সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠদেশ আমরা সহজেই দেখতে পাই, কিন্তু এর ঠিক ওপরের বায়ুমণ্ডল বা করোনা অংশটি এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে এক বড় রহস্য। সূর্যের উজ্জ্বল বহিস্থ বায়ুমণ্ডল কেবল পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময়ই দেখা যায়, তা–ও মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। সেই সীমাবদ্ধতা দূর করতে এক জোড়া স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে সূর্যের আলো আড়াল করে মহাকাশে কৃত্রিম সূর্যগ্রহণ তৈরি করছেন ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার বিজ্ঞানীরা। গত এক বছরে স্যাটেলাইট দুটি মহাকাশে নিখুঁতভাবে সারিবদ্ধ হয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে সূর্যের আলো আড়াল করে ৫০টির বেশি কৃত্রিম সূর্যগ্রহণ তৈরি করেছে। ফলে বিজ্ঞানীরা এখন যখন খুশি তখনই সূর্যের করোনা নিয়ে গবেষণা করতে পারছেন।
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, সূর্যের পৃষ্ঠের ঠিক ওপরের অংশ থেকেই সৌরবায়ু তীব্র গতিতে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া এখান থেকেই উৎপন্ন হয় করোনাল মাস ইজেকশন বা বিশাল সৌরবিস্ফোরণ। এই বিস্ফোরণের ফলে নির্গত চার্জিত কণা পৃথিবীতে আছড়ে পড়লে স্যাটেলাইট যোগাযোগ, বিদ্যুৎ গ্রিড ও রেডিও সিগন্যাল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এত দিন বিজ্ঞানীরা সূর্যের পৃষ্ঠ ও এর অনেক দূরের বহিস্থ করোনার ছবি তুলতে পারতেন। দুটি এলাকার মাঝখানের অংশটি বা ইনার করোনা ছিল দৃষ্টির আড়ালে। প্রোবা-৩ মিশন ঠিক সেই শূন্যস্থানই পূরণ করছে।
পৃথিবীতে প্রাকৃতিক সূর্যগ্রহণ বছরে বড়জোর এক বা দুবার ঘটে। আবার তা স্থায়ী হয় মাত্র কয়েক মিনিট। প্রোবা-৩ মিশনের স্যাটেলাইট প্রতি ১৯ ঘণ্টা ৪০ মিনিট অন্তর একবার করে কৃত্রিম সূর্যগ্রহণ তৈরি করতে পারে, যা টানা ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। প্রোবা-৩ মিশনের প্রজেক্ট বিজ্ঞানী জো জেন্ডার বলেন, ‘গত কয়েক মাসে আমরা প্রায় ২৫০ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ চালিয়েছি। প্রাকৃতিক সূর্যগ্রহণ থেকে আমরা যে পরিমাণ তথ্য পেতাম, মহাকাশে এই কয়েক মাসেই আমরা সমপরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করেছি। দুটি আলাদা মহাকাশযান মহাকাশে এমনভাবে ওড়ে, যাতে একটি সূর্যের আলোকে ঢেকে দেয় এবং অন্যটি তার পেছনে থেকে করোনার ছবি তোলে। ভূমি থেকে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মহাকাশযান দুটি কয়েক মিলিমিটার সূক্ষ্মতা বজায় রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সারিবদ্ধ অবস্থায় থাকতে পারে। মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই স্তরের নিয়ন্ত্রণ এর আগে কখনো দেখা যায়নি।’
ইউরোপীয় তিনটি মিশনের তথ্য একত্র করে তৈরি ছবিতে সূর্যের পৃষ্ঠ হলুদ, বহিস্থ করোনা লাল এবং আগে আড়ালে থাকা ইনার করোনাকে সবুজ রঙে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর ফলে প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা একটি সৌরবিস্ফোরণের সম্পূর্ণ যাত্রাপথ দেখতে সক্ষম হয়েছেন। প্রোবা-৩ মিশনের ব্যবস্থাপক ড্যামিয়েন গ্যালানো জানান, অনবোর্ড পজিশনিং প্রযুক্তির কারণে মিশনটি সূর্যের বায়ুমণ্ডলের অজানা অংশগুলো বিস্তারিতভাবে অধ্যয়ন করতে পারছে, যা সৌরবিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের অভাব পূরণ করেছে।
সূত্র: আর্থ ডটকম