈদ উদযাপনে পরিবারের সদস্যরা সংস্পর্শে আসবে একে অপরের। তবে একে অপরের এই কাছে আসাতেই হাম রোগে আক্রান্ত  হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে বলে মনে করছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। 

শুক্রবার (২২ মে) রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউটে সরেজমিনে অবস্থান করে দেখা যায় জরুরী বিভাগের চিকিৎসকদের এবং ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে দায়িত্বরত চিকিৎসক ও নার্সদের ব্যস্ততা। একইভাবে দেখা যায় সন্তানকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা বাবা-মায়ের পরিশ্রান্ত মলিন চেহারা। আর শোনা যায় শিশুদের কান্নার শব্দ। দেখা যায় হামের ওয়ার্ডে কোন সিট ফাঁকা নেই। একইসাথে কোন কোন রোগীকে সিট ফাঁকা না পেয়ে ফিরে যেতেও দেখা যায়। তারা জানেন না কোথায় যাবেন তারা। 

ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে

মার্চের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয় হামের প্রাদুর্ভাব। এরপরে বাড়তে রোগীর সংখ্যা। একইসাথে বাড়তে থাকে মৃত্যুর সংখ্যাও। এরপরে কিছুটা তুলনামূলক কিছুটা কমতে শুরু করে রোগীর সংখ্যা। আবার যারা আসেন তারাও জরুরি চিকিৎসা নিয়ে চলে যেতে পেরেছেন বাড়িতে। তবে এখন আবার বাড়ছে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। এমনটাই জানিয়েছেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউটের হাম বিভাগে দায়িত্বরতরা। 

হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমেছে কিনা জানতে চাইলে দায়িত্বরত নার্স বলেন, আমাদের এখানে সারাক্ষণই রোগী আসতে থাকে। আমার দেখা অনুযায়ী বলতে পারি যে রোগী আগের তুলনায় আসা কমেছে, এটা আমার দেখা অনুযায়ী বলছি। তবে রোগী কমলেও খারাপের অবস্থাটা বেড়েছে।  আগে দেখা যেত যে অনেক রোগী এসেছে আমরা তাদের ইমার্জেন্সিতে দেখে বাসায় ট্রিটমেন্ট করার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছি। এরকম হয়েছে। কিন্তু এখন যেটা হয়েছে যে এডমিশন লাগেই। 

 

এসময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জরুরী বিভাগে কর্মরত এক চিকিৎসক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখন হামের ফ্লো বেড়ে গিয়েছে। এটা ঈদের পরে আরও বাড়বে। কারন তারা বাড়িতে যাবে অনেকের সাথে সংস্পর্শে আসবে। তখন এটা আরও বেড়ে যাবে। 

তিনি আরও বলেন, ঈদের সময় আমাদের সবার ডিউটি থাকবে। এটা মূলত রোস্টার আকারে থাকবে। 

বাড়তি ওয়ার্ড দিয়েও শেষ রক্ষা হচ্ছে না

হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পরে শ্যামলীর এই শিশু হাসপাতালে দুইটি ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেয়া হতো। পাশাপাশি ছিলো আইসিইউ। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বাড়ার কারনে নতুন আরেকটি ওয়ার্ড হামের চিকিৎসায় যুক্ত করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।  তবে ওয়ার্ড বাড়ানোর পরেও অনেক রোগীকেই ফিরে যাচ্ছে সিট না পেয়ে। 

এই হাসপাতালে হামের চিকিৎসার সাথে সংশ্লিষ্ট একজন বলেন, আগে আমাদের হামের রোগী রাখা হতো দুইটি ওয়ার্ডে। এখন রোগী বাড়াতে এবং যেহেতু এটা সংক্রামক রোগ তাই আরেকটি ওয়ার্ড খালি করে সেখানেও হামে আক্রান্ত রোগী রাখা হচ্ছে। 

প্রান্ত দাশ এসেছেন পুরান ঢাকা থেকে। তার বাচ্চার বয়স সাড়ে ৫ মাস। পাঁচদিন ধরে জ্বর-ঠান্ডায় ভুগছে তার শিশুটি। পরে ওয়ারীর এক হাসপাতালে ডাক্তার দেখালে জানতে পারেন তার বাচ্চার নিউমোনিয়া আছে। হামেরও লক্ষন রয়েছে। আজ (শুক্রবার) দুপুরে আসেন শ্যামলীর শিশু হাসপাতালে।  কিন্তু সিট না পাওয়ায় ফিরে যেতে হয়। 

প্রান্ত বলেন, আমার বাচ্চার নিউমোনিয়া হয়ে ফুসফুসে ইনফেকশন হয়ে গিয়েছে। এখন শরীরে হামও উঠেছে। ওয়ারীর হাসপাতাল থেকে আসলাম শিশু হাসপাতালে।  কিন্তু এখান থেকে বললো সিট নেই। শুধু একজন ডাক্তার দেখাতে পেরেছি। তারা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যেতে বলেছে। এখন ওখানে যেয়ে দেখি সিট পাওয়া যায় কিনা। ওর বয়স না হওয়ায় টিকাও দিতে পারিনি বলেও জানান তিনি। 

শেরপুর থেকে দুই বছরের সন্তানের চিকিৎসার জন্য ঢাকার এই শিশু হাসপাতালে এসেছেন নবীজুল হক ও তার স্ত্রী। কিন্তু সিট না পেয়ে বসে থাকেন হাসপাতালের গেটের সামনে। এসময় তার সাথে কথা হলে তিনি অভিযোগ জানিয়ে বলেন,  আমরা বুঝতে পারছি না, ওর শ্বাস নিতে সমস্যা। আমার মনে হয়েছে নিউমোনিয়া থেকেই হয়েছে, হয়তো ফুসফুসের ভেতরে কোনো সমস্যা। গতকাল ওখানের (শেরপুর) ডাক্তার কিছু টেস্ট দিয়েছিল। কিন্তু আজকে ডাক্তাররা তেমন কিছু করেনি। তারা বলল অক্সিজেন দিতে হবে। পরে আপাতত শুধু একটু অক্সিজেন দিয়েছে। আর জরুরি বিভাগের ডাক্তাররা ঢাকা মেডিকেলে চলে যেতে বলেছে। 

তিনি আরও বলেন, আমি বারবার ডাক্তারদের বুঝানোর চেষ্টা করেছি যে গত রাতে আমার বাচ্চা খুবই সিরিয়াস অবস্থায় ছিল। আমি অনেকবার বলেছি এটা ইমারজেন্সি। কিন্তু তারা বিষয়টা বুঝতে চায়নি।

অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক

হামে আক্রান্ত হওয়া সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে দিনের পর দিন কাটাচ্ছে বাবা-মায়েরা। চলছে চিকিৎসা। কিন্তু তবুও অভিভাবকদের মনে থেকেই যাচ্ছে আতংক। কবে সম্পূর্ণ সুস্থ  সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন আছেন সেই অপেক্ষায়। 

পুরান ঢাকা থেকে এসেছেন প্রিয়া দত্ত। চারদিন ধরে ভর্তি আছেন হাসপাতালে। তিনি বলেন, ১০৩-৪ জ্বর নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। বাসায় কোনভাবেই জ্বর কমছিলো না। পরে আবার হামও দেখা যায়। তারপর আর দেরি না করে এখানে এনে ভর্তি করি। ওর নিউমোনিয়াও হয়ে গিয়েছে। চারদিন ধরে আছি। হাম কিছুটা কমেছে। কিন্তু ওর নিশ্বাস নিতে সমস্যা হওয়ায় এখনো ট্রিটমেন্ট চলছে। কবে ফিরবো বাসায় এখনো বলতে পারছি না। পুরোপুরি সুস্থ করেই আমার ছেলেকে নিয়ে যেতে চাই। 

মোহাম্মদ ফোরকান এসেছেন মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান থেকে। তিনি বলেন, আমার বাচ্চার বয়স ১ বছর চার মাস। এই বয়সে ওর যা যা টিকা পাওয়ার কথা সবই পেয়েছে। কিন্তু তাও হামে আক্রান্ত হয়েছে। এখানে ভর্তি আছে তিনদিন হলো। এখন অনেকটা ভালোর দিকে। তবে কবে ছাড়বে তা বলা যাচ্ছে না। 

হাহিবুর রহমান এসেছেন বরিশাল থেকে। তার বাচ্চার বয়স ৪ মাস। এই মাসের ১২ তারিখ থেকে তার মায়ের নিউমোনিয়া ধরা পরে। তখন চিকিৎসা বরিশালেই করেন। প্রায় সুস্থ হয়ে উঠছিলো। তারপর ১৮ তারিখের দিকে শরীরে লাল লাল র‍্যাশ দেখে বরিশাল শেরেবাংলা নগর হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে ২০ তারিখে তারা ঢাকার শিশু হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। 

হাহিবুর রহমান বলেন, এখন বাচ্চার অবস্থা অনেকটা ভালো। এখানের ট্রিটমেন্টও ভালোই। ডাক্তাররা আন্তরিক আছে। এখন আমার বাচ্চার কিছু টেস্ট দিয়েছে। সেগুলো দেখে হয়তো ঈদের আগেই বাড়ি ফিরে যেতে পারবো বললেন ডাক্তাররা। 

সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা 

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ দেয়া তথ্য মতে, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার (২২ মে)  সকাল ৮টা পর্যন্ত  গত ১৫ মার্চ থেকে পর্যন্ত হাম ও উপসর্গে ৪৯৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪১৪ জন। আর নিশ্চিত হামে ৮৫ জন মারা গেছে।

এছাড়া উল্লেখিত এই ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও এক হাজার ২৬১ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ দেখা দেয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ৫৪০ জনে। এবং নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৩২৯ জন।

তবে আসছে ঈদের ছুটিতে এই আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা আরও বেড়ে যাওয়া আশংকা করছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ফলে এই ছুটিতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। 

ঈদের ছুটিতে হামের সতর্কতা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঈদের ছুটিতে বিশাল সংখ্যক মানুষ স্থানান্তরিত হবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। এদের মধ্যে যাদের শরীরে হামের জীবাণু রয়েছে এবং যাদের জ্বর হওয়ার একদিন দুদিন পার হয়েছে তারা কিন্তু অন্যদের মধ্যে হাম ছড়াতে পারে। কারণ হামের ফুসকুরি ওঠার চারদিন আগে এবং চারদিন পর পর্যন্ত এটি জীবাণু ছড়ায় ভাইরাস ছড়ায়। ফলে আমরা আশঙ্কা করছি ঈদ যাত্রার মধ্য দিয়ে হামের ভাইরাস আরো একটু বেশি ছড়িয়ে যেতে পারে। ফলে ঈদের পরে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি আরেকটি সম্ভাবনা রয়ে গিয়েছে।  

তিনি আরও বলেন, এ কারণে আমরা সবাইকে বলব যাদের পরিবারের কোন একজন অথবা একাধিক কারো জ্বর থাকে তাহলে তাদের উচিত করে অপেক্ষা করা;  সেটি হামে রূপান্তরিত হয় কিনা সেটি লক্ষ্য করা এবং একই সাথে চিকিৎসা ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া।