Image description

ফেসবুক স্ক্রোল করছেন বা এই লেখাটি পড়ছেন? আপনি কিন্তু একা নন। আপনার অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, এই মুহূর্তে আপনার মুখের ত্বকে, চুলের গোড়ায় কোটি কোটি ক্ষুদ্র প্রাণী দিব্যি সংসার পেতে বসে আছে!

ভয় পাবেন না, এটি কোনো ভৌতিক গল্প নয়, একদম নিখাদ বিজ্ঞান। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মানুষের শরীরের, বিশেষ করে মুখের লোমকূপে বাস করে একধরনের আণুবীক্ষণিক পরজীবী। এদের নাম 'ডেমোডেক্স ফলিকুলোরাম'। মানুষের ত্বকই এদের একমাত্র আদি ও আসল বাসস্থান। এরা আমাদের বুকেই জন্মায়, আমাদের ত্বকের মরা চামড়া খেয়ে বেঁচে থাকে, এখানেই বংশবৃদ্ধি করে এবং একসময় পটল তোলে।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের রিডিং ইউনিভার্সিটি, ব্যাংগর ইউনিভার্সিটি এবং অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা ইউনিভার্সিটির একদল গবেষকের করা যৌথ গবেষণা থেকে এই পুঁচকে জীবদের নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী মলিকুলার বায়োলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন-এ প্রকাশিত এই গবেষণাপত্র বলছে, মানুষের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল এই মাইট বা পরজীবীগুলো এখন আর কেবল 'পরজীবী' নেই; বরং এরা ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে মানুষের পরম মিত্রে পরিণত হচ্ছে!
অর্থাৎ, তারা মানুষের শরীরের সাথে এমনভাবে ‘একীভূত’ হয়ে যাচ্ছে যে, মানুষকে ছাড়া তাদের আর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে মিলল চমকপ্রদ তথ্য

গবেষকরা এই প্রথম ডেমোডেক্স ফলিকুলোরামের ডিএনএ বা জিনোম সিকোয়েন্সিং করেছেন। আর তাতেই বেরিয়ে এসেছে অবাক করা সব তথ্য।

যুক্তরাজ্যের রিডিং ইউনিভার্সিটির ইনভার্টেব্রেট বায়োলজিস্ট আলেজান্দ্রা পেরোত্তি বলেন, "অন্যান্য সমগোত্রীয় প্রজাতির তুলনায় এই মাইটগুলোর শরীরের ভেতরের জিনগত বিন্যাস সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের ত্বকের লোমকূপের ভেতরের নিরাপদ ও আরামদায়ক জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে এদের ডিএনএ-তে এমন কিছু পরিবর্তন এসেছে, যার ফলে এদের শারীরিক গঠন ও আচরণে অদ্ভুত সব বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে।"

যেহেতু এদের কোনো প্রাকৃতিক শত্রু নেই, কোনো প্রতিযোগিতা নেই এবং অন্য কোনো মাইটের সাথে মেশার সুযোগ নেই- তাই বিবর্তনের ধারায় এদের জিনোম সংকুচিত হতে হতে একদম কেবল বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকুতে এসে ঠেকেছে। এদের শরীরের প্রতিটি পা মাত্র তিনটি একক-কোষী পেশী দ্বারা চালিত হয়। এদের পুরো গ্রুপে এত কম সংখ্যক প্রোটিন-কোডিং জিন আর কোনো প্রাণীর নেই।

কেন এরা কেবল রাতেই বের হয়?

এই ক্ষুদ্র প্রাণীর দৈর্ঘ্য মাত্র এক মিলিমিটারের তিন ভাগের এক ভাগ। এদের শরীরটি দেখতে অনেকটা লম্বাটে সসেজের মতো, যার একপ্রান্তে একগুচ্ছ পা এবং একটি মুখ রয়েছে। এই গঠনের কারণেই এরা সহজেই আমাদের লোমকূপের ভেতর দিয়ে যাতায়াত করতে পারে।

এদের জিন কমে যাওয়ার কারণেই এদের কিছু অদ্ভুত স্বভাব তৈরি হয়েছে। যেমন—এরা সূর্যালোক সহ্য করতে পারে না। যে জিনগুলো প্রাণীকে অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করে এবং দিনের আলোয় জাগিয়ে তোলে, বিবর্তনের ফলে এই মাইটগুলো সেই জিনগুলো হারিয়ে ফেলেছে।

তাছাড়া, এরা নিজেদের শরীরে ‘মেলাটোনিন’ নামের হরমোন তৈরি করতে পারে না (যা ছোট জীবদের চলাফেরা ও বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে)। তবে এই সমস্যার এক দারুণ সমাধান খুঁজে নিয়েছে তারা। সন্ধ্যার পর মানুষের ত্বক থেকে যে মেলাটোনিন নিঃসৃত হয়, এরা সেটাই ‘ধার’ করে বা চুষে নিয়ে নিজেদের কাজ চালায়। আর এই কারণেই তীব্র অন্ধকার নামলে এরা লোমকূপ থেকে বেরিয়ে আসে এবং অত্যন্ত ধীরগতিতে আমাদের ত্বকের ওপর দিয়ে হেঁটে সঙ্গী খুঁজে বেড়ায়।

অদ্ভুত প্রজনন প্রক্রিয়া এবং বিবর্তনের ভবিষ্যৎ

অন্যান্য মাইটের তুলনায় এদের প্রজনন অঙ্গের অবস্থান বেশ অদ্ভুত। পুরুষ মাইটের লিঙ্গটি তাদের শরীরের পেছনের দিকে থাকার বদলে পিঠের ওপর দিয়ে সামনের ও ওপরের দিকে বাঁকানো থাকে। এর ফলে মিলনের সময় পুরুষ মাইটটিকে নারী মাইটের নিচে গিয়ে বেশ কসরত করে অবস্থান নিতে হয়। চুলের গোড়ায় ঝুলে থেকে সারা রাত ধরে চলে এদের এই মিলন পর্ব।

তবে বিজ্ঞানীদের মতে, এদের বংশবৃদ্ধির ক্ষেত্রটি খুবই সীমিত হওয়ায় এদের জিনগত বৈচিত্র্য নেই বললেই চলে। আর এ কারণে এরা বিবর্তনের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যেখান থেকে এদের বিলুপ্তি বা বিবর্তনের এক ‘অন্ধ গলি’তে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আরেকটি মজার বিষয় হলো, এদের লার্ভা থেকে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়ার মাঝের স্তরে শরীরে সবচেয়ে বেশি কোষ থাকে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বয়সে পৌঁছালে এরা উল্টো কোষ হারাতে শুরু করে। বিজ্ঞানীদের মতে, কোনো সন্ধিপদী (আর্থোপড) প্রাণীর মানুষের সাথে স্থায়ীভাবে মিলেমিশে থাকার এটিই প্রথম বিবর্তনীয় পদক্ষেপ।

অবশেষে কাটল ‘মলত্যাগ’ নিয়ে বহু বছরের রহস্য!

এতদিন ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, ডেমোডেক্স মাইটদের শরীরে কোনো মলদ্বার বা অ্যানাস নেই। ফলে সারা জীবন ধরে তারা যা খায়, তা মল হিসেবে পেটের ভেতরেই জমতে থাকে এবং মৃত্যুর পর তাদের শরীর ফেটে সেই বর্জ্য আমাদের ত্বকে ছড়িয়ে পড়ে। ধারণা করা হতো, এর কারণেই মানুষের মুখে ব্রন বা বিভিন্ন চর্মরোগ হয়।

আধুনিক এই গবেষণায় বিজ্ঞানীদের সেই ভুল ভেঙেছে। জুম করে দেখা গেছে, এদের শরীরেও অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি মলদ্বার রয়েছে! অর্থাৎ, আপনার মুখে এদের মল জমে ফেটে যাওয়ার কোনো ভয় নেই।

ব্যাংগর ইউনিভার্সিটির প্রাণিবিজ্ঞানী হ্যাঙ্ক ব্রেইগ বলেন, "এতদিন ধরে এই নিরীহ মাইটগুলোর ঘাড়ে অনেক দোষ চাপানো হয়েছে। কিন্তু মানুষের সাথে এদের এই দীর্ঘদিনের সহাবস্থান ইঙ্গিত করে যে, এরা আসলে আমাদের কোনো ক্ষতি করছে না; বরং আমাদের উপকারই করছে। যেমন—আমাদের মুখের ত্বকের লোমকূপের ভেতরের মরা চামড়া খেয়ে এরা আমাদের ত্বক পরিষ্কার ও সতেজ রাখতে সাহায্য করছে।"

সুতরাং, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটি দেখার সময় একদমই শিউরে উঠবেন না। কারণ, আপনার ত্বকের সুরক্ষায় একদল অদৃশ্য ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ দিনরাত ডিউটি করে যাচ্ছে!