Image description

রপ্তানি পণ্যের মানে মার খেয়েছে ভারত। জাপান গত মার্চে দেশটি থেকে আম আমদানি না করার ঘোষণা দেয়। এরপর নেপালও বিধিনিষেধ দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এতে বিপাকে পড়ে বিশ্বের শীর্ষ আম উৎপাদক ভারত।

 

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের আম বিশ্ববাজারে প্রশ্নের মুখে পড়ায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের। জাপান ও মালয়েশিয়ার মতো উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশের সুযোগ কাজে লাগানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা আসবে। তবে এজন্য মান নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিবহন খরচের মতো বাধা দূর করার পরামর্শ দিয়েছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।

 

ভারতের পরিবেশবিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ডাউন টু আর্থের’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপান ও নেপালের পদক্ষেপ ভারতীয় আমের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে বড় পরিসরে আলোচনা হচ্ছে ভারতের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে।

 

ভারতে প্রতিবছর প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টন আম উৎপাদন হয়। মোট উৎপাদিত আমের ১ শতাংশের কম রপ্তানি করে দেশটি। চলতি বছর ফিউমিগেশন (ধোঁয়ার মাধ্যমে কীটপতঙ্গ দমন) ও জীবাণুমুক্তকরণ প্রক্রিয়ায় ত্রুটি পাওয়ায় জাপান আমদানি স্থগিত করে। আর মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগের অভিযোগে আমদানির ক্ষেত্রে কঠোর উদ্ভিদ-স্বাস্থ্য শর্ত ও বৈধ সনদ বাধ্যতামূলক করে নেপাল।

 

বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনা

আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় দেশ। তবে এখনো রপ্তানির সুযোগ খুব সীমিত। দেশে বছরে গড়ে ২৫ থেকে ২৮ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ মৌসুমে দেশে সর্বোচ্চ ২৮ লাখ ৬৭ হাজার ৬৭৮ টন আম উৎপাদন হয়। কিন্তু ওই বছর রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ৩ হাজার ১০০ টন।

 

বিপরীতে ভারত উৎপাদনের মাত্র ১ শতাংশের কম রপ্তানি করলেও, পরিমাণে তা প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টন। হিসাব বলছে, বাংলাদেশে মোট উৎপাদনের তুলনায় আম রপ্তানির হার মাত্র শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ। আনুপাতিক হিসাবে ভারতের চেয়ে এটি প্রায় ৯ গুণ কম।

 

বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আম রপ্তানি করে ২০১৬ সালে। ওই বছর রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ৩০৯ টন। এরপর ২০২৩ সালে ৩ হাজার ১০০ টনে পৌঁছায়। যদিও পরের বছর ১ হাজার ৩২১ টনে নেমে আসে। তবে গত বছর আবার কিছুটা বেড়ে ২ হাজার ১২১ টনে দাঁড়িয়েছে।

 

বাংলাদেশের আম বর্তমানে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ ৩৮টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, দেশের আমের বর্তমান বাজার ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে এটি ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।

 

জাপান-মালয়েশিয়ায় চোখ

ভারতীয় আম নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন বাজার ধরার চেষ্টা করছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। জাপান ও মালয়েশিয়ার দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছেন তারা। গত মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আম আমদানির সম্ভাবনা যাচাই করতে বাংলাদেশ সফর করে মালয়েশিয়ার একটি প্রতিনিধিদল। তারা দেশের কয়েকটি আমবাগান পরিদর্শনের পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

 

কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল ট্রেড লিংক’– এর কর্ণধার রাজিয়া সুলতানা স্ট্রিমকে জানান, মালয়েশিয়ার প্রতিনিধি দলের সফর অত্যন্ত ইতিবাচক হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কোয়ারেন্টাইনসহ বিভিন্ন বিষয়ে তারা জানতে চেয়েছে। আমরা সন্তোষজনক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আশা করছি, শিগগির ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।’

 

একইভাবে জাপানের বাজারেও সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। দেশটির বাজারে তাজা আম রপ্তানির জন্য দীর্ঘদিন কাজ চলছে। ডিএইর ‘রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন’ প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, জাপানের প্রথম শর্ত ছিল ভ্যাপর হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) প্ল্যান্ট স্থাপন, যা ইতোমধ্যে হয়েছে। সম্প্রতি জাপানের পক্ষ থেকে পেস্ট রিস্ক অ্যানালাইসিসে (পিআরএ) কয়েকটি ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ে প্রশ্ন দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের যৌথ জরিপের মাধ্যমে বিষয়গুলো সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় আমের দুরবস্থায় বাংলাদেশ কী করবে– প্রশ্নে আরিফুর রহমান বলেন, ‘ভারতীয় আম নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটি কাজে লাগানোর জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।’

 

বড় বাধা পরিবহন খরচ

বিশ্ববাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি হলেও, বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের সামনে বড় বাধা আকাশপথে পরিবহনের বাড়তি খরচ। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারগুলোকে পাশ কাটিয়ে হঠাৎ করেই কার্গো ভাড়া বাড়িয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

এ ব্যাপারে রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘পূর্বঘোষণা ছাড়াই কেজিতে ৪১ টাকা ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে ৪৯০ টাকা ছিল, এখন তা ৫৩১। বিমানের ভাড়া বাড়ানোর পর বিদেশি ক্যারিয়ারগুলোও ভাড়া বাড়িয়েছে। সবমিলে এজেন্ট ফি যুক্ত হয়ে পরিবহন খরচ গলার কাঁটা হয়ে যাচ্ছে।’

 

প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘আমের দাম, প্যাকেজিং, শ্রম ও অন্যান্য খরচ যোগ হওয়ার পর এত বেশি পরিবহন ব্যয় নিয়ে আমরা কীভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করব?’