Image description
বন্ধুর সঙ্গে বসে কোনো একটি পণ্যের কথা বললেন। কিছুক্ষণ পরই ফেসবুক খুলে দেখা গেল, ঠিক সেই পণ্যের বিজ্ঞাপন। এমন অভিজ্ঞতা অনেক ব্যবহারকারীর মনেই প্রশ্ন তৈরি করে—‘ফেসবুক কি তবে আমাদের কথোপকথন শুনছে?’
 
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে এ ধরনের সন্দেহ নতুন নয়। বিশেষ করে কোনো পণ্য নিয়ে আলোচনা বা আগ্রহ প্রকাশের পর একই ধরনের বিজ্ঞাপন সামনে এলে অনেকেরই মনে হয়, মুঠোফোনের মাইক্রোফোনের মাধ্যমে তাদের কথাবার্তা শুনে বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে।
 
তবে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার দাবি, বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য ব্যবহারকারীর মাইক্রোফোনে আড়ি পাতা হয় না। বরং ব্যবহারকারীর বিভিন্ন ডিজিটাল কর্মকাণ্ড থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞাপনের জন্য সম্ভাব্য আগ্রহ অনুমান করা হয়।
 
সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসের ‘সিবিএস দিস মর্নিং’ অনুষ্ঠানে ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরিকে সরাসরি এ প্রশ্ন করেন উপস্থাপক গেইল কিং। এমন কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপন কেন ইনস্টাগ্রামে আসে, যা তিনি আগে সার্চও করেননি কিংবা ইন্টারনেটে কারও সঙ্গে আলোচনা করেননি— জানতে চান তিনি।
 
জবাবে অ্যাডাম মোসেরি বলেন, মেটা ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত বার্তা দেখে না এবং মাইক্রোফোনে আড়ি পাতেও না। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন, ব্যবহারকারীরা হয়ত মেটার এই বক্তব্য পুরোপুরি বিশ্বাস করবেন না।
 
তাহলে ব্যক্তিগত কথার সঙ্গে বিজ্ঞাপনের এমন মিল কীভাবে হয়?
 
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে ব্যবহারকারীর বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা। ফেসবুকে কী পছন্দ করছেন, কোন পোস্টে লাইক বা মন্তব্য করছেন, কাকে ট্যাগ করছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কী ভিডিও দেখছেন কিংবা কোন ওয়েবসাইটে ঢুকছেন— এসব তথ্য মিলিয়ে অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর সম্ভাব্য আগ্রহ অনুমান করতে পারে।
 
লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক ‘কনজিউমার ওয়াচডগ’-এর সভাপতি জেমি কোর্টের মতে, মেটা সরাসরি মাইক্রোফোনে আড়ি না পাতলেও ব্যবহারকারীর ওপর অত্যন্ত সূক্ষ্ম নজরদারি চালায়। বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করে এমনভাবে বিজ্ঞাপন দেখানো হয়, যাতে মনে হয় ব্যক্তিগত কথোপকথন থেকেই বিজ্ঞাপনটি এসেছে।
 
কীভাবে বুঝে যায় আপনার পছন্দ?
 
  • কোন পোস্টে লাইক বা মন্তব্য করছেন, কাকে ট্যাগ করছেন— এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
  • কোন ভিডিও দেখছেন বা কোন ধরনের কনটেন্টে আগ্রহ দেখাচ্ছেন, সেটিও বিবেচনায় আসে।
  • চেক-ইন, হ্যাশট্যাগ, বিভিন্ন গ্রুপে যুক্ত হওয়া ও সামাজিক যোগাযোগের তথ্যও কাজে লাগতে পারে।
  • একই সময়ে একই এলাকায় থাকা দুই ব্যক্তির কার্যক্রম থেকেও সম্ভাব্য আগ্রহ অনুমান করতে পারে অ্যালগরিদম।
  • ছবি, লেখা ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারকারীর সম্ভাব্য আগ্রহ বুঝতে পারে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ফিল লিবারম্যানের মতে, ব্যবহারকারীর লেখা, ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তার সম্ভাব্য আগ্রহ বা উদ্দেশ্য বুঝতে পারে। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপন দেখানো হয়।
 
শুধু ফেইসবুকেই সীমাবদ্ধ নয় নজরদারি
ফেইসবুকের তথ্য সংগ্রহ শুধু প্ল্যাটফর্মটির ভেতরের কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও অ্যাপে ফেইসবুকের প্লাগ-ইন, লগইন বা উইজেট ব্যবহার করলেও ব্যবহারকারীর কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
 
ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে অন্য কোনো ওয়েবসাইটে লগইন করে কেনাকাটা, ইমেইল সাবস্ক্রাইব বা কুপন সংগ্রহের তথ্যও বিজ্ঞাপন দেখানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। লোকেশনও গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র। চেক-ইন, ইভেন্ট ও ইন্টারনেট সংযোগের তথ্যের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অবস্থান অনুমান করা সম্ভব।
 
কী কী তথ্য কাজে লাগতে পারে?
  • যোগাযোগের তথ্য
  • ছবি ও ভিডিও
  • পোস্ট, লাইক ও মন্তব্য
  • হ্যাশট্যাগ ও চেক-ইন
  • বিভিন্ন গ্রুপে যুক্ত হওয়ার তথ্য
  • কোন ভিডিও বা কনটেন্ট কতটা দেখা হচ্ছে
  • অন্য ওয়েবসাইটে ফেইসবুক দিয়ে লগইন বা কেনাকাটার তথ্য
  • লোকেশন ও ইন্টারনেট সংযোগসংক্রান্ত তথ্য
ফলে ব্যক্তিগত আলাপের পর কোনো নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন সামনে আসা মানেই সেই কথোপকথন রেকর্ড করা হয়েছে—এমন প্রমাণ নেই। বরং নানা উৎস থেকে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে অ্যালগরিদমের করা অনুমান অনেক সময় অবিশ্বাস্যভাবে মিলে যায়।
 
ট্র্যাকিং কমাবেন যেভাবে
ফেইসবুকের অতিরিক্ত ট্র্যাকিং কমাতে প্রথমেই ফোনের সেটিংস থেকে অ্যাপটির লোকেশন ব্যবহারের অনুমতি সীমিত বা বন্ধ করা যেতে পারে।
 
  • আইফোনে ‘সেটিংস’ → ‘অ্যাপস’ → ‘ফেইসবুক’ → ‘লোকেশন’-এ গিয়ে ‘নেভার’ নির্বাচন করা যায়।
  • অ্যান্ড্রয়েডে ফেইসবুক অ্যাপের অনুমতি ব্যবস্থাপনা থেকে লোকেশন অ্যাক্সেস বন্ধ করা যায়।
  • ফেইসবুকের ‘সেটিংস’ থেকে ‘অ্যাডস’ বিভাগে গিয়ে বিজ্ঞাপন দেখানোর বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
  • অংশীদারদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন দেখানোর অপশন সীমিত করা যায়।
  • নিজের কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপন দেখানোর অপশনও বন্ধ বা সীমিত করা যায়।
  • সামাজিক যোগাযোগের কার্যক্রম ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন দেখানোর অপশনও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তবে এসব অপশন বন্ধ করলেই ফেইসবুকে বিজ্ঞাপন পুরোপুরি বন্ধ হবে না। বয়স, লিঙ্গ, অবস্থান এবং ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে ব্যবহারকারীর কার্যক্রমসহ বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতেও বিজ্ঞাপন দেখানো হতে পারে।
 
ব্যক্তিগত কথোপকথনের পরই একই ধরনের বিজ্ঞাপন সামনে আসা মানেই ফেইসবুক মাইক্রোফোনে আড়ি পাতছে এমন প্রমাণ নেই। ব্যবহারকারীর অনলাইন কার্যক্রম, লোকেশন, পছন্দ ও সামাজিক যোগাযোগের নানা তথ্য বিশ্লেষণ করেই অ্যালগরিদম অনেক সময় আগ্রহের বিষয়টি নিখুঁতভাবে অনুমান করে ফেলে। তাই বিজ্ঞাপন থেকে পুরোপুরি মুক্তি না মিললেও লোকেশন ও তথ্য ব্যবহারের অনুমতি সীমিত করে ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর বিজ্ঞাপনদাতাদের নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব।