Image description

রাত তখন প্রায় ২টা। ক্রেডিট কার্ডের বিলের এসএমএস পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ব্যাংক এশিয়ার কাস্টমার কেয়ারে ফোন করেন গ্রাহক আসিফ। কিন্তু একজন প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলতেই দুই দফায় তাকে অপেক্ষা করতে হয় প্রায় ১৫ মিনিট। পুরো কথোপকথনে কেটে যায় ২১ মিনিট, খরচ হয় প্রায় ৫০ টাকার বেশি।

জাগো নিউজকে আসিফ বলেন, ‘মধ্যরাতে মেসেজ পেয়ে সমস্যা সমাধানে তাৎক্ষণিক ফোন দিই। ধারণা ছিল রাত ১২টার পর সহজে কাস্টমার কেয়ারে কথা বলা যাবে। প্রথমে কলে প্রায় চার মিনিট হয়ে গেলেও সব লাইন ব্যস্ত আছে বলে অপেক্ষায় থাকতে বলে। বিরক্ত হয়ে কেটে দিই। পরে আবার ফোন দিই। এই ভেবে ফোন দিই যে কতক্ষণ তারা অপেক্ষায় রাখে দেখবো।’ 

‘দ্বিতীয় দফায় প্রায় ১২-১৩ মিনিট পর ফোন রিসিভ হয়। এরপর তথ্য যাচাই করতে করতে আরও কয়েক মিনিট। পরে সাড়ে ১৭ মিনিটে কথা শেষ হয়। সব মিলিয়ে ২১ মিনিটে ৫০ টাকার বেশি কাটে। এর মধ্যে কথা হয়েছে হয়তো সর্বোচ্চ ৫-৬ মিনিট। বাকিটা ওয়েটিং টাইম। এটা যেমন বিরক্তিকর, তেমন ব্যয়বহুল,’ বলেন তিনি।

শুধু আসিফ নন, কল সেন্টার নিয়ে প্রায় একই রকম ভোগান্তির কথা বলছিলেন একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা আরিফ।

বাসায় পানি না থাকায় ওয়াসার কল সেন্টারে কল দিয়েছিলেন তিনি। আরিফ বলেন, ‘ওয়াসার হটলাইনে ফোন দিলাম, আমার বাসায় পানি নেই। আমি পানির গাড়ি নেবো। আপনি বিশ্বাস করবেন না, টোটাল আমার ২৩ মিনিট সময় লেগেছে। দুই দফায় একজন আরেকজনকে দেয়। কি যে বিরক্তিকর। একইসঙ্গে ব্যয়বহুলও। ২৩ মিনিট তো কম সময় নয়। পানি নেবো এজন্য ২৩ মিনিট!’

 

আমরা কল সেন্টারকে ডিরেগুলেট (নিয়ন্ত্রণমুক্ত) করে দিয়েছি। কোয়ালিটিটা আমরা চাই- মার্কেট কন্ট্রোল করুক। যারা ভালো কোয়ালিটি দেবে, মানুষ তাদের কাছ থেকে নেবে। সে কারণেই কল সেন্টারকে আমরা আলাদা কোনো রেট দিই না।-বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী 

ব্যাংক, মোবাইল ফোন কোম্পানি, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কিংবা যে কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকসেবার জন্য নম্বর থাকে। কেউ এটাকে কল সেন্টার নম্বর, কেউ কাস্টমার কেয়ার নম্বর বা হটলাইন বলেন। মূলত গ্রাহকের সমস্যা সমাধান বা কোনো পণ্য সম্পর্কে জানাতে প্রতিষ্ঠানগুলো থার্ড পার্টির মাধ্যমে এ সেবা দেয়।

কাস্টমার কেয়ার থেকে সেবা নেওয়ার প্রধান সমস্যা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, সঙ্গে অর্থ খরচ। সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাস্টমার কেয়ার বা কল সেন্টার নম্বরে কল দিলে গ্রাহককে কতক্ষণ অপেক্ষায় (ওয়েটিং) রাখা যাবে, তার কোনো নীতিমালা নেই। মানুষ সেবা নেওয়ার জন্য ফোন দেয়। সেখানে তার সময়ের তো কোনো মূল্যই থাকে না, সঙ্গে ব্যয় হচ্ছে অর্থ।

তবে কিছু প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কিছু সেবা নম্বর সম্পূর্ণ ফ্রি। যেমন, জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯, সরকারি তথ্য ও সেবা ৩৩৩, দুদক ১০৬ জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯, সরকারি তথ্য ও সেবা ৩৩৩, দুদক ১০৬ নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ ১০৯, শিশু সহায়তা ১০৯৮, সরকারি আইন সেবা ১৬৪৩০, দুর্যোগের আগাম বার্তা ১০৯০ প্রভৃতি নম্বরগুলো টোল ফ্রি।

মোবাইল অপারেটর, ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানসহ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও এ খাতে সেভাবে বিনিয়োগ করতে চায় না। কল সেন্টারগুলোতে থাকে না পর্যাপ্ত জনবলও। এ কারণে কাস্টমার কেয়ার নম্বরে কল দিয়ে সমস্যার সমাধান হলেও গ্রাহক বিড়ম্বনায় পড়েন।

মোবাইল অপারেটর কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজেরা এই সেবা পরিচালনা করে না। তারা তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে কল সেন্টারের সেবা নেয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কল সেন্টারও একইভাবে পরিচালিত হয়। কোনো কোনো কল সেন্টারে কল করলে অর্থ খরচ হয় না (টোল ফ্রি)। তবে বেশিরভাগ কল সেন্টারে কল করলে প্যাকেজভেদে প্রতি মিনিটে সর্বোচ্চ আড়াই টাকা পর্যন্ত খরচ হয় (ভ্যাটসহ)

দেশে কল সেন্টার ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্কো)। সংগঠনটির তথ্যমতে, দেশ ও বিদেশে কল সেন্টারের সেবা দেয় এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বর্তমানে ১৩৫টি। এ খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মানুষের। কল সেন্টার সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- জেনেক্স, সিনেসিস আইটি, ডিজিকন, স্কাই টেক, মাই আউটসোর্সিং ও আইএসএসএল।

 

কতক্ষণ অপেক্ষায় রাখা যাবে, এমন নীতিমালা চায় না খোদ বিটিআরসি

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কল সেন্টারের নিবন্ধন দেয়। তবে একজন গ্রাহক কল সেন্টারে কল দিলে গ্রাহককে কতক্ষণ অপেক্ষায় রাখা যাবে, সেবার মান কেমন হবে- প্রতিষ্ঠানটির এমন কোনো নীতিমালা নেই। 

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংকগুলোর জন্য কল সেন্টার বাধ্যতামূলক সেবা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাদের জোর দিয়ে কিছু বলা যাবে না। কল সেন্টারের সেবার মানোন্নয়নে অনুরোধ করা যেতে পারে।

কাস্টমার কেয়ার কলে দীর্ঘ অপেক্ষা, ফাঁকা হচ্ছে গ্রাহকের পকেট
বিটিআরসি বলছে, ‘গ্রাহককে কতক্ষণ অপেক্ষায় রাখা যাবে, এমন নীতিমালা তারা করতে চান না।’ গ্রাহক ভোগান্তি দূর করতে কল সেন্টারের সেবার মানোন্নয়নে কোনো প্রতিষ্ঠানই তেমন কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

জানতে চাইলে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা কল সেন্টারকে ডিরেগুলেট (নিয়ন্ত্রণমুক্ত) করে দিয়েছি। কোয়ালিটিটা আমরা চাই- মার্কেট কন্ট্রোল করুক। যারা ভালো কোয়ালিটি দেবে, মানুষ তাদের কাছ থেকে নেবে। সে কারণেই কল সেন্টারকে আমরা আলাদা কোনো রেট দিই না।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এমন কোনো নিয়ম নেই যে একজন গ্রাহককে এক মিনিট বা ১০ মিনিটের মধ্যে সেবা পেতেই হবে। এ ধরনের কোনো রেগুলেশন আমরা করতেও চাই না। একটি ব্যাংকে যদি কলের চাপ বেশি হয়, তাহলে সেটি কতটুকু সক্ষমতার (ক্যাপাসিটি) কল সেন্টার সেবা কিনবে, সেটি ব্যাংক ও কল সেন্টারের মধ্যকার বিষয়।’

‘ব্যাংক যদি মনে করে তারা গ্রাহকদের ঠিকমতো সেবা দিতে পারছে না, তাহলে তারা আরও ভালো কল সেন্টার থেকে সেবা নেবে। প্রত্যেক জায়গায় যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করি, তাহলে সেবার খরচ অনেক বেড়ে যাবে।’

কল সেন্টারের ট্যারিফ বিষয়ে এমদাদ উল বারী বলেন, ‘মোবাইল কলের ক্ষেত্রে বিটিআরসি নির্ধারিত সর্বোচ্চ কল রেট রয়েছে। মোবাইল ফোনে কলের চার্জ ৪০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ২ টাকা (ভ্যাট ছাড়া) পর্যন্ত হতে পারে। এর বাইরে কোনো অপারেটর চার্জ নিলে আমরা ব্যবস্থা নেবো।’

ব্যাংকের জন্য কল সেন্টার বাধ্যতামূলক নয়, বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক

কল সেন্টারের গ্রাহক ভোগান্তি নিয়ে সিটি ব্যাংক, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের বক্তব্য জানতে চেয়েছিল জাগো নিউজ। তবে ব্যাংকগুলো এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। 

 

ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য কল সেন্টার বাধ্যতামূলক নয়। কোনো ব্যাংক যদি মনে করে আমার কোনো কল সেন্টারই থাকবে না, তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু বলার নেই।-বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান 

ব্যাংকগুলো কল সেন্টারের গ্রাহক ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য কল সেন্টার বাধ্যতামূলক নয়। কোনো ব্যাংক যদি মনে করে আমার কোনো কল সেন্টারই থাকবে না, তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু বলার নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের জোর দিতে পারবে না। এই সেবা যদি তারা দিতে রাজিও না হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কিছু বলার নেই।’

এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুরোধ করতে পারে। তাদের বলা যেতে পারে, আপনাদের কল সেন্টারে মাঝে-মধ্যে শুনি মানুষ কল করে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ওয়েট করেন, অতএব এটা যাতে আরও কম সময়ে মানুষ সেবা পায়, সেই চেষ্টা করেন। কিন্তু লিখিত আকারে বোধহয় ওভাবে বলার সুযোগ কম।’

নিজেদের পক্ষে সাফাই মোবাইল অপারেটরদের

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মোবাইল কোম্পানির একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘একটি কল রিসিভ করতেই মোবাইল অপারেটরগুলোর ১২ টাকা খরচ হয়। কিন্তু প্যাকেজ অনুযায়ীই আমরা চার্জ কাটি। তূলনামূলকভাবে মোবাইল অপারেটরদের কল সেন্টার ভালো সেবা দেয় ও কম সময়ে ফোন রিসিভ হয়। কিন্তু ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কল সেন্টারে দীর্ঘ সময় যেমন অপেক্ষায় থাকতে হয় তেমনি কলপ্রতি খরচও বেশি।’

আমরা আমাদের কাস্টমার কেয়ারের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ডিজিটাল সেলফ-সার্ভিস চ্যানেলগুলো ধারাবাহিকভাবে উন্নত করছি, যাতে গ্রাহকরা আরও দ্রুত ও নির্বিঘ্নে সেবা গ্রহণ করতে পারেন। কল সেন্টারে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিটিআরসির নিয়ম মেনে ট্যারিফ অনুযায়ী প্রযোজ্য কল চার্জ কাটা হয়।-গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী

গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন , ‘গ্রাহকদের সর্বোত্তম সেবা নিশ্চিত করা গ্রামীণফোনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমরা প্রতিটি গ্রাহকের সমস্যার ধরন ও প্রয়োজন বুঝে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি, যাতে তিনি সঠিক ও কার্যকর সমাধান পান।’

কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই বা বিষয়টির জটিলতার কারণে সমাধানে কিছুটা সময় লাগতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আমাদের কাস্টমার কেয়ারের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ডিজিটাল সেলফ-সার্ভিস চ্যানেলগুলো ধারাবাহিকভাবে উন্নত করছি, যাতে গ্রাহকরা আরও দ্রুত ও নির্বিঘ্নে সেবা গ্রহণ করতে পারেন। কল সেন্টারে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিটিআরসির নিয়ম মেনে ট্যারিফ অনুযায়ী প্রযোজ্য কল চার্জ কাটা হয়।' 

কলরেট প্রসঙ্গে গ্রামীণফোন বলছে, জিপি হটলাইনে কল করলে প্রতি মিনিটে ৬৮ পয়সা কাটা হয়। অন্য হটলাইনে (ব্যাংক) পণ্যভিত্তিক ট্যারিফের ওপর নির্ভর করে।

রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘রবির কাস্টমার কেয়ার সেবা বিটিআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। প্রতিটি অভিযোগ নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গুরুত্বসহকারে নিষ্পত্তি করা হয়। স্বয়ংক্রিয় ভয়েসভিত্তিক কল সিস্টেম (আইভিআর) সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।’

তবে হিউম্যান এজেন্টের সঙ্গে সংযুক্ত হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা নির্ধারিত ভয়েস কল ট্যারিফ অনুযায়ী সাশ্রয়ী হারে প্রযোজ্য চার্জ আরোপ করা হয় বলে জানান তিনি।

একজন গ্রাহক কল সেন্টারে কল করতে গিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ওয়েট করছেন। এই ওয়েট করার কারণ হচ্ছে, বড় বড় কোম্পানিগুলা তাদের কাস্টমার সাপোর্টে খরচ করতে চায় না।-স্কাইটেক গ্লোবাল লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মুসনাদ ই আহমদ 

বাংলালিংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘আমাদের আইভিআর (ইন্টারঅ্যাকটিভ ভয়েস রেসপন্স) মেন্যু ব্রাউজিং সম্পূর্ণ ফ্রি। শুধু যখন কোনো গ্রাহক সরাসরি একজন কাস্টমার কেয়ার এজেন্টের সঙ্গে কথা বলেন, তখন প্রতি মিনিট ৫০ পয়সা + ভ্যাট প্রযোজ্য হয়, যা নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী এবং টেলিকম ইন্ডাস্ট্রির প্রচলিত চর্চার অংশ।’

কল সেন্টারে বিনিয়োগে আগ্রহ নেই প্রতিষ্ঠানগুলোর, অভিযোগ মালিকদের

জানতে চাইলে স্কাইটেক গ্লোবাল লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মুসনাদ ই আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘একজন গ্রাহক কল সেন্টারে কল করতে গিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ওয়েট করছেন। এই ওয়েট করার কারণ হচ্ছে, বড় বড় কোম্পানিগুলা তাদের কাস্টমার সাপোর্টে খরচ করতে চায় না।’

‘যত সংখ্যক লোকবল ব্যবহার করার কথা, তারা তা করে না। সেখানে তারা খরচ বাঁচাচ্ছে। যে পরিমাণ কল আসে, কাস্টমার কেয়ারে সে পরিমাণ কর্মী থাকে না,’ বলেন তিনি।

মুসনাদ ই আহমদ বলেন, ‘অনেক প্রতিষ্ঠান কাস্টমার সাপোর্টকে এখনো ব্যয় (কস্ট) হিসেবে দেখে, বিনিয়োগ হিসেবে নয়। ফলে তারা কল সেন্টার পরিচালনায় প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করতে চায় না। এ কারণে গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হয়।’

এ বিষেয়ে মাই আউটসোর্সিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তানজিরুল বাশার জাগো নিউজকে বলেন, ‘কল সেন্টারে একসঙ্গে আসা কলের তুলনায় সেবাদানকারী এজেন্টের সংখ্যা কম থাকে। ফলে কল সিস্টেমে প্রবেশ করলেও এজেন্ট ব্যস্ত থাকায় গ্রাহকদের আইভিআর বা অপেক্ষমাণ অবস্থায় থাকতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘একজন এজেন্ট একটি কলে ব্যস্ত থাকলে একই সময়ে অন্য কল ধরতে পারেন না। তাই কলের চাপ বেড়ে গেলে নতুন গ্রাহকদের অপেক্ষা করতে হয়। এটি মূলত রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট ও সক্ষমতা (ক্যাপাসিটি) ব্যবস্থাপনার বিষয়।’

কলের জন্য গ্রাহকের কাছ থেকে যে অর্থ কাটা হয়, তা সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটর পায়। কল সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওই কল চার্জের কোনো রাজস্ব ভাগাভাগি বা আর্থিক সম্পর্ক থাকে না।-সিনেসিস আইটি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহরাব আহমেদ চৌধুরী

সিনেসিস আইটি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহরাব আহমেদ চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘কল সেন্টারে গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হওয়ার মূল কারণ হলো নির্দিষ্ট সময়ে কলের চাপ (পিক আওয়ার) হঠাৎ বেড়ে যাওয়া। চুক্তি অনুযায়ী যতজন এজেন্ট দিয়ে সেবা পরিচালনার কথা, সাধারণত ততজনই দায়িত্বে থাকেন। কিন্তু একসঙ্গে এজেন্টের সক্ষমতার চেয়ে বেশি কল এলে অতিরিক্ত কলগুলো অপেক্ষমাণ (কিউ) অবস্থায় চলে যায়।’

তিনি বলেন, ‘কল সেন্টারে কতজন এজেন্ট থাকবে, সেটি সেবাগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। কিন্তু কোনো কোনো সময়ে কলের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেলে বিদ্যমান জনবল দিয়ে সব কল একসঙ্গে গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। তখন গ্রাহকদের অপেক্ষা করতে হয়।’

অপেক্ষমাণ অবস্থায় গ্রাহকের কল চার্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কলের জন্য গ্রাহকের কাছ থেকে যে অর্থ কাটা হয়, তা সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটর পায়। কল সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওই কল চার্জের কোনো রাজস্ব ভাগাভাগি বা আর্থিক সম্পর্ক থাকে না।’

কতক্ষণ অপেক্ষায় রাখা যাবে, নেই নীতিমালা

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্কো) সভাপতি তানভীর ইব্রাহিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে প্রতিটি কল সেন্টার নিজেদের মতো সেবার মান নির্ধারণ করে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহককে ১০ মিনিট বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়।’

বর্তমানে প্রতিটি কল সেন্টার নিজেদের মতো সেবার মান নির্ধারণ করে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহককে ১০ মিনিট বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। কল সেন্টারের জন্য যদি জাতীয় পর্যায়ে সার্ভিস লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএলএ) নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয়ে সেই মান বজায় রাখবে ও গ্রাহক হয়রানি অনেকটাই কমে যাবে।-বাক্কো সভাপতি তানভীর ইব্রাহিম 

কল সেন্টারের জন্য যদি জাতীয় পর্যায়ে সার্ভিস লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএলএ) নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয়ে সেই মান বজায় রাখবে ও গ্রাহক হয়রানি অনেকটাই কমে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘দেশে কল সেন্টার পরিচালনার জন্য গ্রাহকসেবাভিত্তিক কোনো জাতীয় নীতিমালা নেই। বিটিআরসি মূলত লাইসেন্স ও অবকাঠামোগত বিষয়গুলো দেখে। কিন্তু সেবার মান, কতক্ষণে কল রিসিভ হবে বা গ্রাহক কতক্ষণ অপেক্ষা করবেন- এসব বিষয়ে কোনো বাধ্যতামূলক নীতিমালা নেই। ব্যাংক, টেলিকম, ট্রাভেলসহ প্রতিটি খাতের জন্য আলাদা সার্ভিস স্ট্যান্ডার্ড থাকা উচিত।’

নিবন্ধনের নানা শর্ত থাকলেও নেই গ্রাহকবান্ধব নীতিমালা

দেশের বিপিও ও কল সেন্টার পরিচালনার জন্য ‘ইনস্ট্রাকশনস ফর ইন্স্যুরেন্স অব রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট ফর দ্য অপারেশন অব বিপিও/কল সেন্টার (ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ডোমেস্টিক)’ শীর্ষক একটি নির্দেশনা জারি করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। 

এতে কল সেন্টার ও বিপিও পরিচালনার জন্য নিবন্ধন, লাইসেন্স, প্রযুক্তিগত শর্ত, নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও এটি গ্রাহক সেবা নির্ধারণের কোনো নির্দেশিকা নয়। এতে কল সেন্টার পরিচালনার নানা শর্ত থাকলেও গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় একটি বাক্যও নেই। 

সর্বোচ্চ কতক্ষণ কল অপেক্ষায় রাখা যাবে, কল কত সেকেন্ডের মধ্যে রিসিভ করতে হবে, অভিযোগ কত দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে, গ্রাহকের জন্য ক্ষতিপূরণ বা সার্ভিস লেভেল ও কল রেকর্ডিংয়ের আগে গ্রাহককে জানানো বাধ্যতামূলক কি না— এমন কোনো শর্তই এতে উল্লেখ নেই।

তবে বিপিও ও কল সেন্টারের নিবন্ধন ফি ৫ হাজার টাকা, একই নিবন্ধনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কল সেন্টার পরিচালনার সুযোগ, একটি কল সেন্টারে ন্যূনতম ৫টি সিট/এজেন্ট থাকতে হবে, বিদেশি কর্মী সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ রাখা যাবে, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কল সেন্টারের জন্য আলাদা প্রযুক্তিগত শর্ত ও সব কলের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) অন্তত ৬ মাস সংরক্ষণ করতে হবে- এমন সব শর্ত রয়েছে।

আর এ নির্দেশিকাটিও ২০১৩ সালের। এর পরে কল সেন্টার নিয়ে কোনো নীতিমালা বা নির্দেশনা জারি হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সর্বনিম্ন ৪৫ পয়সা থেকে ২ টাকা হারে প্রতি কলে কাটার কথা। এর বেশি কোনোভাবেই কাটার কথা নয়।