একটা জরুরি কাজের মাঝখানে হঠাৎ মনে হলোচ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করলেই তো উত্তর পাওয়া যাবে। মুহূর্তের মধ্যে খুলে ফেললেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই চ্যাটবট। কিন্তু প্রশ্ন করতে গিয়ে যদি সেখানে লিখে ফেলেন অফিসের গোপন নথি, নিজের পাসওয়ার্ড, ব্যাংক হিসাব কিংবা ব্যক্তিগত কোনো আইনি বা চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য? উত্তর হয়ত মিলবে, কিন্তু এর সঙ্গে তৈরি হতে পারে এমন এক ডিজিটাল রেকর্ড, যার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি আপনার হাতে নাও থাকতে পারে।
প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে চ্যাটবট এখন কোটি মানুষের দৈনন্দিন কাজের অংশ। গবেষণা, লেখা, কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরি থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত নানা প্রশ্নের উত্তর সবকিছুতেই ব্যবহার হচ্ছে এই প্রযুক্তি। কিন্তু সুবিধার পাশাপাশি রয়েছে গোপনীয়তার ঝুঁকিও। তাই কিছু বিষয় আছে, যেগুলো চ্যাটবট বা অন্য কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সেবায় না লেখাই নিরাপদ।
১. আইনি সমস্যার বিস্তারিত তথ্য
আদালতের মামলা নিয়ে চ্যাটবটের সাহায্য নিতে গিয়ে বিপদে পড়েছেন অনেকেই। আইন ও তথ্যবিজ্ঞান গবেষক ড্যামিয়েন শার্লোতাঁর একটি প্রকাশ্য তথ্যভান্ডারে বিশ্বজুড়ে ২ হাজারের বেশি আদালতের এমন সিদ্ধান্ত নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে চ্যাটবটের তৈরি ভুয়া মামলা, উদ্ধৃতি বা যুক্তি ধরা পড়েছে।
যে তথ্যগুলো চ্যাটবটে না দেয়াই ভালো—
- চলমান মামলার বিস্তারিত বিবরণ
- মামলার প্রমাণ বা গোপন নথি
- প্রতিপক্ষের বিষয়ে ব্যক্তিগত তথ্য
- আইনি কৌশল বা আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনার বিষয়
সাধারণ আইনি ধারণা জানতে চ্যাটবট ব্যবহার করা এক বিষয়, আর নিজের মামলার গোপন তথ্য সেখানে লেখা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
২. মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যক্তিগত কথা
মন খারাপ, সম্পর্কের সমস্যা বা মানসিক চাপের সময়ে অনেকে এখন চ্যাটবটকে অনেকটা ব্যক্তিগত পরামর্শদাতার মতো ব্যবহার করছেন। কিন্তু চ্যাটবট পেশাদার চিকিৎসক বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের বিকল্প নয়।
বিশেষ করে এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি—
- আত্মহানির চিন্তা
- গুরুতর মানসিক সংকট
- ব্যক্তিগত মানসিক আঘাত বা নির্যাতনের বিস্তারিত তথ্য
- মানসিক রোগের চিকিৎসা নিয়ে সিদ্ধান্ত
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে চ্যাটবট ব্যবহারকারীর নিজের বিশ্বাস বা ধারণাকেই অতিরিক্ত সমর্থন করতে পারে। তাই গুরুতর মানসিক সমস্যায় শুধু চ্যাটবটের ওপর নির্ভর না করে পেশাদারের সহায়তা নেওয়া জরুরি।
৩. অফিসের গোপন তথ্য ও নথি
অফিসের গোপন ফাইল, গ্রাহকের তথ্য, অভ্যন্তরীণ নথি কিংবা প্রতিষ্ঠানের গোপন কম্পিউটার কোড চ্যাটবটে কপি করে দেওয়া বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে এসব তথ্য কখনোই ব্যক্তিগত চ্যাটবটে দেয়া উচিত নয়—
- অফিসের গোপন নথি
- প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কম্পিউটার কোড
- গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য
- গোপন চুক্তি বা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা
- প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারকারীর নাম বা প্রবেশসংক্রান্ত তথ্য
২০২৩ সালে স্যামসাংয়ের প্রকৌশলীরা চ্যাটবটে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কম্পিউটার কোড দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি কর্মীদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল।
৪. চিকিৎসাসংক্রান্ত ব্যক্তিগত তথ্য
শরীরে কোনো সমস্যা হলে এখন অনেকেই চ্যাটবটকে প্রশ্ন করেন। সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য বোঝার ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হতে পারে। কিন্তু নিজের রোগের বিস্তারিত ইতিহাস, পরীক্ষার প্রতিবেদন বা ব্যক্তিগত চিকিৎসা তথ্য দিয়ে চিকিৎসা নেয়ার চেষ্টা ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষ করে না দেয়াই ভালো—
- পূর্ণ চিকিৎসা ইতিহাস
- ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরীক্ষার প্রতিবেদন
- ওষুধের বিস্তারিত তালিকা
- মানসিক বা শারীরিক রোগের সংবেদনশীল তথ্য
- চিকিৎসকের দেয়া ব্যক্তিগত পরামর্শ
চ্যাটবটের দেয়া তথ্যকে চিকিৎসকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার না করাই নিরাপদ।
৫. পাসওয়ার্ড ও হিসাবের তথ্য
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। কোনো অবস্থাতেই চ্যাটবটে নিজের সংবেদনশীল প্রবেশসংক্রান্ত বা আর্থিক তথ্য দেওয়া উচিত নয়।
কখনোই লিখবেন না—
- পাসওয়ার্ড
- একবার ব্যবহারযোগ্য প্রবেশসংকেত
- ব্যাংক হিসাবের তথ্য
- ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের তথ্য
- জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট নম্বর
- পরিচয়পত্রের ছবি
এ ধরনের তথ্য কোনোভাবে অন্যের হাতে গেলে পরিচয় চুরি, হিসাব দখল বা আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাহলে চ্যাটবটে কী লিখবেন?
চ্যাটবটকে সাধারণ জ্ঞান, কোনো বিষয় সহজভাবে বোঝা, লেখার খসড়া তৈরি, আইডিয়া নেয়া বা গবেষণার প্রাথমিক সহায়তায় ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে সহজ একটি নিয়ম মনে রাখুন
যে তথ্য অন্য কেউ জেনে ফেললে আপনি সমস্যায় পড়তে পারেন, সেটি চ্যাটবটে না লেখাই নিরাপদ।*
চ্যাটবটের উত্তর হয়তো কয়েক সেকেন্ডেই পাওয়া যায়, কিন্তু সেখানে দেওয়া সংবেদনশীল তথ্যের ঝুঁকি সবসময় এত সহজে মুছে ফেলা যায় না।
তথ্যসূত্র: এনগ্যাজেট