গত শুক্রবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর কয়েকটি রাজনৈতিক দল বা সংগঠন তার বিচারের দাবি তুলেছে।
বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন সংগঠন তাকে গ্রেফতার ও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে।
এমন অবস্থায় সদ্য সাবেক এই রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে কি-না সেই প্রশ্নগুলো ঘুরেফিরে সামনে আসছে।
এই বিষয়গুলো সামনে আসার পর রোববার এ নিয়ে কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উঠেছে সেগুলো আমলে নেওয়ার মতো বিষয় তারা পাননি।
আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি কোন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে বা দায়িত্ব থেকে পদত্যাগের পর যদি সুনির্দিষ্ট কোনো অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে সেটির বিচার করা যাবে। শুধুমাত্র দায়িত্ব পালনের সময়কালে রাষ্ট্রপতির কোনো কাজের জন্য তাকে বিচারের মুখোমুখি করা যাবে না।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মি. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অন্য কোনো অভিযোগ থাকলে সেটি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী।
রোববার আরেক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, মি. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এর আগে ২০২৪ সালের পাঁচই অগাষ্ট গণ অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই তাকে অপসারণের জোরালো দাবি উঠেছিল। কিন্তু সে সময় সাংবিধানিক সংকট তৈরির আশঙ্কায় তাকে স্বপদে বহাল রাখা হয়েছিল।
নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠনের পর নতুন করে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মি. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের দাবি উঠলেও বিএনপি সরকারের অবস্থানও ছিল তার পক্ষে।
শেষ পর্যন্ত শুক্রবার স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। এরপর সংবিধানের বিধান অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

বিরোধী পক্ষগুলোর দাবি, ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ
গত সপ্তাহের মাঝামাঝি থেকেই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের নানা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল।
এর দুই দিনের মাথায় গত শুক্রবার বিকেলে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন মি. সাহাবুদ্দিন।
তার পদত্যাগের পরে ওইদিন সন্ধ্যায়ই জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেন মো. সাহাবুদ্দিনকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
সেখানে তিনি বলেন, "সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ন্যারেটিভ সাজিয়েছেন যেটা আসলে তার জন্য একটা সেফ এক্সিটের জায়গা তৈরি করতে পারে। কিন্তু তাকে সেফ এক্সিট দেওয়ার কোনো মানেই নেই। তিনি যত অপরাধ করেছেন সেই অপরাধগুলোতে তাকে অবশ্যই বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে"।
ওই একই দিনে এই ইস্যুতে একটি যৌথ বিবৃতি দেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক ও মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ।
সেখানে দলটির পক্ষ থেকে, মি. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করে তাঁকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করারও দাবি জানানো হয়।
তবে, সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতির বিচার ইস্যুতে এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কঠোর অবস্থান থাকলেও জামায়াতে ইসলামী ছিল একটু কৌশলী অবস্থানে।
এই ঘটনার পর একই দিন রাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের আমিরের কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল তাদের দল সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতির বিচার চায় কী-না।
এর জবাবে দলটির আমির শফিকুর রহমান বলেছিলেন, 'আমরা সেটা চিন্তাভাবনা করেই আমাদের পদক্ষেপটি নেব।'
এর বাইরেও বিভিন্ন সংগঠন ও দলের নেতারা মি. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর তার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
শুক্রবার পদত্যাগের পর সাপ্তাহিক প্রথম কর্মদিবসে রোববার সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও আব্দুল হামিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়।
বাংলাদেশ আজাদি পার্টি ও রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম নামের দুটি সংগঠন পৃথকভাবে দুটি অভিযোগ করে।
ছবির উৎস,Getty Images
সাবেক রাষ্ট্রপতিদের বিচার করা যায়?
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল শপথ নিয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। এক বছর পর ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও তিনি রাষ্ট্রপতি পদেই বহাল ছিলেন।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে মি. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত। কিন্তু দায়িত্ব শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর আগেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি।
তার পদত্যাগের পরপরই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে মি. সাহাবুদ্দিনকে গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানানো হয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তির বিষয়ে বলা আছে। এতে দুই ধরনের সুরক্ষা পান রাষ্ট্রপতি।
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি মূলত দুই ধরনের সুরক্ষা পান। প্রথমত দায়িত্ব পালনকালে কাজের দায়মুক্তি, অর্থাৎ দায়িত্ব পালনের সময়ে কোনো কাজ করলে অথবা না করলে তার জন্য কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না।
দ্বিতীয়ত কার্যভারকালে ফৌজদারী সুরক্ষা, অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের বা চালু রাখা যাবে না। তাকে গ্রেফতার বা কারাবাসের পরোয়ানাও জারি করা যাবে না।
আইনজীবী ও সংবিধান বিশ্লেষক কাজী জাহেদ ইকবাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, "শপথ গ্রহণ থেকে পদত্যাগ পর্যন্ত ওনার কোনো কাজকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। না ফৌজদারি, না রিট কিংবা অন্য কোন অভিযোগ আনা যাবে না। এমনকি জুলাইয়ের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও আনা যাবে না"।
সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যেটি মো. সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। যে কারণে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যেহেতু রাষ্ট্রপতি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, সে কারণে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আর নেই।
তবে, সংবিধান বিশেষজ্ঞ কারো কারো মতে, যদি রাষ্ট্রপতিকে তার পদ থেকে অভিশংসন করা হতো সেক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতো।
সংবিধানের ৫২ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসিত করা যায়। এই অনুচ্ছেদের দুই ধারায় বলা আছে, "কোন অভিযোগ তদন্তের জন্য সংসদ কর্তৃক নিযুক্ত বা আখ্যায়িত কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট সংসদ রাষ্ট্রপতির আচরণ গোচর করিতে পারিবেন"।
আইনজীবী হাসনাত কাইয়ুম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অভিশংসন হওয়ার মতো অপরাধ করেছেন। বর্তমান সরকার তাকে অভিশংসন থেকে রক্ষা করছে। তাকে ক্লিন শিট দিয়েছে। যদি তাকে অভিশংসন করা হতো তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ হয়তো থাকতো।''
তবে, তাদের দুইজনই বলছেন, রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়ার আগে মো. সাহাবুদ্দিন যদি কোনো ফৌজদারী অপরাধে জড়িত থাকার কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
ছবির উৎস,NurPhoto via Getty Images
কি করবে বিএনপি সরকার?
২০২৪ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণের বিরুদ্ধে যখন আন্দোলন চলছিল, তখন সাংবিধানিক সংকটের বিষয়টি সামনে এনে তাকে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে না সরানোর পক্ষে অবস্থান ছিল বিএনপির।
এমনকি নির্বাচনের পরও যখন রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের প্রসঙ্গ সামনে এনেছিল জামায়াত-এনসিপি জোট, তখনও রাষ্ট্রপতিকে তার পদে বহাল রেখেছিল বিএনপি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে অনেকটা তাড়াহুড়ো করেই পদত্যাগ করতে দেখা গেছে মো. সাহাবুদ্দিনকে।
মি. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর তার বিচারের প্রসঙ্গ যখন সামনে এসেছে, তখন সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতির পক্ষেই অবস্থান দেখা গেছে বিএনপির।
রোববার সচিবালয়ে যখন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, তখন তার কাছে মি. সাহাবুদ্দিনের বিচার প্রসঙ্গ সামনে আসে। সাংবাদিকরা এ নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন তার কাছে।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "যারা তার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছে, তাদের সেটা অধিকার আছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এনসিপি এবং অন্যান্যরা তার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ উত্থাপন করছে। সেটা করতে পারে, কিন্তু আমরা আমলে নেওয়ার মতো বক্তব্য ওখানে নাই"।
এ সময় মি. আহমদ বলেন, "রাষ্ট্রপতি তার দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে তিনি সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিধি বিধান অনুযায়ী করেছেন। আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা পেয়েছি।''
তার বিচারের প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "সংবিধান অনুসারে তিনি প্রিভিলেজড এবং ইমিউনিটি আছে। ফৌজদারি অপরাধ ইত্যাদির বিষয়ে কোনো আদালতে মামলা করা যায় না। এর বহির্ভূত কোনো সময়ে যদি কোনো বক্তব্য কেউ দিয়ে থাকে, সেটা তাদের স্বাধীনতা আছে দিতে পারবে। তবে আমরা আমলে নেওয়ার মতো কোন বিষয় এখানে দেখিনি"।
এসময় সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল আগের কোন অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে কী-না। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, "সেই দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে তার বিরুদ্ধে কী কেউ অভিযোগ দিয়েছিল? দিয়ে থাকলে তখনকার সময়ে যদি কিছু রেকর্ড করে থাকে সেটা তখনকার বিষয়। সেটা বিধি বিধান অনুসারে চলবে, আইন অনুসারে চলবে"।
একই দিন ভিন্ন এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রীর কাছেও প্রায় একই ধরনের প্রশ্ন করা হয়েছিল।
জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, "আমরা একদিকে যেমন জন দাবিকে গুরুত্ব দেব, একইসাথে আমরা কাউকে অন্যায়ভাবে কেউ অন্যায়ের শিকার হোক সেটাও চাইব না। সুতরাং বিষয়টা আমরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে কি করণীয় আছে, সেটা সরকার যথাসময়ে দেখবে"।