Image description

'হুএভার উইনস এআই,উইনস'—এআইয়ে যে জিতবে, জয় তারই। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে স্রেফ আরেকটি রাজনৈতিক স্লোগান মনে করলে ভুল হবে। এর মধ্যে বিশ্ব-ক্ষমতার বদলে যাওয়া হিসাবটি ধরা আছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর আয়ারল্যান্ডে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প এআইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এগিয়ে থাকা এবং চীনের কাছে সেই অবস্থান হারাতে না চাওয়ার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর স্পষ্ট: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতা এখন রাষ্ট্রের ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই।

কিন্তু এআইয়ে জেতা বলতে কী বোঝায়? সবচেয়ে ভালো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, এমন একটি সফটওয়্যার বানানো? সবচেয়ে জনপ্রিয় অ্যাপটির মালিক হওয়া? নাকি এমন অবস্থানে পৌঁছানো, যেখানে অন্য দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন কাজ নিজের তৈরি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করবে? ভূরাজনীতির বিচারে শেষের প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নির্ভরতা তৈরি করতে পারলে বাজারের পাশাপাশি দর-কষাকষির ক্ষমতাও বাড়ে। প্রযুক্তি তখন বাণিজ্যিক পণ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

একসময় সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ, পরে শিল্পকারখানা ও জ্বালানির সরবরাহ বিশ্বক্ষমতার বড় ভিত্তি হয়েছে। সামরিক শক্তি, অর্থনীতি ও মুদ্রার প্রভাব এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তবে এআইয়ের বিশেষত্ব হলো, এটি এসব শক্তির প্রায় প্রতিটিকে বাড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে। যে দেশ একই সময়ে দ্রুত গবেষণা করতে পারবে, কম খরচে উৎপাদন বাড়াতে পারবে এবং ভালোভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারবে, তার সুবিধা শুধু প্রযুক্তি খাতে আটকে থাকবে না। অর্থনীতি থেকে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত সেই সুবিধা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই কারণেই এআইকে ঘিরে প্রতিযোগিতা এত তীব্র। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৫ সালের এআই কর্মপরিকল্পনায় উদ্ভাবন, অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক নেতৃত্বকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রযুক্তি অন্য দেশে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আলাদা উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের লক্ষ্য নিজের দেশে সেরা প্রযুক্তি তৈরি করার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে তার ব্যবহার বাড়ানো। কোন দেশের হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, সেই প্রশ্নও এখন বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

চীনও এআইকে অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিস্তৃত পরিকল্পনার মধ্যে রেখেছে। দেশটির ‘এআই প্লাস’ উদ্যোগে শিল্প, বিজ্ঞান, কৃষি, সেবা ও শাসনব্যবস্থায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এর তাৎপর্য হলো, প্রযুক্তির মানের সঙ্গে বাস্তব ব্যবহারের প্রতিযোগিতাও চলছে। কোনো দেশ গবেষণাগারে ভালো ফল দেখালেও যদি কারখানা, বাজার ও জনসেবায় তার সুফল পৌঁছাতে না পারে, তবে সেই সাফল্যের রাজনৈতিক মূল্য সীমিত থাকবে।

অর্থনৈতিক শক্তির জায়গাটি আগে বোঝা দরকার। এআইয়ের সাহায্যে কোনো প্রতিষ্ঠান হিসাব, নকশা, ক্রেতাসেবা কিংবা গবেষণার কিছু কাজ দ্রুত করতে পারে। সফল ব্যবহার হলে একই শ্রম ও সময়ে বেশি উৎপাদন সম্ভব। লাখ লাখ প্রতিষ্ঠানে এমন পরিবর্তন ঘটলে একটি দেশের প্রতিযোগিতার ক্ষমতাও বাড়তে পারে। তবে সুফল আপনাআপনি আসবে না। প্রয়োজন দক্ষ মানুষ, বিনিয়োগ এবং কাজের পদ্ধতি বদলানোর প্রস্তুতি। প্রযুক্তি কেনা আর উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এক কথা নয়।

এর সঙ্গে কর্মসংস্থানের প্রশ্নও জড়িত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মসংস্থান এআইয়ের প্রভাবের আওতায় আসতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে সব চাকরি উঠে যাবে। কিছু কাজ বদলাবে, কিছু কাজে মানুষের সক্ষমতা বাড়বে, আবার কিছু কাজের চাহিদা কমতে পারে। যে দেশ কর্মীদের এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করবে, তার সুবিধা হবে। প্রস্তুতি ছাড়া প্রযুক্তি গ্রহণ করলে বৈষম্য বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

সামরিক ক্ষেত্রেও এআইয়ের গুরুত্ব একই কারণে বাড়ছে। বিপুল তথ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংকেত খুঁজে পাওয়া, সরবরাহের পরিকল্পনা করা বা পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এটি সহায়তা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের এআই কৌশলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুবিধা অর্জনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের সময় কে আগে পরিস্থিতি বুঝতে পারছে, তার মূল্য অনেক। তবে দ্রুত সিদ্ধান্ত মানেই সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। ভুল তথ্য কিংবা যন্ত্রের ভুল বিশ্লেষণের ওপর অতিরিক্ত আস্থা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। 

এই প্রতিযোগিতার দৃশ্যমান অংশ সফটওয়্যার হলেও এর ভিত্তি খুবই বাস্তব: বিশেষ কম্পিউটার চিপ, বিদ্যুৎ, তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের কেন্দ্র এবং দক্ষ গবেষক। উন্নত চিপের রপ্তানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিধিনিষেধ দেখায়, একটি ছোট যন্ত্রাংশও কত বড় কৌশলগত বিষয় হতে পারে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ চীনের সামরিক কাজে ব্যবহারের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে উন্নত কম্পিউটিং চিপের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছিল। প্রযুক্তির সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিদ্বন্দ্বীর সক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা এখানে স্পষ্ট।

বিদ্যুৎও এই ক্ষমতার সমীকরণে ফিরে এসেছে নতুন গুরুত্ব নিয়ে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ২০২৫ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে তথ্যকেন্দ্রগুলোর বিদ্যুতের চাহিদা দ্বিগুণের বেশি হতে পারে; এই বৃদ্ধির প্রধান চালক এআই। ফলে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, জমি ও অবকাঠামো প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ আকর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে উঠছে। এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তাই বিদ্যুৎকেন্দ্র, সঞ্চালনব্যবস্থা এবং জ্বালানির খরচকে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। 

আরও গভীর প্রশ্ন হলো, অন্য দেশের প্রযুক্তি ব্যবহারের শর্ত কে নির্ধারণ করবে। একটি রাষ্ট্রের জরুরি সেবা যদি বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তবে মূল্যবৃদ্ধি, সেবা বন্ধ বা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সময় তার বিকল্প কতটুকু থাকবে? বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু বিকল্প ছাড়া নির্ভরতা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা সংকুচিত করতে পারে। এআইয়ের প্রসারের সঙ্গে এই ঝুঁকির মূল্যায়নও জরুরি হয়ে উঠবে।

তথ্য ও ভাষার ক্ষেত্রেও ক্ষমতার প্রশ্ন আছে। মানুষ যদি পড়াশোনা, সংবাদ বোঝা কিংবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ক্রমেই এআইয়ের সাহায্য নেয়, তবে সেই ব্যবস্থায় কোন ভাষা, ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল প্রতিনিধিত্বের ফলে কোনো সমাজ সম্পর্কে অসম্পূর্ণ বা ভুল ধারণা ছড়াতে পারে। বাংলায় ভালো এআই তৈরি তাই ব্যবহারকারীর সুবিধার পাশাপাশি জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক উপস্থিতির বিষয়। আমাদের অভিজ্ঞতা অন্যের ব্যাখ্যার ওপর পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া যায় না।

বিশ্বক্ষমতার এই লড়াইয়ে নিয়ম তৈরিরও মূল্য আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই আইন মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। এখান থেকে বোঝা যায়, প্রভাব অর্জনের পথ শুধু বড় প্রতিষ্ঠান বা শক্তিশালী কম্পিউটার তৈরি করা নয়। প্রযুক্তি ব্যবহারের গ্রহণযোগ্য শর্ত নির্ধারণ করেও প্রভাব বাড়ানো সম্ভব। ভবিষ্যতে কোন তথ্য ব্যবহার করা যাবে, ভুলের দায় কার এবং নাগরিক কীভাবে প্রতিকার পাবেন—এসব প্রশ্ন আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও গুরুত্ব পাবে। 

বাংলাদেশের জন্য এই আলোচনা দূরের কোনো শক্তির লড়াই হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের রপ্তানি, সেবাখাত, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বিশ্ববাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। ক্রেতা যদি দ্রুত নকশা, নির্ভুল মান যাচাই বা কম খরচে সেবা চায়, তবে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বদলাতে হবে। শুধু কম মজুরির সুবিধা কত দিন যথেষ্ট থাকবে, সেই প্রশ্ন এআই আরও সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে কৃষি, দুর্যোগের পূর্বাভাস ও স্বাস্থ্যসেবায় এর উপযোগী ব্যবহার মানুষের বাস্তব উপকার করতে পারে।

আমাদের অগ্রাধিকারের শুরু হওয়া উচিত শিক্ষা ও দক্ষতা থেকে। শিক্ষার্থীদের মুখস্থবিদ্যার পাশাপাশি যুক্তি, ভাষা, তথ্য যাচাই ও সমস্যা সমাধানে দক্ষ করতে হবে। কর্মজীবীদের নতুন কাজ শেখার সুযোগও প্রয়োজন। বাংলায় মানসম্মত তথ্যভান্ডার, গবেষণার সহায়তা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের সহযোগিতা বাড়ানো দরকার। সরকারি সেবায় এআই ব্যবহারের আগে দেখতে হবে, তা নাগরিকের সময় ও খরচ কমাচ্ছে কি না। প্রযুক্তির উপস্থিতির চেয়ে সেবার ফলাফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রস্তুতি দরকার। প্রযুক্তি কেনার চুক্তিতে তথ্যের নিরাপত্তা, সেবার ধারাবাহিকতা এবং প্রয়োজনে অন্য ব্যবস্থায় যাওয়ার সুযোগ বিবেচনায় রাখতে হবে। একাধিক অংশীদারের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা দর-কষাকষির শক্তি বাড়ায়। তবে এআই একাই বিশ্বজয়ের নিশ্চয়তা দেবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ভুল। রাষ্ট্রের শক্তি নির্ভর করবে তার প্রতিষ্ঠান, মানুষের আস্থা এবং প্রযুক্তির সুফল সমাজে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতার ওপর।

ট্রাম্পের কথাটি তাই নতুন সময়ের একটি সতর্কসংকেত। এআই বিশ্বক্ষমতার প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে এসেছে, কারণ এটি অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও জ্ঞানের ওপর একসঙ্গে প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এই পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার হওয়া। আমাদের জন্য জয়ের মানে হবে দক্ষ মানুষের কাজ, প্রতিযোগিতায় সক্ষম প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সামর্থ্য। বড় শক্তিগুলো কে বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করবে, তা নিয়ে লড়ছে। আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে, সেই বিশ্বে নিজেদের অবস্থান কীভাবে শক্ত করব। এআইকে কেবল একটি নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং বিশ্ব আসনে জিওপলিটিক্স বা ভূরাজনীতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখার একটি বিষয় হিসেবে এআইকে দেখতে, শিখতে ও প্রয়োগ করতে হবে। 

লেখক: 


সাদিক মোহাম্মদ আলম
তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও এআই কনসালট্যান্ট