শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনেন, আবার দর পতনে বিক্রির ধারা তাদের মধ্যেই বেশি। এর ঠিক বিপরীত চিত্র প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। গত দুই সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রকাশ করা বিনিয়োগকারীর ধরন অনুযায়ী শেয়ার কেনাবেচার তথ্য-উপাত্তে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
গত বৃহস্পতিবার ডিএসইএক্স সূচক ১৬ দশমিক ৭৩ পয়েন্ট বাড়ার দিনে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ৯৪৩ কোটি টাকার শেয়ার কেনেন। বিক্রি করেন ৯০৮ কোটি টাকার শেয়ার। তারা প্রায় ৩৫ কোটি টাকার নিট ক্রেতা ছিলেন। একই দিনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার চেয়ে বিক্রি করেছেন বেশি। তাদের শেয়ার কেনার পরিমাণ ছিল ৬৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকার। বিক্রির পরিমাণ ছিল ৯২ কোটি টাকা। তারা বাজার থেকে নিট প্রায় ২৬ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। অন্য সব দিনের লেনদেনে মোটামুটি একই চিত্র দেখা গেছে।
শেয়ারবাজারের বর্তমান লেনদেনের ধরন ও বিনিয়োগকারীদের আচরণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আল-আমীন বলেন, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সম্পর্কে আগে থেকে ধারণা ছিল, যা তথ্য-উপাত্তে প্রমাণ মিলছে। তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণনির্ভর বিনিয়োগ করেন না।
এ পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নিজের স্বার্থে সচেতনভাবে সঠিকভাবে বিশ্লেষণনির্ভর বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. আল-আমীন বলেন, অন্যথায় তাদের বিনিয়োগ আচরণকে পুঁজি করে কারসাজি চক্র, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীসহ কৌশলী বিনিয়োগকারীরা নিজেদের মুনাফা তুলে নেবে।
বাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আচরণ
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশের শেয়ারবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণই বেশি। গত ১৯ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত ডিএসইতে মোট ১০ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। এর মধ্যে কেনা ও বেচা উভয় দিক বিবেচনায় তারা ৯ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা করেন, যা মোটের ৮৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। এর মধ্যে ক্রয়ে তাদের অংশ ৮৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ এবং বিক্রিতে ৮৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, গত সপ্তাহে যখন সাকল্যে সূচক ৯১ পয়েন্ট বেড়েছে, তখন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা মোট ৯ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকার লেনদেনে নিট সাড়ে ২৫ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন। আগের সপ্তাহে যখন সূচক ৯৬ পয়েন্ট হারিয়েছিল, তখন তাদের মোট ৯ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচার মধ্যে নিট ক্রয় ছিল ২২০ কোটি টাকার বেশি।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে ঊর্ধ্বমুখী ধারায় মোট ৮০৩ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচার সময় নিট সাড়ে ৮০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছে। এর আগের সপ্তাহে মোট ৯০৫ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচার মধ্যে নিট ৪০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছে। গত তিন মাসের ঊর্ধ্বমুখী ধারার পর সাম্প্রতিক সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ব্রোকার ডিলারদের অংশ
ডিএসইর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক লেনদেনে ব্রোকার ডিলার, অর্থাৎ ব্রোকারেজ হাউসগুলোর শেয়ার কেনাবেচা খুবই কম, মোটের মাত্র ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। গত দুই সপ্তাহের ১০ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়ে তাদের অংশ ছিল ১৬০ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৫১ শতাংশ। বিক্রিতে তাদের অংশ ছিল ১৭৫ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, গত সপ্তাহের ঊর্ধ্বমুখী ধারার সময় ব্রোকারেজ হাউসগুলো নিজস্ব অ্যাকাউন্টে বিক্রির তুলনায় কিনেছে বেশি। এ সময় কেনায় তাদের অংশ ছিল মোটের ১ দশমিক ৮০ শতাংশ। বিক্রিতে এ হার ছিল ১ দশমিক ২৯ শতাংশ। অন্যদিকে আগের সপ্তাহে সার্বিক দর পতনের সময় কেনায় ব্রোকারদের অংশ ছিল মোটের ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। বিক্রিতে ২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ।
বিদেশি, প্রবাসী ও অন্যান্য
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের অংশ দিন দিন কমছে। গত দুই সপ্তাহে বিদেশিদের ২১ কোটি টাকারও কম মূল্যের শেয়ার কেনাবেচার বিপরীতে প্রায় ১১২ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। এর মধ্যে গত সপ্তাহে প্রায় দুই কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে সাড়ে ৪১ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। এর আগের সপ্তাহে প্রায় ১৯ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে ৭০ কোটি টাকার বেশি শেয়ার বিক্রি ছিল তাদের।