Image description

বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজের তদারকি ও নজরদারির জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠান গঠনের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার কার্যালয়। হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক বলেছেন, বাংলাদেশে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর নজরদারির জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন।

 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে এ ধরনের স্বাধীন নজরদারি ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সব দেশের কাঠামো এক নয়। কোথাও পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, কোথাও গুরুতর ঘটনার তদন্ত করে স্বাধীন সংস্থা, আবার কোথাও ওমবাডসম্যান বা জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নজরদারি করে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দফতর বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত অর্থ ও ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বাহ্যিক স্বাধীন নজরদারি সংস্থা থাকা উচিত। এমন সংস্থা না থাকলে ওমবাডসম্যান বা জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান এ দায়িত্ব পালন করতে পারে।

স্বাধীন নজরদারি মানে কী?

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক নির্দেশনায় একটি কার্যকর স্বাধীন নজরদারি প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নজরদারি করবে, তার কাছ থেকে স্বাধীন হতে হবে। প্রয়োজনীয় ব্যক্তি, স্থান ও নথিতে প্রবেশের ক্ষমতা থাকতে হবে। পর্যাপ্ত অর্থ ও জনবল থাকতে হবে এবং তদন্তের ফলাফল ও সুপারিশ প্রকাশের সুযোগ থাকতে হবে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এমন প্রতিষ্ঠানকে শুধু অভিযোগ পাওয়ার পর কাজ করলে হবে না। জাতিসংঘের নির্দেশনায় জনসাধারণের অভিযোগ গ্রহণ, পুলিশের কাছ থেকে রেফার করা অভিযোগ নেওয়া এবং জনস্বার্থে নিজ উদ্যোগে তদন্ত শুরু করার ক্ষমতার কথাও বলা হয়েছে।

সব দেশের মডেল কি একই?

না। কোনও দেশে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিজেই তদন্ত করে। নিউ জিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, জ্যামাইকা ও কেনিয়ার মতো দেশে এ ধরনের ক্ষমতা দেখা যায়।

আবার কোনও দেশে এসব প্রতিষ্ঠান মূলত পুলিশের তদন্ত ও অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে। হংকং এর একটি উদাহরণ।

কোনও কোনও দেশে মানবাধিকার সংস্থা পুলিশের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করে। আবার বেলজিয়ামের মতো দেশে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান সংসদের কাছে জবাবদিহি করে।

জাতিসংঘও একটি নির্দিষ্ট কাঠামো সব দেশের জন্য বাধ্যতামূলক করেনি। বরং স্বাধীনতা, কার্যকর তদন্তের ক্ষমতা, পর্যাপ্ত সম্পদ এবং জবাবদিহিকে মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছে।

কোন দেশে কেমন ব্যবস্থা

নিউজিল্যান্ড: পুলিশের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত

নিউ জিল্যান্ডে পুলিশের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট পুলিশ কনডাক্ট অথরিটি (আইপিসিএ)। এটি পুলিশের অংশ নয় এবং আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করে।

পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের পাশাপাশি পুলিশের কর্মকাণ্ডের কারণে কারও মৃত্যু বা গুরুতর আহত হওয়ার মতো ঘটনাও এটি তদন্ত করে। পুলিশের হেফাজতকেন্দ্র পরিদর্শন এবং পুলিশের নিজস্ব তদন্তের ওপর নজরদারিও এর কাজের অংশ।

এ মডেলের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত পুলিশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।

যুক্তরাজ্য: গুরুতর অভিযোগে স্বাধীন তদন্ত

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ও অসদাচরণের বিষয় তদারকি করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট অফিস ফর পুলিশ কনডাক্ট (আইওপিসি)।

পুলিশের কর্মকাণ্ডে মৃত্যু, গুরুতর অসদাচরণ কিংবা গুরুতর অভিযোগের মতো ঘটনায় আইওপিসি নিজে তদন্ত করতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি পুলিশের অংশ নয় এবং তদন্তের সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নিতে পারার কথা।

যুক্তরাজ্যের এই ব্যবস্থা মূলত পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন তদন্তের সুযোগ তৈরি করে।

কেনিয়া: পুলিশি কর্মকাণ্ডের ওপর বিস্তৃত নজরদারি

কেনিয়ায় রয়েছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট পুলিশিং ওভারসাইট অথরিটি (আইপিওএ)। পুলিশের ওপর স্বাধীন নজরদারির জন্য প্রতিষ্ঠানটি গঠিত হয়েছে।

পুলিশের কর্মকাণ্ডের কারণে মৃত্যু বা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা তদন্ত করা এবং পুলিশ স্থাপনা পরিদর্শন করা এর কাজের মধ্যে রয়েছে। পুলিশি অসদাচরণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও এর নজরদারির আওতায় পড়ে।

এই মডেলে শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়, পুলিশের কর্মকাণ্ড ও ব্যবস্থার ওপরও বাহ্যিক নজরদারির সুযোগ রয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকা: পুলিশি ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত

দক্ষিণ আফ্রিকায় ইন্ডিপেন্ডেন্ট পুলিশ ইনভেস্টিগেটিভ ডিরেক্টরেট (আইপিআইডি) পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ও ঘটনার তদন্ত করে।

এটি পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তব্যবস্থার বাইরে একটি পৃথক কাঠামো। পুলিশের কর্মকাণ্ডে মৃত্যু, গুরুতর আঘাত এবং অন্যান্য গুরুতর অসদাচরণের মতো বিষয় তদন্তের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা রয়েছে।

আয়ারল্যান্ড: পুলিশ ওমবাডসম্যান

আয়ারল্যান্ডে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও গুরুতর ঘটনার জন্য রয়েছে ফিওসরু- অফিস অব দ্য পুলিশ ওমবাডসম্যান।

এ ধরনের ওমবাডসম্যান ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ পুলিশের আচরণ নিয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন। গুরুতর অভিযোগ বা পুলিশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষ ঘটনাও স্বাধীনভাবে তদন্ত করা যায়।

অর্থাৎ এখানে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের জন্য পুলিশের বাইরের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

জ্যামাইকা: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত

জ্যামাইকায় ইন্ডিপেন্ডেন্ট কমিশন অব ইনভেস্টিগেশন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করে।

পুলিশ বা অন্য নিরাপত্তাকর্মীর কর্মকাণ্ড নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠলে স্বাধীন তদন্তের সুযোগ তৈরি করাই এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।

বেলজিয়াম: সংসদের কাছে জবাবদিহি

বেলজিয়ামে রয়েছে স্ট্যান্ডিং পুলিশ মনিটরিং কমিটি। যা সাধারণভাবে কমিটি পি নামে পরিচিত।

এটি পুলিশের বাইরে একটি স্বাধীন নজরদারি প্রতিষ্ঠান এবং সংসদের কাছে জবাবদিহি করে। পুলিশের কার্যক্রমের ওপর বাহ্যিক ও ধারাবাহিক নজরদারি করা এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

কমিটি পি-এর ক্ষেত্রে স্বাধীনতার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের নথিতে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি নির্বাহী বিভাগ ও পুলিশ থেকে পৃথক এবং সংসদের কাছে জবাবদিহি করে।

ডেনমার্ক: পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের স্বাধীন কর্তৃপক্ষ

ডেনমার্কে ইন্ডিপেন্ডেন্ট পুলিশ কমপ্লেইন্টস অথরিটি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও গুরুতর ঘটনার তদন্ত করে।

এ ধরনের ব্যবস্থায় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে রাখা হয়। ফলে অভিযোগকারী ও পুলিশের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে একটি পৃথক তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের সুযোগ থাকে।

অস্ট্রেলিয়া: ওমবাডসম্যান ও রাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান

অস্ট্রেলিয়ায় পুরো দেশের জন্য একটি মাত্র পুলিশ নজরদারি প্রতিষ্ঠান নেই। ফেডারেল ও রাজ্য পর্যায়ে আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।

কিছু ক্ষেত্রে ওমবাডসম্যান আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে। আবার কোনও কোনও রাজ্যে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও গুরুতর ঘটনা তদন্তের জন্য আলাদা স্বাধীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

কানাডা: একাধিক স্বাধীন নজরদারি ব্যবস্থা

কানাডাতেও একক কোনও জাতীয় মডেল নেই। ফেডারেল ও প্রাদেশিক পর্যায়ে বিভিন্ন বেসামরিক নজরদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, গুরুতর ঘটনা এবং পুলিশের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার জন্য এসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে।

পুলিশের ওপর বেসামরিক নজরদারির ক্ষেত্রে কানাডাকে তাই একটি বহুস্তরীয় মডেল বলা যায়। আন্তর্জাতিক পুলিশ-নজরদারি সংক্রান্ত তালিকায় দেশটির একাধিক প্রাদেশিক ও ফেডারেল প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

হংকং: পুলিশের তদন্তের ওপর বেসামরিক নজরদারি

হংকংয়ে ইন্ডিপেন্ডেন্ট পুলিশ কমপ্লেইন্টস কাউন্সিল (আইপিসিসি) পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে।

হংকংয়ের মডেলটি দুই স্তরের। প্রথমে পুলিশের নিজস্ব অভিযোগ তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত করে। এরপর আইপিসিসি সেই তদন্তের প্রতিবেদন ও প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করে। 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, স্বাধীন নজরদারির একাধিক মডেল রয়েছে। তবে জাতিসংঘের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে বাহিনীকে নজরদারি করা হবে, নজরদারি প্রতিষ্ঠানটি যেন সেই বাহিনীর প্রভাবমুক্ত থাকে এবং কার্যকর তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও সম্পদ পায়।