Image description

ঢালিউডের ঈদ-সিনেমার ইতিহাস প্রায় সত্তর বছরের। এই উৎসব ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসের স্বর্ণালী সময়ের সাক্ষী। দেশের অগণিত ব্যয়বহুল ও ব্যবসাসফল ছবি মুক্তি পেয়েছে ঈদ মৌসুমে। অনেক নির্মাতার ক্যারিয়ারও দাঁড়িয়েছে এই উৎসবের ছবির হাত ধরে। ঈদে ছবি মুক্তি পাওয়া ছিল মর্যাদার ব্যাপার। সাধারণত নজিরবিহীন ও তারকাখচিত ছবিগুলোই জায়গা পেতো ঈদের জোয়ারে। সিনেমাবাসী সারা বছর অপেক্ষা করতেন এই সময়টির জন্য। প্রভাবশালী প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো চেষ্টা করতো প্রতি ঈদে অন্তত একটি বড় ছবি নিয়ে হাজির হতে। একইভাবে দর্শক-প্রদর্শকদেরও প্রতীক্ষা থাকত স্বনামধন্য সংস্থাগুলোর নতুন ছবির জন্য। ঈদের ছবি নিয়ে প্রযোজকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কখনও কখনও দ্বন্দ্বেও রূপ নিতো। তার ছবি কত প্রিন্ট হবে, কার ছবি কত প্রেক্ষাগৃহে চলবে, এসব নিয়েও উত্তেজনা তৈরি হতো। আর তারকাদের উপস্থিতিই ছিল উৎসবের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। তাদের টানেই দুই ঈদে সিনেমা হলে নেমে আসতো দর্শকের ঢল। প্রথম সারির প্রায় সব তারকার ছবিই মুক্তি পেতো এই সময়টিতে। যে তারকার ছবি ঈদে বড় মাপের ব্যবসা করতো, তিনিই এগিয়ে যেতেন তারকা খ্যাতির দৌড়ে। একসময় যেখানে তারকাদের যুদ্ধে জমে উঠতো ঈদের প্রতিযোগিতা, সেখানে গত কয়েক বছর ধরে অনেকটাই একনায়কনির্ভর হয়ে পড়েছে সেই আয়োজন। যদিও শাকিব খান ও তার ছবিকে কেন্দ্র করে প্রেক্ষাগৃহে প্রাণচাঞ্চল্য এখনও টিকে আছে, তবে আছে সংকট ও শঙ্কাও...। ঈদ-সিনেমার সাত দশকের ইতিহাস তুলে ধরা হলো এই আয়োজনে-

ষাটের দশক: উর্দু ছবির উৎপাত

ষাটের দশকের শুরুতে ছিল উর্দু ছবির দৌরাত্ম্য। ১৯৬৫ সালে ‘রুপবান’ মুক্তির পর বাংলা ছবির জোয়ার ওঠে। তবু পুরো দশকজুড়ে উর্দু ছবির সঙ্গে বাংলা ছবিকে লড়ে যেতে হয়। ঢাকায় ছবি নির্মাণ শুরু হওয়ার পর ঈদে প্রথম যে ছবিটি মুক্তি পায়, তা একটি উর্দু ছবি। মুস্তাফিজের বিখ্যাত সেই ছবি ‘তালাশ’ মুক্তি পায় ১৯৬৩ সালের ঈদুল আজহায়।

ষাটের দশকে আরও অনেক বিখ্যাত উর্দু ছবি মুক্তি পায় ঈদে। জহির রায়হানের ‘সঙ্গম’ ও ‘বাহানা’ এবং এহতেশামের ‘চকোরী’ ঈদে মুক্তি পাওয়া ছবি। ‘সঙ্গম’ পুরো পাকিস্তানের প্রথম রঙিন ছবি। আফজাল চৌধুরী এই ছবির চিত্রধারণ করেন। খলিল, রোজী, হারুন এবং সুমিতা দেবীর অভিনয়সমৃদ্ধ এই ছবি পাকিস্তানে তুমুল সাড়া ফেলে। ‘বাহানা’ও একই পথের পথিক। আফজাল চৌধুরীর ক্যামেরাচালনায় এই ছবি পাকিস্তানের প্রথম সিনেমাস্কোপ ছবি। রহমান-কবরী জুটির এই ছবি দর্শকজোয়ারে ধন্য। ‘চান্দা’র পর এহতেশামের আরেক রেকর্ডের ছবি ‘চকোরী’। নাদিম-শাবানা জুটির এই ছবি ব্যাপক ব্যবসায়িক সাফল্য পায়।ষাটের দশকের তিনটি আলোচিত সিনেমার পোস্টারষাটের দশকের তিনটি আলোচিত সিনেমার পোস্টারষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে বাংলা ছবিও ঈদে মুক্তি পেয়ে তুমুল সাফল্য পেতে থাকে। সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ এবং খান আতাউর রহমানের ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ঈদে মুক্তি পাওয়া ছবি। বাংলা সিনেমার প্রতিষ্ঠার পথে এই দুটি ছবির ভূমিকার কথা সবারই জানা। ‘সুতরাং’ ছবির মধ্য দিয়ে পরিচালক হিসেবে সুভাষ দত্তের এবং নায়িকা হিসেবে কবরীর আত্মপ্রকাশ ঘটে। এ ছবির গানগুলো এখনও শ্রোতাদের কানে গুঞ্জরন তোলে।

পরিচালকদের মধ্যে জহির রায়হান, এহতেশাম, খান আতাউর রহমান এবং সুভাষ দত্তের ছবিই বেশি মুক্তি পায় ঈদে। তারকাদের মধ্যে রহমান ও শবনমেরই দাপট দেখা যায়। এই জুটির সাফল্য ছিল প্রায় নিশ্ছিদ্র।

সেই সময় একটি নতুন ছবি ৬/৭টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতো। কখনও-কখনও বড় প্রযোজনা সংস্থার উর্দু ছবি হলে আরও বেশি সিনেমা হলেও মুক্তি পেতো। জহির রায়হানের ‘বাহানা’ পূর্ব পাকিস্তানের ৬টি সিনেমা হলে একযোগে মুক্তি পায়।

একটি ছবি হিট হয়েছে কিনা তা বোঝা যেত কোনও ছবি সিলভার জুবিলি তথা ২৫ সপ্তাহ অতিক্রম করলে। ছবির বড় সাফল্যের লক্ষণ ছিল কোনও ছবির গোল্ডেন জুবিলি তথা ৫০ সপ্তাহ অতিক্রম হওয়া। ‘তালাশ’ ব্যবসার দিক থেকে রজতজয়ন্তী পার করা একটি ছবি।

ষাটের দশকে ঈদে ছবি মুক্তির জন্য নির্মাতাদের মধ্যে তেমন কাড়াকাড়ি ছিল না। তখন ছবির উৎপাদন ছিল কম। ৪০টার বেশি ছবি কোনও বছরই তৈরি হয়নি। ফলে ঈদের বাইরেও বড় ছবি মুক্তি পেতো, সেসব ছবি সাফল্যও পেতো। ঈদের মধ্যে ব্যবসা আটকে থাকতো না।

ঢাকায় নির্মিত উর্দু ছবি সরাসরি উর্দু ভাষায় যেমন মুক্তি পেতো, তেমনই উর্দু থেকে বাংলায় ডাব করেও ছবি মুক্তি পেতো। যেমন, ‘তালাশ’ ছবিটি স্বাধীনতার পরে ডাব করে বাংলাদেশে মুক্তি দেওয়া হয়। আবার উর্দু ও বাংলা এই দুটো ভাষাতেও একই সঙ্গে চিত্রায়িত হতো কিছু ছবি। ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ এমনই একটি ছবি।

শুরুর দিকে সামাজিক ছবির আধিক্য দেখা যায়। পরের দিকে এই ধারার ছবির সঙ্গে যুক্ত হয় ফোক ঘরানার ছবি। ছবির ধরন যেমনই হোক না কেন, দর্শক পছন্দে ঈদের ছবি বরাবরই এগিয়ে থাকতো।

সত্তর দশক: পোশাকি ছবির পসার

স্বাধীনতার পরপরই ঈদ হয়ে ওঠে সিনেমার উৎসব। একে তো উর্দু ছবির প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যায়, সেই সঙ্গে উপমহাদেশের ছবি আমদানিও নিষিদ্ধ থাকে। ফলে বাংলা ছবির প্লাবন সৃষ্টি হয়। প্রচুর ছবি তৈরি হতে থাকে। সত্তর দশকের প্রথম ভাগে কিছুটা কম, কিন্তু দ্বিতীয় ভাগ থেকে ছবি উৎপাদনের হিড়িক পড়ে।

১৯৭২ সালের ঈদেই ব্যবসার রেকর্ড তৈরি হয়ে যায়। এই বছরের ঈদুল ফিতরে মুক্তি পেয়ে কাজী জহিরের ‘অবুঝ মন’ পাকিস্তান আমলের সব ব্যবসায়িক রেকর্ড ভেঙে দেয়। রাজ্জাক, শাবানা ও সুজাতা অভিনীত এই ছবি গান-গল্পে গোটা বাংলাদেশকে আলোড়িত করে। এখান থেকেই শুরু হয় ঈদের ছবির জয়জয়কার।

সত্তর দশকের যত বড় বড় হিট ছবি, তার অধিকাংশই মুক্তি পায় ঈদে। জহিরুল হকের ‘রংবাজ’, খান আতার ‘সুজন-সখী’, এসএম শফির ‘দি রেইন’, আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ এবং ইবনে মিজানের ‘জিঘাংসা’, ‘বাহাদুর’ ও ‘নিশান’ মুক্তি পায় ঈদে। এই ছবিগুলো শুধু সত্তরের দশকের সেরা ছবিই নয়, সিনেমার ইতিহাসেও এগুলোর পদচিহ্ন অত্যন্ত উজ্জ্বল।সত্তর দশকের তিনটি আলোচিত সিনেমার পোস্টারসত্তর দশকের তিনটি আলোচিত সিনেমার পোস্টারসত্তর দশকের ঈদের ছবিগুলোর সাফল্য তৈরি করে দেয় বেশ কয়েকজন বাণিজ্যসফল নির্মাতার ক্যারিয়ার। আলমগীর কুমকুম, মোহসীন, অশোক ঘোষ, সিরাজুল ইসলাম ভূইয়া, মমতাজ আলী, সাইফুল আজম কাশেম, কামাল আহমেদের ক্যারিয়ারে এই দশকের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত তাদের পরিচালিত ছবিগুলোর ভূমিকা অনেকখানি।

তারকাদের বেলায়ও ঈদের ছবির খোলামেলা অবদান রয়েছে। রাজ্জাকের ক্যারিয়ারে নতুন ইনিংসের সূচনা ‘রংবাজ’-এর সাফল্যে। শাবানার ক্যারিয়ারে ‘অবুঝ মন’ এক মাইলফলক। কবরীর ক্যারিয়ারে ‘সুজন-সখী’র মতো ছবি দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া ভার। ববিতার জন্য ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘নিশান’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ ছবিগুলো অরুণের মতোই জ্বলজ্বলে। আর ওয়াসীমের উত্থান ও বিকাশ এই দশকেরই ঈদের ছবি ‘বাহাদুর’, ‘কে আসল কে নকল’, ‘দি রেইন’-এর মধ্য দিয়ে।

১৯৭৪ সালের ঈদুল ফিতরের ব্যবসা সফল ছবি ‘ভাই-বোন’ মুক্তি পায় ৮টি সিনেমা হলে। সেই সময় নতুন ছবি ৭/৮টি সিনেমা হলেই মুক্তি পেতো। সত্তর দশকের শেষের দিকে অবশ্য ছবিপ্রতি সিনেমা হলের সংখ্যা ১০/১২টিতে উন্নীত হয়।

তখন ঈদে ছবির ব্যবসা এতটা বেড়ে যায় যে প্রযোজক-প্রদশর্করা এই দিনটির জন্য মুখিয়ে থাকতেন। ১৯৭৭ সালের ঈদুল ফিতরের সময় ছবির লাভের হিস্যা নিয়ে প্রযোজক-প্রদর্শক দ্বন্দ্ব বাঁধে। সেই গোলমালের মধ্যেই প্রদর্শকরা প্রযোজকদের নিষেধাজ্ঞার পরোয়া না করে ছবি মুক্তি দেন। ‘নিশান’ ও ‘দাতা হাতেম তাই’ চালিয়ে হল মালিকরা প্রচুর মুনাফার মুখ দেখেন।

সত্তরের দশকে বিভিন্ন ধারার ছবি ঈদে দর্শকপ্রিয় হয়েছে। সফল ছবির তালিকায় যেমন ‘আগুন’-এর মতো সামাজিক ছবি আছে, আবার ‘দস্যুরাণী’র মতো ফ্যান্টাসি ছবিও আছে। ‘রংবাজ’-এর সূত্র ধরে যে অ্যাকশন ঢাকাই সিনেমায় যুক্ত হয়, গোটা সত্তর দশকজুড়েই এর দাপট দেখা গেছে। ইবনে মিজানের ছবি মানেই ছিল অ্যাকশনে ভরপুর বিনোদন ছবি। ঈদে তার ছবিই মুক্তি পেয়েছে বেশি। সেসব ছবির সাফল্যও চোখধাঁধানো। ফলে পরের দশকেও ইবনে মিজানের ফর্মুলার জয়জয়কার দেখা গেছে।

আশির দশক: ব্যবসার বাড়বাড়ন্ত

আশির দশকের শুরুতে ঢাকাই সিনেমার ব্যবসা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়। দশকের শুরুতে ৪০/৫০টি ছবি মুক্তি পেলেও দশক শেষ হতে হতে এই সংখ্যা ৬০/৭০টিতে গিয়ে ঠেকে। আগে ঈদে যেখানে দুটি ছবি মুক্তি পেতো, সেখানে এখন ৪-৫টি করে ছবি মুক্তি পেতে থাকে। কখনও কখনও এই সংখ্যাও ছাড়িয়ে যায়। ফলে লটারি করা ছাড়া আর উপায় থাকে না। একাধিক ছবির মধ্য থেকে প্রযোজক-পরিবেশক সমিতি ৪টি বা ৫টি ছবিকে মুক্তির অনুমোদন দিতো।

তবে এর মধ্যেও কায়দা করে বড় বড় প্রযোজনা সংস্থাগুলো ঈদে ছবি মুক্তির মিছিলে ঢুকে যেত। যথাযথ প্রস্তুতি আর সমিতিতে প্রভাবের কারণে গুটিকয় প্রোডাকশন হাউজকে কখনোই ঈদ উৎসবের বাইরে রাখা যেত না। এখান থেকেই ঈদ সিনেমা শিল্পে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। ঈদে কেবল ব্যয়বহুল ছবি মুক্তি পেতে শুরু করে। তারকাখচিত ছবিই কেবল উৎসবে ঠাঁই পেতে থাকে। ঈদ হয়ে ওঠে নির্মাতাদের সম্মানের লড়াই।

আলমগীর পিকচার্স, মাসুদ কথাচিত্র, পারভেজ ফিল্মস, এসএস প্রডাকশন্স, মধুমিতা মুভিজের দাপট দেখা গেছে আশির দশকজুড়ে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছরই ঈদে ছবি নিয়ে আসতে চেষ্টা করেছে। দর্শক-প্রদর্শকদেরও প্রতীক্ষা থাকতো এই ব্যানারগুলোর ছবির জন্য। মধুমিতা মুভিজ একাই ‘মাসুম’, ‘ঈদ মোবারক’, ‘বাগদাদের চোর’, ‘দূরদেশ’-এর মতো ছবি ধারাবাহিকভাবে মুক্তি দিয়ে আশির দশকের ঈদ উৎসবগুলোকে ঝলমলে করেছে।আশি দশকের তিনটি আলোচিত সিনেমার পোস্টারআশি দশকের তিনটি আলোচিত সিনেমার পোস্টারআর তারকাদের তো জবাবই নেই। তাদের টানেই বছরের দুই ঈদে ঢল নামতো সিনেমা হলে। রাজ্জাক, শাবানা, সোহেল রানা, রোজিনা, আলমগীর, অঞ্জু, ওয়াসীম, জসীম, অঞ্জনা- বলতে গেলে প্রথম সারির সব তারকার ছবিই থাকতো ঈদে। তারকাদের উচ্চতা মাপার একটা মাপকাঠিও হয়ে দাঁড়ায় ঈদ। ঈদে যার ছবি মুক্তি পেতো এবং ভালো চলতো, তারকা দৌড়ে সেই এগিয়ে যেতেন।

পরিচালকদের মধ্যে ঈদে সবচেয়ে বেশি ছবি মুক্তি পায় ইবনে মিজান ও এফ কবির চৌধুরীর। আশির দশকে সংখ্যাতত্ত্বের দিক থেকে নিঃসন্দেহে প্রথম দুটি আসন ফোক-ফ্যান্টাসি সিনেমার এই দুই ম্যাজিশিয়ানের। সামাজিক ছবির পরিচালকদের মধ্যে কামাল আহমেদের নাম না বললেই নয়। আর অ্যাকশন সিনেমার পরিচালক হিসেবে মাসুদ পারভেজ ও শহীদুল ইসলাম খোকনের নাম না নিলে অন্যায় হবে।

আশির দশকে ঈদে মুক্তি পেয়ে ব্যবসা করে চমকে দেয়, এমন ছবিগুলোর নাম বলতে গেলে বলতে হবে দীলিপ বিশ্বাস পরিচালিত ‘অস্বীকার’, শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘লড়াকু’, ‘বীর পুরুষ’, গাজী মাজহারুল আনোয়ার পরিচালিত ‘সন্ধি’, মতিন রহমান পরিচালিত ‘রাঙা-ভাবী’, সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘স্বামী-স্ত্রী’, নায়করাজ পরিচালিত ‘চাপাডাঙার বউ’, কামাল আহমেদ পরিচালিত ‘ভাঙাগড়া’, মিতা পরিচালিত ‘সাহেব’, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু পরিচালিত ‘অমর’, অশোক ঘোষ পরিচালিত ‘হিম্মতওয়ালী’, এ জে মিনটু পরিচালিত ‘লালু মাস্তান’ ইত্যাদির কথা।

ছবির ধরনের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, ফোক-ফ্যান্টাসি ছবি পুরো দশকজুড়ে দাপট দেখিয়েছে। সামাজিক ছবিও ভালো ব্যবসা করেছে। অ্যাকশন ছবিরও বাজার ধরতে অসুবিধা হয়নি। এমনকি সাহিত্যভিত্তিক ছবিও ঈদে চলেছে। বিচিত্র স্বাদের ছবি দর্শকরা ঈদে দেখেছেন। কখনও তলোয়ারবাজি জিতেছে, কখনও মার্শাল আর্ট জিতেছে। কখনও আবার দর্শক সিনেমা হলে হু হু করে কেঁদেছেন। বিনোদনের সমস্ত আয়োজন নিয়ে ভরপুর ছিল আশির দশকের ঈদ।

নব্বই দশক: তুমুল তারুণ্য

নব্বই দশকে এসে ঢাকাই সিনেমার ঈদ বিশেষ মহত্ত্ব অর্জন করে। ঈদের ছবির প্রতি দর্শক, নির্মাতা, হল মালিক, সকল পক্ষেরই আগ্রহের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে। ঈদের জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকতে শুরু করে ইন্ডাস্ট্রি। ঈদের ছবিতে ঘটবে সেরা তারকা, সেরা পরিচালক আর সেরা প্রযোজকের সম্মেলন, এই প্রত্যাশায় দিন গুনতে থাকেন দর্শকও। ফলে ঈদের ছবি নিয়ে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতার সূত্রপাত হয়। প্রযোজকরা নিজেদের ছবি নিয়ে ঈদে আসার জন্য যেকোনও কিছু করতে প্রস্তুত হয়ে ওঠেন। এ কারণে ঈদের ছবি নিয়ে প্রযোজকদের মধ্যে বিরোধের মতো ঘটনা ঘটে। কখনও প্রশাসনকে হস্তক্ষেপ করতে হয়, কখনোবা সরকারের ওপর মহল থেকে চাপ প্রয়োগ করতে দেখা যায়। কয়েকটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তো রীতিমতো ঈদকে নিজেদের সম্পত্তি বলেই ভাবতে শুরু করে!

প্রথমে বলতে হয় এসএস প্রডাকশন্স আর আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটেডের কথা। এমন কোনও বছর নেই যে বছর তারা ঈদে ছবি মুক্তি দেয়নি। নব্বই দশকের প্রত্যেক বছরেই তাদের সফল পদচিহ্ন রয়েছে। এই দুটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে ছাড়া নব্বই দশকের সিনেমার ঈদ ভাবাই যায়নি। নব্বই দশকে এসএস প্রডাকশন্স থেকে আসে ‘রাজার মেয়ে বেদেনী’, ‘অবুঝ সন্তান’, ‘দুঃসাহস’, ‘কন্যাদান’, ‘ঘাত-প্রতিঘাত’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘মেয়েরাও মানুষ’ এবং ‘স্বপ্নের পুরুষ’। আনন্দমেলা থেকে আসে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘স্বজন’, ‘জনতার বাদশা’, ‘অগ্নিসাক্ষী’ এবং ‘বিয়ের ফুল’।

এসএস প্রডাকশন্স ও আনন্দমেলা সিনেমা ছাড়াও একাধিক ব্যানারের দাপুটে উপস্থিতি ছিল নব্বই দশকে। এদের মধ্যে গীতি চিত্রকথা, জ্যাম্বস প্রডাকশন, মেরিনা মুভিজ, সনি কথাচিত্রের নাম বলতেই হয়। এর বাইরে দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর মধ্য থেকে কয়েকটি প্রযোজনা সংস্থা নিয়মিত ছবি নিয়ে আসতো ঈদে।

পরিচালকদের ঈদে সবচেয়ে তৎপর দেখা যেত দেলোয়ার জাহান ঝন্টুকে। তিনি প্রায় প্রতি ঈদেই ছবি নিয়ে আসতেন। ‘রূপসী নাগিন’, ‘জজ ব্যারিস্টার’, ‘কন্যাদান’, ‘বুকের ধন’, ‘হারানো প্রেম’, ‘প্রেম’ তার ঈদে মুক্তি পাওয়া ছবি। যে ঈদে তিনি নিজে আসতে পারতেন না, সেই ঈদে ভাই-ব্রাদার কাউকে নিয়ে আসতেন। হয় ইফতেখার জাহান আসতেন, নয়তো ইস্পাহানি আরিফ জাহান আসতেন। তাকে ছাড়া ঢালিউডের ঈদ প্রায় অসম্ভব ছিল।নব্বই দশকের তিনটি আলোচিত সিনেমার পোস্টারনব্বই দশকের তিনটি আলোচিত সিনেমার পোস্টারঝন্টুর পরেই আসবে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম। ‘উল্কা’, ‘তপস্যা’, ‘ক্ষুধা’, ‘সমর’ ইত্যাদি তার ঈদে মুক্তি পাওয়া ছবি। তরুণদের মধ্যে মনোয়ার খোকন নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে প্রতি বছর অন্তত একটি ছবি নিয়ে এসেছেন ঈদে। ‘সংসারের সুখ-দুঃখ’, ‘ঘাত-প্রতিঘাত’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘মেয়েরাও মানুষ’, ‘স্বপ্নের পুরুষ’ তার ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি। এর বাইরে সোহানুর রহমান সোহান, শহীদুল ইসলাম খোকন আর মোতালেব হোসেনও ঈদে নিজেদের ছবি নিয়ে দর্শকদের তৃপ্ত করতে এগিয়ে আসেন।

তারকাদের মধ্যে শাবানা নব্বই দশকে এসেও ঈদের প্রধান তারকা বলে বিবেচিত হন। প্রতি বছরই ঈদে তার উপস্থিতি নিশ্চিত। দুয়েকটি ঈদ ছাড়া প্রতি ঈদেই তার ছবি মুক্তি পেয়েছে। ১৯৯৬ সালে এক ঈদে তার চারটি ছবি মুক্তি পেয়ে রেকর্ড তৈরি করে। ‘তপস্যা’, ‘স্ত্রী হত্যা’, ‘বিদ্রোহী কন্যা’ আর ‘বিশ্বনেত্রী’ মুক্তিপ্রাপ্ত চারটি ছবিই ছিল সুপারহিট। এই রেকর্ড আজ অবধি কেউ ভাঙতে পারেনি। আলমগীর অনেক ছবিতেই তাকে সঙ্গ দিয়েছেন। কিছু ছবিতে জসীম ছিলেন। ঈদে জসীম-শাবানা জুটির ছবি দর্শক-প্রদর্শকদের কাছে আগ্রহের তুঙ্গে থাকতো।

পরের প্রজন্মের মধ্যে রুবেলের একাধিক ছবি ঈদে মুক্তি পেয়ে সাফল্য পায়। ইলিয়াস কাঞ্চনও নিয়মিত আসেন ঈদে। কিছু ছবিতে মান্নাকে দেখা যায়। দিতি-চম্পাও ঈদে ছবি নিয়ে আসেন। তবে নব্বই দশক মূলত তরুণ তারকাদের উপস্থিতিতে উজ্জ্বল। ঈদে অমর নায়ক সালমান শাহর কাছ থেকে আমরা পেয়েছি ‘তুমি আমার’, ‘দেনমোহর’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’র মতো সুপার-ডুপারহিট ছবি। ওমর সানী, মৌসুমী, শাবনূর, শাহনাজ, শাবনাজ- এই তরুণ তুর্কিরা নব্বই দশকের ঈদগুলো মাতিয়ে রাখেন। পুরনো আর নতুন তারকারা মিলে প্রচুর হিট-সুপারহিট ছবি বক্স অফিসে উপহার দিয়েছেন।

‘আজকের হাঙ্গামা’, ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘জজ ব্যারিস্টার’, ‘কালিয়া’, ‘বাংলার বধূ’, ‘হিংসা’, ‘স্বজন’, ‘ঘাত-প্রতিঘাত’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘বিয়ের ফুল’, ‘এই মন তোমাকে দিলাম’, ‘জিদ্দি’, ‘রানী কেন ডাকাত’-এর মতো সুপারহিট সব ছবি খোদাই করা আছে নব্বই দশকের বক্স অফিসের ইতিহাসে।

এই ছবিগুলোর মধ্যে কিছু ছবি ২০-২৫টি সিনেমা মুক্তি পায়। কিছু ছবি ৪০-৫০টি হলেও মুক্তি পায়। অন্য সময় ২৫-৩০টি প্রেক্ষাগৃহে ছবি চললেও ঈদের সময় চাহিদা অনুসারে কোনও ছবি ৪০টি, কোনও কোনও ছবি অর্ধশতাধিক সিনেমা হলেও মুক্তি পাওয়ার রেকর্ড তৈরি করে। ঈদের বাইরে এত অধিকসংখ্যক প্রেক্ষাগৃহে ছবি মুক্তির রেকর্ড নেই।

নব্বই দশকের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলোর মধ্যে ফোক ছবির একেবারেই প্রাধান্য নেই। পোশাকি সিনেমার যুগ শেষ হয়ে যায় নব্বইয়ের শুরুতেই। বেশিরভাগ ব্লকবাস্টার ছবি সামাজিক ধারার। কিছু ছবি রোমান্টিক ঘরানার। সামাজিক অ্যাকশন ছবির হিট হওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। আদ্যোপান্ত অ্যাকশন ছবি প্রচুর মুক্তি পেলেও বড় সাফল্য কম। তবে গড়সাফল্য মন্দ নয়। সুনির্মিত যেকোনও ধারার ছবিকেই দর্শকরা অভিনন্দিত করেছেন নব্বই দশকজুড়ে।

শূন্য দশক: চারপাশে শূন্যতা

২০০০ সালের প্রথম সূর্যোদয় ঢালিউডের ভাগ্যাকাশে সূচনা করে দুর্যোগের। সিনেমা শিল্পে দেখা দেয় অশ্লীলতা। ধীরে ধীরে ঢালিউড পর্নো সিনেমার আখড়া হয়ে ওঠে। সংলাপে গালিগালাজ, গানে নারীদেহের প্রদর্শনী, গল্পে সন্ত্রাস-খুন-ধর্ষণ, প্রচারণায় ইতরতা, সব মিলিয়ে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এক গভীর খাদে নিমজ্জিত হয়। তখন দর্শককে সিনেমা হলে টেনে আনাই দুষ্কর হয়ে ওঠে। বিশেষত মহিলা দর্শককে আর ছবিঘরে খুঁজে পাওয়া যায় না। ভার্সিটি পড়ুয়ারা দলবেঁধে আর সিনেমা হলে যেতে আগ্রহী নয়। ফলে প্রেক্ষাগৃহগুলো বখাটেদের স্থায়ী আড্ডা হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে অসামাজিক কাজের নিরাপদ অভয়ারণ্য।

এই সময় ব্যানার প্রথার একরকম অবসান ঘটে। যে সমস্ত প্রযোজনা সংস্থা একসময় ঈদ এলেই নতুন ছবি নিয়ে হাজির হতো, তারা সিনেমা শিল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। এর মধ্যেও কয়েকটি প্রডাকশন হাউজকে নিয়মিত ছবি বানাতে দেখা যায়। কিবরিয়া ফিল্মস, শুভ ইন্টারন্যাশনাল, বন্ধন বাণীচিত্র, সজনী ফিল্মস, পিংকি চলচ্চিত্র-এর মতো গুটিকয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানই নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে সমর্থ হয়। এর বাইরে ডিপজল ও তার ভাইয়ের প্রযোজনা সংস্থা অমিবনি কথাচিত্র ও পর্বত পিকচার্স থেকে বেশ কিছু ঈদের ছবি তৈরি হয়।

পরিচালকদের মধ্য থেকে কয়েকজনের এই সময় উত্থান ঘটে। মনতাজুর রহমান আকবর, এফ আই মানিক, বদিউল আলম খোকন এবং শাহাদাৎ হোসেন লিটনের পরিচালনায় সবচেয়ে বেশি ছবি মুক্তি পায় শূন্য দশকের ঈদগুলোতে। এফ আই মানিক বক্স অফিসে উপহার দেন ‘এ বাঁধন যাবে না ছিঁড়ে’, ‘স্বপ্নের বাসর’, ‘হৃদয়ের বন্ধন’, ‘মান্না ভাই’, ‘পিতা মাতার আমানত’-এর মতো সুপারহিট ছবি। মনতাজুর রহমান আকবর গর্বিত পরিচালক হোন ‘কুখ্যাত খুনি’, ‘গুণ্ডা নাম্বার ওয়ান’, ‘ঢাকাইয়া মাস্তান’-এর মতো সুপারহিট ছবির। ‘দানব’, ‘ধ্বংস’, ‘নিষ্পাপ কয়েদী’-এর মতো সুপারহিট ছবি বাজারে ছাড়েন বদিউল আলম খোকন। শাহাদাৎ হোসেন লিটন সংখ্যাতত্ত্বে এগিয়ে থাকলেও তার ছবি অধিকাংশই অশ্লীলতার দোষে দুষ্ট।

ঈদের কাজের দিক থেকে আরও বলতে হয় কয়েকজন পরিচালকের নাম। তাদের মধ্যে এগিয়ে থাকবেন উত্তম আকাশ ও সাফি ইকবাল। এই দুজনের পরে আসবেন মালেক আফসারী, পি এ কাজল, ইস্পাহানি আরিফ জাহান, আজাদী হাসনাত ফিরোজ এবং এনায়েত করিম ও শরিফউদ্দিন দীপু। শেষোক্ত দুজন মূলত ছিলেন অশ্লীল ছবির প্রযোজক, পরিচালক ও পৃষ্ঠপোষক।শূন্য দশকের তিনটি আলোচিত সিনেমার পোস্টারশূন্য দশকের তিনটি আলোচিত সিনেমার পোস্টারতারকাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে শূন্য দশকের প্রধান তারকা মান্না। প্রতি ঈদেই তার একটি দুটি ছবি মুক্তি পায়। ২০০২ সালের ঈদুল ফিতরে মান্না অভিনীত ‘বোমা হামলা’, ‘আঘাত পাল্টা আঘাত’, ‘ধ্বংস’ এবং ‘ভাইয়া’—এই চারটি ছবি মুক্তি পায় একযোগে। তখন তিনি জনপ্রিয়তার মধ্যগগনে ছিলেন। তার সঙ্গে তখন তাল মিলিয়েছেন রুবেল, আমিন খান, শাকিব খানরা। জুটি হিসেবে রিয়াজ-শাবনূর একাধিক ছবি নিয়ে ঈদে হাজির হয়েছেন। মান্না-মৌসুমী, রুবেল-পপি জুটিরও চাহিদা ছিল দেখার মতোই।

শূন্য দশকের সবচেয়ে বড় ঘটনা হচ্ছে ঈদের দিন স্যাটেলাইট চ্যানেলে নতুন ছবির প্রিমিয়ার। হলবিমুখ দর্শকদের বিশাল বাজারকে ধরতে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এই সময় এগিয়ে আসে। ‘ব্যাচেলর,’ ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’, ‘রং নাম্বার’, ‘শ্যামলছায়া’, ‘লাল সবুজ’, ‘শাস্তি’, ‘মেহেরনেগার’, ‘রূপকথার গল্প’, ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’, ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’সহ আরও কিছু ছবি চ্যানেল আইতে প্রদর্শিত হয় ঈদের দিন। পরে এই ছবিগুলো বলাকাসহ গুটিকতক প্রেক্ষাগৃহে চলে।

শূন্য দশকেই দেখা মেলে মাল্টিপ্লেক্সের। স্টার সিনেপ্লেক্সের হাত ধরে সাবালক হয় ঢালিউড। কিন্তু শুরুতেই বাংলা ছবির জন্য কোনও সুখবর দিতে পারেনি মাল্টিপ্লেক্স চেইনটি। ইংরেজি ছবি আর ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রিমিয়ার করেই তার অনেক বছর কেটেছে।

সেই সময় ঈদে ছবি রিলিজের কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না। সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলো রিলিজ উন্মুক্ত করে দেয়। এর ফলে ১২-১৩টি ছবিও কোনও কোনও ঈদে রিলিজ পায়। অধিকাংশই কম বাজেটের ‘গরম মসলা’ ছবি। এগুলো রিলিজের সময় ২০ থেকে ২৫টি সিনেমা রিলিজ পেতো।

শূন্য দশকের শেষের দিকে চলচ্চিত্র শিল্পের হাওয়া ঘুরে যেতে শুরু করে। কাটপিসসর্বস্ব নির্মাতারা পিছু হটতে থাকেন। তারা সুস্থ ছবি তৈরি করে সিনেমার শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেন। মারদাঙ্গা-অ্যাকশন সিনেমা থেকে রোমান্টিক-সামাজিক সিনেমার এই পালাবদলে যে তারকার নামটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, তার নাম শাকিব খান। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা ঢালিউডের ঈদ-সিনেমার ইতিহাসে শাকিব খানের যুগ নিয়ে আলোচনা করবো।

শাকিব খানের দুই দশক: এক নায়কের একাধিপত্য

শাকিব খানের প্রথম ছবি ১৯৯৯ সালে মুক্তি পেলেও তার নবজন্ম ঘটে ২০০৬ সালে। ‘কোটি টাকার কাবিন’, ‘চাচ্চু’, ‘পিতার আসন’, ‘দাদীমা’-এই চারটি ছবির সাফল্য তাকে এক নাম্বার নায়ক হিসেবে ঢালিউডে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর গত দুই দশকে যত ঈদ এসেছে, প্রত্যেকটি ঈদেই তার ছবি মুক্তি পেয়েছে। গত ২০ বছরে তাকে ছাড়া কোনও ঈদ সিনেমাপাড়ায় হয়নি (ব্যতিক্রম কেবল কোভিডের এক বছর)।

শূন্য দশকে ঈদে তার অভিনীত ব্যবসা সফল ছবির মধ্যে আরও রয়েছে ‘নিষ্পাপ কয়েদী’, ‘ঢাকাইয়া পোলা বরিশালের মাইয়া’, ‘তোমার জন্য মরতে পারি’, ‘কথা দাও সাথী হবে’, ‘কঠিন প্রেম’, ‘এক বুক জ্বালা’, ‘মনে প্রাণে আছ তুমি’, ‘জান আমার জান’, ‘সাহেব নামে গোলাম’, ‘আমার প্রাণের প্রিয়া’, ‘ভালোবাসা দিবি কি না বল’ ইত্যাদি।

গত দশকে শাকিব খান ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র নির্ভরযোগ্য ও চাহিদাসম্পন্ন তারকায় পরিণত হন। বিশেষত ২০০৮ সালে মান্নার মৃত্যুর পর তিনি প্রতিদ্বন্ধিতাহীন হয়ে পড়েন। প্রতি ঈদেই তার দুটি থেকে পাঁচটি পর্যন্ত ছবি মুক্তি পেতে থাকে। ২০০৯ সালে এক ঈদেই তার ৫টি ছবি মুক্তি পায়। ওই বছরের ঈদুল ফিতরে তার অভিনীত ‘সাহেব নামে গোলাম’, ‘জান আমার জান’, ‘মায়ের হাতে বেহেশতের চাবি’, ‘বলো না কবুল’, ‘ও সাথীরে’ মুক্তি পায়। এগুলোর অধিকাংশই সুপারহিট হয়ে শাকিব খানকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

তখন থেকেই ইন্ডাস্ট্রি হয়ে পড়ে একনায়কনির্ভর। অন্য তারকাদের ছবি মুক্তি পেলেও খুব একটা চলে না। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের একটি করে ছবি প্রতি ঈদেই মুক্তি পায়। কিন্তু সেসব ছবির ব্যবসা খুব একটা হয় না। সিনেমা হলগুলো জিইয়ে রাখেন একা শাকিব খান। ২০০৯ সালের ঈদে এই তারকার ছবিগুলো চলে আড়াই শতাধিক সিনেমা হলে। এ ছাড়া আড়াইশ’র বেশি সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয় তার অভিনীত বিভিন্ন পুরনো ছবি। সব মিলিয়ে সেবার ৫ শতাধিক সিনেমা হলে তার ছবি চলেছে। তখন দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল কম-বেশি ৮০০।শাকিব খানের তিন আলোচিত সিনেমার পোস্টারশাকিব খানের তিন আলোচিত সিনেমার পোস্টারগত দশকে শাকিব খানের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ব্যানার প্রথারও উচ্ছেদ ঘটেছে। যে প্রযোজনা সংস্থাগুলো এই নায়ককে নিয়ে ছবি তৈরি করেছে, সেগুলোর একটি ছাড়া কেউ-ই আননন্দমেলা সিনেমা বা এসএস প্রডাকশন্সের মতো ঈদের ছবির মেজাজ বুঝে ঈদের জন্য নিয়মিত ছবি তৈরি করতে পারেনি। শুধু হার্টবিট প্রডাকশন অদ্ভুত ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিয়ে প্রতি বছর ঈদের ছবি বানিয়ে গেছে।

২০০৮ সালে শাকিব-অপু অভিনীত ‘মনে প্রাণে আছ তুমি’ দিয়ে নব্বই দশকের এই ব্যানারটির দ্বিতীয় ইনিংস শুরু হয়। এরপর একে একে তারা শাকিব খানকে নিয়ে নির্মাণ করে ‘আমার প্রাণের প্রিয়া’, ‘খোদার পরে মা’, ‘ফুল এন্ড ফাইনাল’, ‘লাভ ম্যারেজ’, সুপার হিরো’র মতো ছবি।

আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কথা বলতে হয়, সেটা হচ্ছে জাজ মাল্টিমিডিয়া। ২০১৩ সাল থেকে এই প্রযোজনা সংস্থাটি নিয়মিত ঈদে ছবি মুক্তি দিতে উদ্যোগী হয়। প্রতিষ্ঠান হিসেবে গীতি চিত্রকথা কিংবা জ্যাম্বস প্রডাকশনের মতোই প্রভাবশালী হিসেবে তাকে দৃশ্যপটে দেখা যায়। শাকিব খান ও তার ছবির প্রযোজকদের বাইরে একমাত্র আব্দুল আজিজই নিজেকে স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হোন।

২০১৩ সালের ঈদুল ফিতরের জন্য শাকিব খানকে নিয়ে এই প্রযোজক নির্মাণ করেন ‘ভালোবাসা আজকাল’। এরপর প্রায় প্রতি ঈদে জাজ-এর ছবি মুক্তি পায়। ‘অগ্নি টু’, ‘হানিমুন’, ‘আশিকী’, ‘বাদশা দ্য ডন’, ‘রক্ত’, ‘বস টু’, ‘পোড়া মন টু’ ইত্যাদি ছবি দিয়ে গোটা দশক কর্মতৎপর থেকেছে জাজ। তাদের হাত ধরে ডিজিটাল প্রদর্শনব্যবস্থা চালু হওয়ার পর ঈদের ছবি ৭০-৮০টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে শুরু করে। কোনও কোনও ছবি ১০০ সিনেমা হল ছাড়িয়ে যায়।

শাকিব খানেরও নবজন্ম দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৬ সালের ঈদে ‘শিকারী’ মুক্তির পর অন্যরকম এক শাকিব খানকে আবিষ্কার করেছে বাংলাদেশ। পরের বছর ‘নবাব’ ছবিটিও আগের ছবিটির মতো বাম্পারহিট হয়ে মুমূর্ষু ইন্ডাস্ট্রিতে অক্সিজেন সরবরাহ করেছে। তবে এই যৌথ প্রযোজনার ছবিগুলো প্রচুর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ছবিপাড়ায়। ইন্ডাস্ট্রিকে দুইভাগে ছিঁড়ে ফেলে যৌথ প্রযোজনার সিনেমা। ঈদ এলেই দেশি প্রযোজকদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের দায়ে দায়ী করা হতো যৌথ সিনেমাকে। এর বিরুদ্ধে সে সময় মিটিং, মিছিল, মহাসমাবেশ সবই হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির প্রতিবাদের মুখে যৌথ প্রযোজনার নীতিমালা কঠোর করা হলে এই ধারার সিনেমা কোমায় চলে যায়।

তখন আবার দেশি ছবির প্রযোজনা সংস্থার দিকে ঝুঁকে আসেন শাকিব খান। শাপলা মিডিয়ার সঙ্গে ‘চিটাগাইঙ্গা পোয়া নোয়াখাইল্লা মাইয়া’, ‘ক্যাপ্টেন খান’, ‘বিদ্রোহী’ করেন এই নায়ক। ছবিগুলো ঈদে বড় পরিসরে মুক্তি পায়।

প্রযোজক হওয়ার পরও শাকিব খান নিজের ছবি মুক্তি দিতে ঈদকেই বেছে নেন। তার প্রযোজনার ‘হিরো দ্য সুপারস্টার’ ও ‘পাসওয়ার্ড’ ছবি দুটি ঈদেই প্রদর্শিত হয়েছে।

প্রযোজক যারাই মোটা পুঁজি নিয়ে এসেছেন তাদের ছবিই করেছেন শাকিব খান। তবে পরিচালকের বেলায় তার বাছবিচার ছিল। যৌথ প্রযোজনায় যাওয়ার আগে ঈদের ছবির জন্য তার পছন্দের পরিচালক ছিলেন এফ আই মানিক, সোহানুর রহমান সোহান, বদিউল আলম খোকন, শাহিন সুমন, এমবি মানিক, উত্তম আকাশের মতো নির্মাতারা।

আর তার নায়িকা হিসেবে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে অপু বিশ্বাসকে। দুজনে মিলে বিভিন্ন ঈদে অন্তত ডজন দুয়েক ছবি হাজির করেছেন দর্শকদের সামনে। অন্য নায়িকাদের মধ্যে সাহারা, পূর্ণিমা, এমনকি শাবনূরকেও দেখা গেছে। কলকাতার কয়েকজন নায়িকা নিয়েও তিনি হাজির হয়েছেন ঈদে। শ্রাবন্তী, শুভশ্রী, ইধিকা, মিমির নাম পাওয়া যায় এই তালিকায়।

নায়িকার পর্ব তো গেলো, এবার নায়কের আলাপ। শাকিব খানকে টক্কর দেওয়ার মতো নায়ক বলতে গেলে কেউ-ই ছিল না। অনন্ত জলিল কয়েকটা ঈদে আওয়াজ দিয়েছেন। তার অভিনীত-প্রযোজিত ‘মোস্ট ওয়েলকাম’, ‘মোস্ট ওয়েলকাম টু’, ‘নিঃস্বার্থ ভালবাসা’, ‘দিন দ্য ডে’ ঈদে মুক্তি পেয়ে একটা বিশেষ শ্রেণির দর্শককে সিনেমা হলে টানতে পেরেছে। তবে এতে শাকিব খানের সাম্রাজ্যে সামান্য চিড়ও ধরেনি। কাজী মারুফ, বাপ্পি চৌধুরী, সাইমন সাদিক, আরিফিন শুভ, কেউই শাকিব খানের ঈদের বাজারে ভাগ বসাতে পারেননি সেই অর্থে।

তবে ঈদকে একতরফা হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন একজন মাত্র অভিনেতা, তিনি আফরান নিশো। আলোচনা করা যাক শাকিব খানের তৃতীয় ইনিংস নিয়ে। এর শুরু ২০২৩ সালের ব্লকবাস্টার ‘প্রিয়তমা’ ছবি দিয়ে। সেই বছর আফরান নিশোও আসেন ঈদে। মুক্তি পায় তার প্রথম ছবি ‘সুড়ঙ্গ’। এত জমজমাট ঈদ বহু বছর দেখেনি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি।

পরের বছরটা অবশ্য আবারও শাকিবময় হয়ে যায়। এক ঈদে ‘রাজকুমার’, আরেক ঈদে ‘তুফান’। তার ধারে-কাছে আর কেউ নেই। এক ‘তুফান’ দিয়ে শাকিব খান তার ক্যারিয়ারকে কয়েক বছরের জন্য নবায়ন করে নেন। অবশ্য তার হাত ধরে ঈদ-সিনেমার ধরনেও আসে পরিবর্তন। ভায়োলেন্স-ভরপুর সিনেমাও যে ঈদে দলবেঁধে লোকে দেখতে পারে, এটা একদমই স্মৃতির বাইরে ছিল ঈদ-অভিজ্ঞদের।শাকিবের রাজত্বে চিড় ধরানো তিন সিনেমার পোস্টারশাকিবের রাজত্বে চিড় ধরানো তিন সিনেমার পোস্টারগত বছর ‘বরবাদ’ দিয়ে ব্যবসার দিক থেকে নতুন রেকর্ড গড়েন শাকিব খান। ‘তাণ্ডব’ সেটাকে ছাড়িয়ে যেতে না পারলেও পুরনো সাম্রাজ্য ভালোভাবেই আঁকড়ে ধরে থাকেন শাকিব খান। ‘দাগি’ দিয়ে নিশো আর ‘জংলি’ দিয়ে সিয়াম ঈদ উৎসবে নতুন মাত্রা যোগ করেন গেল বছরের ঈদুল ফিতরে। এই তিন ছবির সঙ্গে ঈদুল আজহায় যোগ হয় ‘উৎসব’। পুরনো ঈদের অনুভূতি যেন ফিরে আসতে থাকে দর্শকদের। নব্বই দশকের মতো আবারও প্রেক্ষাগৃহে ঢল। তবে এবার সিঙ্গেল থিয়েটারে নয়, মাল্টিপ্লেক্সে সূচনা ঘটে সিনেমার নতুন দিনের।

একই সঙ্গে দেখা দেয় নতুন সংকটও। ঈদে উপর্যুপরি ব্যবসা সিনেমার বাস্তুতন্ত্র ধসিয়ে দেয়। যে সিনেমা মানে ছিল ৫২ সপ্তাহে ৫২ ছবি, সেখানে দুই ঈদে ছবি মুক্তির মহোৎসব ছাড়া পুরো ইন্ডাস্ট্রি হয়ে পড়ে রক্তশূন্য। সারা বছর সিনেমা হলে ছবি নেই। দর্শকের দেখা নেই। শুটিংয়ের খবর নেই। ঈদ ঘনিয়ে এলেই তোড়জোড়। ফিরে আসে দর্শক। ফিরে আসে ব্যবসা। ফিরে আসে ঐতিহ্য। অথচ সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে সামগ্রিকভাবে চাঙা করার কোনও উদ্যোগ নেই। না সরকারে কাছ থেকে, না সিনেমাওয়ালাদের কাছ থেকে, কোনও তরফেই বছরব্যাপী কর্মসূচি নেই। ধীরে ধীরে সিনেমা শিল্প ঈদকেন্দ্রিক এক আজব চলচ্চিত্র কারখানায় রূপান্তরিত হচ্ছে।

রায়হান রাফীর মতো বাজার কাটতি পরিচালক, আলফা আইয়ের মতো বড় ব্যানার, ঈদের ছবির জন্য তাদের উদ্যম, সব কিছুই যেন বিফলে যেতে বসেছে। চলচ্চিত্র শিল্প পড়ে গেছে ঈদের দুষ্টুচক্রে। অতিরিক্ত ওটিটি-নির্ভরতা সিনেমার গতিকে দুই ঈদের ভেতর আটকে ফেলেছে। বছরজুড়ে কর্মপরিকল্পনা না থাকায় সিনেমার চাকা যেন ঘুরতে গিয়েও ঘুরছে না। সিনেমা সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন- এই অচলাবস্থার শেষ কবে?

লেখক:

মাহফুজুর রহমান
মাহফুজুর রহমান

সাংবাদিক ও সমালোচক