Image description

ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ার তৈরি পোশাকশিল্প এলাকায় শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন এবং দেশি-বিদেশি চক্রান্ত রয়েছে বলে দাবি করেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের অভিযোগ, শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করলেও একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে।

এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি ও তাদের ইন্ধনদাতাদের বিষয়ে পুলিশের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে আইনের আওতায় আনার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের মোট সংখ্যা জানাতে পারেনি পুলিশ।

সোমবার (২ নভেম্বর) বিকালে শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি পরিদর্শন শেষে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উলাইল এলাকায় আল মুসলিম গ্রুপের সামনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোস্তাফিজুর রহমান ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন।

মজুরি বোর্ডের পরও আন্দোলন, উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন পুলিশের

মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিক আন্দোলন অব্যাহত থাকা এবং সহিংসতার পেছনে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগের দিন সকালে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং বোর্ডের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

 

শ্রমিকদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তবে মজুরি বোর্ড গঠনের পরও যারা শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। শ্রম সেক্টরের উদ্দেশ্য তাদের না। তাদের উদ্দেশ্য অন্য কিছু। কোনোভাবেই তাদের উদ্দেশ্য সফল হতে দিব না। এ ক্ষেত্রে যা যা দরকার, আইনের মধ্যে থেকে সবকিছুই পুলিশ গ্রহণ করবে।

অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিকারী ও তাদের ইন্ধনদাতাদের বিষয়ে পুলিশ তথ্য সংগ্রহ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ-সংক্রান্ত তথ্য ইতিমধ্যে পুলিশের কাছে রয়েছে। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আন্দোলন ঘিরে গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের কেউ রয়েছেন কি না, জানতে চাইলে ডিআইজি বলেন, গ্রেফতার ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তারা যে রাজনৈতিক দলেরই হোন না কেন, অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হেলমেটধারীদের শনাক্তে ফুটেজ বিশ্লেষণ

আন্দোলনের সময় হেলমেট ও মুখোশ পরে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্তের বিষয়ে এসপি শামীমা পারভীন বলেন, ইতিমধ্যে অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশের কাছে গোয়েন্দা তথ্যও রয়েছে।

তিনি বলেন, এই যে হেলমেট বাহিনী, আপনারা গত ১৭ বছরে দেখেছেন হেলমেট বাহিনী কারা ছিল। আমরা সেই হেলমেট বাহিনী সম্পর্কে অবগত আছি, আমরা কাজ করছি।

পুলিশ সুপার জানান, আন্দোলন চলাকালে ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজ, সাংবাদিকদের সংগ্রহে থাকা ভিডিও এবং পুলিশের নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

তার দাবি, আন্দোলনরত শ্রমিকদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে কিছু ব্যক্তি সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটাচ্ছেন। এসব ব্যক্তিকে প্রকৃত শ্রমিক হিসেবে বিবেচনা করছে না পুলিশ। তিনি বলেন, আসলে যারা ভাঙচুর করছে তারা কখনও শ্রমিক না। কারণ শ্রমিকরা কখনো তার অর্গানাইজেশনকে, তার গার্মেন্টসকে ভাঙচুর করে না।

পুলিশ সুপারের অভিযোগ, শ্রমিকদের মধ্যে ঢুকে কিছু ব্যক্তি দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে পুলিশের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

শিল্পাঞ্চলে বড় পরিকল্পনার দাবি পুলিশের

চলমান শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে বড় ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির পরিকল্পনা ছিল বলে দাবি করেছেন পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন। তার ভাষ্য, আগাম গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান ও গ্রেফতারসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ায় ওই পরিকল্পনা সফল হয়নি।

তিনি বলেন, সাভার, আশুলিয়া, ইপিজেড ও হেমায়েতপুর এলাকায় অনেক পোশাক কারখানা চালু রয়েছে। অতীতে শিল্পকারখানায় যেভাবে ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে, এবার আগাম ব্যবস্থা নেওয়ায় সে ধরনের পরিস্থিতি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।

কারখানা বন্ধের কারণ নিরাপত্তার ঘাটতি নয়, দাবি পুলিশের

চলমান শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে কতটি পোশাক কারখানা বন্ধ রয়েছে বা কতটিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি পুলিশ সুপার।

তিনি বলেন, যেসব কারখানা বন্ধ রয়েছে, সেগুলোর কর্তৃপক্ষ নিজেদের সিদ্ধান্তে ছুটি ঘোষণা করেছে। নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

শামীমা পারভীন জানান, সোমবার সকাল থেকে ঢাকা জেলা পুলিশ পুরো শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে। আশুলিয়া, ইপিজেড ও সাভারের বিভিন্ন পোশাক কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে পুলিশ। পুলিশের তৎপরতার কারণে এদিন কোনও কারখানায় হামলার সুযোগ তৈরি হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ ও পোশাক কারখানার মালিকদের সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কারখানা খোলা রাখা এবং শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ সুপার বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে শ্রমিকদের জীবিকা ও তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জড়িত। দেশের অর্থনীতিতেও এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাই শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা জরুরি।

গ্রেফতারের সংখ্যা জানাতে পারেনি পুলিশ

আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত কতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, ঢাকা জেলা পুলিশ, শিল্প পুলিশ, আশুলিয়া ও সাভার থানা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক ইউনিট বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে। বিভিন্ন স্থান থেকে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে একাধিক ইউনিট অভিযান পরিচালনা করায় তাৎক্ষণিকভাবে মোট সংখ্যা সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি।

তিনি জানান, সব ইউনিটের তথ্য একত্র করে সন্ধ্যার মধ্যে গ্রেফতারের মোট সংখ্যা সাংবাদিকদের জানানো সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তারা।

শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান, নিরাপত্তার আশ্বাস

বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিতে চাইলেও বাইরের কিছু ব্যক্তি তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন এমন অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ সুপার শ্রমিকদের উস্কানিতে পা না দেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, আমাদের শ্রমিক ভাইবোনেরা, আপনারা কোনও ধরনের কুচক্রী মহলের ফাঁদে পা দেবেন না। যারা উস্কানি দিচ্ছে, সেই উস্কানিদাতাদের ফাঁদেও পা দেবেন না। কারণ এটাই আপনাদের রুটি-রুজি। আপনারা কর্মে ফিরে আসুন, কাজ করুন। নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের।

পুলিশের মাঠপর্যায়ের ভূমিকা নিয়ে ব্যাখ্যা

শ্রমিক বিক্ষোভের সময় পুলিশের মাঠপর্যায়ের কিছু সদস্যের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালনের অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, পুলিশ পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেক সময় কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যেটিকে নিষ্ক্রিয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, আমার মূলত কাজ হচ্ছে গার্মেন্টস শিল্পকে রক্ষা করা এবং শ্রমিক ভাইদেরকে রক্ষা করা।

পুলিশ সুপার জানান, কোনও স্থানে পাঁচ থেকে ছয়শ’ শ্রমিকের বিপরীতে মাত্র ২০ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কৌশল অবলম্বন করতে হয়। পুলিশের উদ্দেশ্য কাউকে আহত করা নয়; বরং শ্রমিক ও শিল্পকারখানা উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ কারণে সব পরিস্থিতিতে পুলিশ আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয় না বলেও জানান তিনি।

পুলিশ সদস্য আহতের ঘটনায় শূন্য সহিষ্ণুতার ঘোষণা

আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যদের আহত হওয়ার বিষয়ে ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সেদিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালো ছিল। তবে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে বা এতে ইন্ধন দেবে, তাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি অনুসরণ করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দেশি-বিদেশি চক্রান্তের অভিযোগ পুলিশের

মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকদের আন্দোলন ও সড়ক অবরোধ অব্যাহত থাকার বিষয়ে পুলিশের ভাষ্য, শ্রমিকদের দাবির প্রতি সরকারের আন্তরিকতার অংশ হিসেবেই মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এরপরও ভাঙচুর ও সহিংসতার ঘটনা ঘটায় আন্দোলনের পেছনে অন্য কোনও মহলের উদ্দেশ্য রয়েছে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ।

পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনের দাবি, দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত কাজ করছে বলে তাদের ধারণা। এ বিষয়ে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তবে কথিত চক্রান্তে কারা জড়িত, তাদের পরিচয় কী কিংবা এ বিষয়ে পুলিশের কাছে থাকা তথ্যের বিস্তারিত সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেননি তিনি।