দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাতটি কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ময়দানে হয়ে আসছে। এই মাঠে নামাজ পড়তে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন মুসল্লিরা। তবে কয়েক বছর ধরে শোলাকিয়ার পাশাপাশি নতুন একটি নামও শোনা যাচ্ছে, সেটি হলো গোর-এ-শহীদ মাঠ। দেশভাগের পর থেকে দিনাজপুরের এই মাঠে ঈদের জামাত হচ্ছে। ঈদ জামাতের জন্য প্রস্তুত আয়তনের দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় ঈদগাহ মিনার ও মাঠ দিনাজপুরের গোর-এ শহীদ। যেখানে ঈদের জামাতের জন্য সমবেতন হন লাখো মুসল্লি।
ঈদের জামাতকে ঘিরে এখানে সৌহার্দ্যের পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এখানে নামাজ পড়লে বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে-এ ধারণা থেকে অনেকেই দূরদূরান্ত থেকে থেকে আসেন। দিনাজপুর শহরের মধ্যভাগে অবস্থিত ময়দানে সাত থেকে আট বছর আগেও ছোট পরিসরে ঈদের নামাজ আদায় করা হতো। কিন্তু ২০১৭ সালে এখানে সংস্কারকাজ, স্থাপনা নির্মাণসহ কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়। এর পর থেকে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ঈদগাহ মাঠ হিসেবে পরিচিতি পায়। প্রতি বছর পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করতে আসেন এই মাঠে।
এরই মধ্যে মুসল্লিদের নির্বিঘ্ন প্রবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। মাঠ প্রস্তুত করা থেকে মাইক স্থাপন সব কাজই এখন প্রায় শেষ। নিরাপত্তার জন্য নেওয়া হয়েছে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবং নামাজ উপযোগী করতে রোলার দিয়ে সমান করা হয়েছে পুরো মাঠ। সবুজ ঘাসের ওপর চুন দিয়ে কাতারের দাগ কাটা হয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মুসল্লিদের অজুর ব্যবস্থাসহ সব ধরনের কাজ চলছে। মাঠের চারপাশে তৈরি করা হচ্ছে ২০টি প্রবেশদ্বার, যাতে মুসল্লিরা নির্বিঘ্নে প্রবেশ করতে পারেন। নিরাপত্তা জোরদারে বসানো হচ্ছে তিনটি ওয়াচ টাওয়ার। সেখান থেকে পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণে রাখবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মাঠে প্রবেশের আগে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করা হবে। এ ছাড়া থাকবে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। পুরো মাঠটি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিং করা হবে। মাঠ ও আশপাশের এলাকায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিটি কাতারেই থাকবেন সাদা বা সাধারণ পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সদস্যরা। ইমামের খুতবা ও নামাজের শব্দ সবার কাছে পৌঁছে দিতে বসানো হচ্ছে প্রায় ১০০টি মাইক।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে ছোট পরিসরে এখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। ২০১৫ সালে জেলা পরিষদের অর্থায়নে ঈদগাহ মিনারের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৭ সালে শেষ হয়। এর পর থেকে ঈদের জামাতে লোকসমাগম বেড়েছে কয়েক গুণ। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি জেলায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে মিনারটি।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, গোর-এ-শহীদ ময়দানে স্থাপিত ঈদগাহের মিনারটি তৈরি করা হয়েছে মোগল স্থাপত্যরীতিতে। এর অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে ছিল দিনাজপুর জেলা প্রশাসন। নির্মাণকাজে ব্যয় হয়েছিল চার কোটি টাকা। সবুজ ঘাসে মোড়ানো মাঠের আয়তন ২২ একর। মিম্বারের উচ্চতা ৫৫ ফুট। ৫২ গম্বুজবিশিষ্ট ঈদগাহ মিনারের দুই প্রান্তে দুটি মিনারের উচ্চতা ৬০ ফুট। মাঝের দুটির উচ্চতা ৫০ ফুট ও টাইলস করা মিম্বারের উচ্চতা ৪৭ ফুট। প্রতিটি গম্বুজে রয়েছে বৈদ্যুতিক বাতি। মসজিদে নববি, কুয়েত, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের স্থাপত্যশৈলীর আদলে তৈরি করা হয়েছে মিনারগুলো।
ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ মাঠের নাম নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে। জেলার কয়েকটি ইতিহাসগ্রন্থ থেকে জানা যায়, এ মাঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর উত্তর ফ্রন্টের সমাবেশ হয়েছিল। পরে মাঠটি সেনাবাহিনীর নামে রেকর্ডভুক্ত হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পারস্য থেকে এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে এসে মৃত্যুবরণ করেন শাহ আমিরউদ্দিন ঘুরি (রহ.)। পরে সময়ে মাঠসংলগ্ন স্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। আমিরউদ্দিন ঘুরি ঘোড়ায় চড়ে দিনাজপুরে ইসলাম প্রচার করেন। সে জন্য এ মাঠের নামকরণ করা হয়েছে গোর-এ-শহীদ।
আরেকটি জনশ্রুতি হলো, সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহের আমলে ইসলাম প্রচার নিয়ে ৪০ জন সুফি সঙ্গে ওই সময়ের এক হিন্দু রাজার যুদ্ধ হয়েছিল। সুফিদের একজন প্রাণ হারান। সেখানেই তাকে কবর দেওয়া হয়। ফারসিতে আরবি শব্দ কবর বলা হচ্ছে গোর। ওই সময়কার মুসলিম শাসকের ভাষা ফারসি হওয়ায় মাঠটি পরিচিতি পায় গোর-এ-শহীদ ময়দান হিসেবে।
স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই এই মাঠে ঈদের জামাত হয়ে আসছে। তবে মাঠটিতে তখন বড় কোনও মিম্বর ছিল না। ২০১৫ সালে বড় পরিসরে এখানে একটি ঈদগাহ মিনার তৈরির উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদ। দুই বছর পর ২০১৭ সালে শেষ হয় নির্মাণকাজ। মিনারটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৪ কোটি টাকা। আয়োজকদের দাবি, সেই বছর এই মাঠে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেন ছয় লাখের বেশি মুসল্লি। ইমামতি করেন মাওলানা শামসুল হক কাসেমী। এর পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে দেশের অন্যতম বৃহত্তম ঈদগাহ মাঠ হিসেবে পরিচিতি পায় গোর-এ-শহীদ মাঠ। প্রতি বছরের মতো এবারও কয়েক লাখ মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করবেন।
শহরের চাউলিয়াপট্টি এলাকার মোকাররম হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রতিবারই এই মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করি। এটি এখন আমাদের গর্বের। দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লিরা এখানে নামাজ আদায় করতে আসেন।’
শহরের ঈদগাহ আবাসিক এলাকার রহিম উদ্দিন বলেন, ‘ঈদের বড় জামাতে অংশগ্রহণ করার ইচ্ছে সবসময় থাকে। আমাদের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনরাও আসেন এই জামাতে অংশগ্রহণ করার জন্য। কয়েক লাখ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন।’
বাহাদুরবাজার এলাকার ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা গত কয়েক বছর ধরেই এই মাঠে নামাজ আদায় করি। খুবই সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে আমরা এখানে নামাজ আদায় করতে পারি। আশা করবো এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না। আমাদের কাছে এই মাঠ এখন ঐতিহাসিক এবং গর্বের।’
দিনাজপুরের পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা বলেন, ‘এই মাঠে সুষ্ঠুভাবে নামাজ আদায় করার জন্য তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে এবং ড্রোন ক্যামেরার মাধ্যমে মাঠটি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ ছাড়া সাদা পোশাকে পুলিশ থাকবে প্রতিটি কাতারে। আগত মুসল্লিদের আর্চের ভেতর দিয়ে এবং মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করে মাঠের ভেতরে প্রবেশ করানো হবে। এ ছাড়া যাতে কোনও যানজট না হয়, সেজন্য প্রতিটি মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের টিম থাকবে। গত কয়েক বছরের মতো এবারও শান্তিপূর্ণভাবে মুসল্লিরা ঈদ জামাত আদায় করতে পারবেন বলে আশা করছি।’