দেশের প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। দেশের সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনিক পণ্যমূল্যের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সম্প্রতি রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি হালি ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ৩৬-৪০ টাকা। আর মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা হলো, প্রতিটি ডিম উৎপাদনে যেখানে খরচ পড়ছে প্রায় সাড়ে ৯ টাকা, সেখানে খামারিদের বিক্রি করতে হচ্ছে সাড়ে ছয় টাকার মতো দামে। ফলে প্রতিটি ডিমেই প্রায় তিন টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। অথচ সেই ডিম আড়ত হয়ে খুচরা বাজারে সাধারণ ভোক্তাকে ১১ টাকায় কিনে খেতে হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে ১৮০-১৯০ এবং এক মাস আগে ১৭০-১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
পোল্ট্রি খাতে দিনের পর দিন এই লোকসান টেনে নেওয়া, ঋণের চাপ, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া, কর্মচারীর বেতন সব মিলিয়ে প্রান্তিক খামারিদের জীবন এখন অনিশ্চয়তার দোলাচলে। অনেকে খামার গুটিয়ে ফেলেছেন, কেউ অন্য পেশায় চলে গেছেন। আবার কেউ ঋণের চাপে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে থাকছেন। এদিকে বিশ্বজুড়ে মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস এখন পোল্ট্রি বা ফার্মের মুরগির মাংস। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই মাংসের চাহিদাও দিনদিন বাড়ছে। তবে এই প্রতিযোগিতায় বিশ্ববাজারে এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে মুরগির মাংস উৎপাদনে শীর্ষ ৫০টি দেশের মধ্যেও নেই বাংলাদেশ। প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, এমনকি শ্রীলঙ্কাও এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বৈশ্বিক উৎপাদন ডাটাবেজের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশে ফার্মের মুরগির (তাজা ও প্রক্রিয়াজাত) মোট উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৫০৭ দশমিক ৬৭ মেট্রিক টন। এই উৎপাদন নিয়ে বিশ্বের ১৮৭টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশ ৫৩তম অবস্থানে জায়গা করে নিয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে পোল্ট্রি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও বৈশ্বিক বাজারে উৎপাদন ও প্রতিযোগিতার দৌড়ে বাংলাদেশ এখনো বেশ পেছনে রয়েছে। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, পোল্ট্রি খাদ্যের উচ্চমূল্য এবং খামারিদের সঠিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি এই খাতে আশানুরূপ অগ্রগতি অর্জনে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ফার্মের মুরগি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শীর্ষ তিন দেশের মধ্যে জায়গা করতে পারেনি।
এফএও-এর ডেটা অনুযায়ী, এই অঞ্চলে উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে নিবন্ধিত পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা প্রায় ৮৬ হাজার। সব মিলিয়ে দেশে বর্তমানে পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার, যা পাঁচ বছর আগে প্রায় ২ লাখ ছিল। গত পাঁচ বছরে প্রায় ৬৪ হাজার খামার উৎপাদন কার্যক্রম থেকে বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ)।
সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত পোল্ট্রি খামারের পাশাপাশি প্রায় ৫০ হাজার অনিবন্ধিত খামার পরিচালিত হচ্ছে। দেশের প্রান্তিক খামারি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিদিন তারা লোকসান গুনছেন, ক্রমে ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন, অনেকেই লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের ডিম উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পোল্ট্রি খাতে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের দাবি জানিয়ে সংগঠনটি বলছে, উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে এমন একটি মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যাতে খামারিরা অন্তত ন্যায্য মুনাফা পান এবং উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারেন। সারা দেশের খামারিদের একটি জাতীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ চালু হলে প্রকৃত খামারিদের সহজে শনাক্ত করা যাবে এবং খামারিদের ঝরে পড়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি বাস্তব সময়ে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। সরকারি প্রণোদনা, ভর্তুকি ও স্বল্পসুদে ঋণ সরাসরি প্রকৃত খামারিদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। খামারিদের ৭০-৮০ শতাংশ ব্যয় চলে যায় খাদ্যের পেছনে। তার সঙ্গে খাদ্যের উপকরণ আমদানিতে আছে ৪ শতাংশ অগ্রিম আয়কর; এটা প্রত্যাহারের দাবি অগ্রগণ্য। প্রতিবেশী দেশগুলোতে কাঁচামালে এমন কর নেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ের অভাবে পোল্ট্রি খাতে সুফল পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে জাতীয় পোল্ট্রি বোর্ড গঠন করা হোক।
উৎপাদন খরচ কমাতে পারলে আগামী এক দশকে পোল্ট্রি খাত সফল শিল্প খাতে পরিণত হবে। যখন খামারিরা লোকসান দিয়ে সাড়ে চার টাকায় ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখনো ভোক্তাকে সাড়ে ১০ টাকায় ডিম কিনতে হয়। ডিম পচনশীল পণ্য হওয়ায় খামারিরা তা মজুত করতে পারেন না, আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মধ্যস্থতাকারীরা মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। ফলে ছোট খামারিদের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তারা দ্রুত লোকসানে পড়েন। বড় বাণিজ্যিক খামার সহজে ঋণ ও সরকারি সুবিধা পায়। কিন্তু প্রান্তিক খামারিরা তা পান না। ফলে তারা একবার ক্ষতির মুখে পড়লে আবার উৎপাদনে ফিরতে পারেন না।
বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য রোধ করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারগুলো টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্যে একদিকে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে বাড়তি মূল্যে ডিম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতা। যদি ছোট খামারগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ডিম ও মুরগির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। এতে ভবিষ্যতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সরাসরি ভোক্তার ওপর। পোল্ট্রি খাত গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। দুই দশকের বেশি সময় প্রান্তিক খামারিদের পরিশ্রমের কারণেই দেশের মানুষ তুলনামূলক কম দামে ডিম ও মুরগি খেতে পেরেছেন। অথচ আজ তারাই সবচেয়ে বেশি সংকটে। বাজারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারণ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো না গেলে ছোট খামারিরা দ্রুত ঝরে পড়বে এমনটাই স্বাভাবিক।
খামারিদের অভিযোগ, পোল্ট্রি খাত নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর নীতিমালা নেই। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রেও জানা যায়, আগের তুলনায় দেশে পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা কমেছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে খাতটি সুরক্ষা পাবে। তাছাড়া প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিমের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ, স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমানো, পোল্ট্রি খামারিদের জন্য কৃষক কার্ড ও ভর্তুকি এবং ছোট খামারিদের জন্য আলাদা নীতিগত সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।