Image description

মুফতি সাইফুল ইসলাম

বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের চিন্তা, মতামত, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ প্রকাশের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম। ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম কিংবা বিভিন্ন অনলাইন ফোরামে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ মতামত প্রকাশ করছেন। কিন্তু প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অশালীন ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষমূলক মন্তব্য ও চরিত্রহননের প্রবণতা। অনেক সময় একটি মন্তব্য থেকেই সামাজিক বিভাজন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, এমনকি বাস্তব জীবনে সহিংস ঘটনাও ঘটছে। এ বাস্তবতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসলামী নীতিমালাগুলোর অনুসন্ধান করা উচিত।

পবিত্র কোরআন মানুষের ভাষাকে তার চরিত্রের অন্যতম পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করেছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

 وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا

‘মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৮৩)

এ নির্দেশনা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের জন্য নয়; বরং সব মানুষের সঙ্গে সুন্দর ভাষায় কথা বলার নির্দেশ। বাস্তব জীবনের মতো অনলাইনেও এ নির্দেশ সমানভাবে প্রযোজ্য।

আরেক স্থানে মহান আল্লাহ বলেছেন,

 وَقُل لِّعِبَادِي يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ

‘আমার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন সর্বোত্তম কথাই বলে।’ (সুরা বানী ইসরাঈল, আয়াত : ৫৩)

আয়াতটির শেষে মহান আল্লাহ তাআলা সতর্ক করেছেন যে, শয়তান মানুষের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করে। বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসংখ্য তর্ক-বিতর্ক, কটূক্তি ও পারস্পরিক বিদ্বেষের চিত্র এ সতর্কবাণীর বাস্তব প্রতিফলন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ভাষার গুরুত্বকে ঈমানের সঙ্গে যুক্ত করে বলেছেন,

وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ

‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০১৮)

এ হাদিস শুধু মুখে বলা কথার জন্য নয়, আজকের দিনে কীবোর্ডে লেখা প্রতিটি মন্তব্য, পোস্ট ও বার্তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ লিখিত ভাষাও মানুষের বক্তব্যেরই অংশ।

ইসলাম গালাগাল ও অশ্লীল ভাষাকে মুমিনের চরিত্রের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلاَ اللَّعَّانِ وَلاَ الْفَاحِشِ وَلاَ الْبَذِيءِ

‘মুমিন কখনো দোষারোপকারী, অভিশাপদাতা, অশ্লীলভাষী বা অশোভন আচরণকারী নয়।’
(তিরমিজি, হাদিস : ১৯৭৭)

দুঃখজনকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপার্থক্য হলেই অনেক মানুষ এমন ভাষা ব্যবহার করেন, যা ইসলামের এ শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত।

কোরআন শুধু ভালো কথা বলতেই বলেনি; অন্যের সম্মান রক্ষার নির্দেশও দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে... তোমরা একে অপরকে কটূক্তি করো না এবং মন্দ উপাধিতে ডেকো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১১)

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল, ব্যঙ্গ, অপমানজনক মিম বা অবমাননাকর মন্তব্য এই আয়াতের আলোকে স্পষ্টভাবে নিরুৎসাহিত।

একই সুরায় আরও বলা হয়েছে, ‘অনেক ধারণা থেকে বিরত থাকো... একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং কেউ কারও গিবত করো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১২)

আজকের অনলাইন সংস্কৃতিতে গুজব, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, স্ক্রিনশট ছড়ানো এবং কারও সম্মানহানি করা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অথচ ইসলাম এসবকে গুরুতর নৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে।

ইসলাম ভাষা ব্যবহারে জবাবদিহিতার কথাও দৃঢ়তার সহিত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

 مَا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ

‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।’ (সুরা কাফ, আয়াত : ১৮)

ডিজিটাল যুগে এই আয়াতের তাৎপর্য আরও গভীর। একটি মন্তব্য মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং বহু বছর ধরে সংরক্ষিতও থাকতে পারে। তাই অনলাইনে লেখা প্রতিটি শব্দের জন্য আল্লাহর কাছে হিসাব দিতে হবে।

আধুনিক গবেষণাও শালীন ভাষার গুরুত্বকে সমর্থন করে। ইউনেস্কো প্রকাশিত Behind the Numbers: Ending School Violence and Bullying (২০১৯) প্রতিবেদনে অনলাইন বিদ্বেষমূলক ভাষা ও সাইবার বুলিংকে শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস ও শিক্ষাজীবনের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে Pew Research Center-এর বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী অনলাইনে হয়রানি, অপমানজনক মন্তব্য বা বিদ্বেষমূলক ভাষার শিকার হন, যা সামাজিক আস্থা ও সুস্থ মতবিনিময়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

মতভিন্নতা ইসলাম নিষিদ্ধ করেনি; বরং ভদ্রভাবে মত প্রকাশের শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে সর্বোত্তম পদ্ধতিতে বিতর্ক করো।’ (সূরা নাহল, আয়াত : ১২৫)

অতএব মতের অমিল থাকলেও শালীনতা হারানো ইসলামী নীতির পরিপন্থী।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শালীন ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি অভ্যাস জরুরি। কোনো পোস্টে মন্তব্য করার আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা, রাগের মুহূর্তে প্রতিক্রিয়া না দেওয়া, ব্যক্তিকে নয় বরং বিষয়কে কেন্দ্র করে আলোচনা করা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও গালাগাল পরিহার করা এবং মনে রাখা যে প্রতিটি শব্দের জন্য একদিন আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

ডিজিটাল পৃথিবী মানুষের নৈতিকতাকেও পরীক্ষা করছে। একজন মুসলিমের পরিচয় শুধু মসজিদে নয়, তার ফেসবুক পোস্টে, মন্তব্যে, বার্তায় এবং অনলাইন আচরণেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত। শালীন ভাষা শুধু ভদ্রতার পরিচয় নয়; এটি ঈমান, তাকওয়া ও উত্তম চরিত্রেরও বহিঃপ্রকাশ। যদি আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সত্য, সৌজন্য ও কল্যাণের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, তবে তা ব্যক্তি, সমাজ এবং জাতি, সবার জন্যই কল্যাণকর হবে।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

[email protected]